বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

‘হ্যাঁ’-তে মুক্তি ‘না’য়ে বিপর্যয়

  • আপলোড তারিখঃ ৩১-০১-২০২৬ ইং
‘হ্যাঁ’-তে মুক্তি ‘না’য়ে বিপর্যয়

আর মাত্র ১২ দিন পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এরইমধ্যে সরকারিভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বেশকিছু রাজনৈতিক দলও ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরব। তবে জাতীয় পার্টিসহ কিছু দল গণভোটে ‘না’ ভোটের পক্ষে ক্যাম্পেইন করছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও তাদের কর্মী-সমর্থকরা ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে- গণভোটে যদি সংস্কারপন্থি অবস্থান ‘হ্যাঁ’ জয়ী না হয়, তাহলে জুলাই সনদ ও চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ কী হবে? সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘হ্যাঁ’-তেই মিলবে মুক্তি। সংস্কারের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। আর কোনো কারণে যদি ‘না’ জয়ী হয়, তাহলে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তো রয়েছেই, রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলবে। থমকে যাবে সংস্কার কার্যক্রমও। যে কারণে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করার পক্ষে সবারই থাকা উচিত বলে মনে করেন তারা।


রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদ আলম ভূঁইয়া বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পরাজিত হলে যারাই ক্ষমতায় আসবে তাদের মধ্যে স্বৈরাচার হওয়ার প্রবণতা থাকবে। তখন দেশে আবারও সরকার পতনের আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান হবে। সংঘাত ও সংঘর্ষ বাড়বে। লং টার্ম সিভিল ওয়ারের দিকে যেতে পারে দেশ। এটাই হয়তোবা কেউ কেউ চাচ্ছে। যার কারণে গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তি ও প্রপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে। তিনি বলেন, গণভোটে হ্যাঁ পরাজিত হলে মানুষেরও ক্ষতি, দেশের জন্যও ক্ষতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারি বলেন, হ্যাঁ ভোট পরাজিত হলে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন হবে না। গণতন্ত্রও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এজন্য যেভাবেই হোক ‘হ্যাঁ’ কে জয়যুক্ত করতে হবে। সরকারও এজন্যই হ্যাঁ ভোটের পক্ষে ক্যাম্পেইনে নেমেছে।


অনেক বিশ্লেষক অবশ্য মনে করছেন, গণভোটে ‘না’ ভোট পড়লে জুলাই সনদ আইনগতভাবে বাতিল হবে না, তবে এর রাজনৈতিক বৈধতা বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। তখন পুরো সনদ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা নতুন সংসদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। আর যারাই ক্ষমতায় আসবে তখন তারা যেসব বিষয়ে একমত হয়েছে সেগুলো এবং সংস্কার কমিশনে জমা দেয়া প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট দেয়া প্রস্তাবগুলো বাদ রেখে অন্য সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবেন। তাদের মতে, বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের উল্লেখ থাকলেও এটি নিয়মিত শাসনপ্রক্রিয়ার অংশ নয়। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কেবল সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান রয়েছে। রাজনৈতিক সনদ বা সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে গণভোট বাধ্যতামূলক নয়, যদি না তা আলাদা আইনে নির্ধারিত হয়।


রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, জুলাই সনদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষর থাকলেও এটি কোনো আইনি চুক্তি নয়। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। গণভোটে জনগণের সমর্থন না মিললে দলগুলো চাইলে এই অঙ্গীকার থেকে সরে আসতে পারে বা নতুন বাস্তবতার কথা তুলে ধরতে পারে। তখন শেষ পর্যন্ত সংস্কারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে নতুন সংসদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সংসদের ভেতরের ঐকমত্য এবং জনগণের ধারাবাহিক চাপ। ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইমরান আহম্মদের মতে, গণভোটে পরাজয় মানে সংস্কারের অবসান নয়, তবে তার রূপ ও গতি বদলে যেতে পারে। ২০২২ সালে চিলিতে নতুন সংবিধান গণভোটে বাতিল হয়েছিল। তখন পুরো সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া তারা নতুন করে আবার শুরু করতে হয়েছিল। কলম্বিয়াতে ২০১৬ সালে শান্তিচুক্তি গণভোটে বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু সংসদ সংশোধিত চুক্তি পাস করে। তাই গণভোটে হার-জিতের চেয়ে সক্রিয় ও কার্যকর সংসদ জরুরি।


‘হ্যাঁ’-তেই মিলবে নতুন বাংলাদেশ:
‘হ্যাঁ’ জিতলে কী হবে? আগামী সংসদ হবে দ্বিকক্ষের। নতুন সংসদের প্রথম ১৮০ কার্যদিবস হবে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’; এই সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করতে হবে। এরপর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিম্নকক্ষে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যনুপাতে (পিআর) গঠন হবে ১০০ সদস্যের ‘উচ্চকক্ষ’। সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন লাগবে। উচ্চকক্ষের মেয়াদ হবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত। এছাড়া, সংবিধানে জুলাই সনদ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংসদের ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করতে হবে বিরোধী দল থেকে। এক ব্যক্তি জীবনে ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। এছাড়া ক্ষমতা বাড়বে রাষ্ট্রপতির। এর মধ্যদিয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে। এসবের বাইরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল, নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমাসংক্রান্ত বিধান, বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণ, জরুরি অবস্থা ঘোষণা; প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, রাষ্ট্রপতির নির্বাচন পদ্ধতিসহ বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পথ খুলবে গণভোটে 'হ্যাঁ' জয়ী হলে। আর যদি গণভোটে ‘না’ জয়ী হয়, তাহলে সংবিধান-সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা আর থাকবে না। সে ক্ষেত্রে এ-সংক্রান্ত সংস্কার নির্ভর করবে ভবিষ্যতে কারা ক্ষমতায় যাবে এবং সংসদে কতটা সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে তার ওপর।


‘হ্যাঁ’-তেই বৈধতা পাবে সরকারের কর্মকাণ্ড:
সংস্কার প্রস্তাবের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ মানুষ সমর্থন করছেন কি না, তা জানতে চাওয়া হবে গণভোটে। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশও গণভোটের মাধ্যমে বৈধতা পাবে। এই আদেশের পটভূমিতে বলা আছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের প্রকাশ ঘটেছে। অভ্যুত্থানের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটে, ৬ আগস্ট সংসদ ভেঙে দেয়া হয় এবং ৮ আগস্ট বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। শুরুতে জুলাই সনদের খসড়ায় বলা হয়েছিল, বিদ্যমান সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামতের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বতী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। পরে সুপ্রিম কোর্টের মতামতের ভিত্তিতে সরকারের দায়িত্ব নেয়ার বিষয়টি বাদ দেয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ পরিবর্তনের ফলে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বিদ্যমান সরকারকে অভ্যুত্থানের সরকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে এটিও বৈধতা পাবে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রধান ছিলেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। এখন তিনি উপদেষ্টা পদমর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর দায়িত্ব পালন করছেন। এ বিষয়ে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে। এর ফলে জবাবদিহি তৈরি করার পথ প্রশস্ত হবে এবং ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে। কিছু স্বাধীন প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে। এসবের ফলে সাংবিধানিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ বন্ধ হবে বলে আশা করেন তিনি।



কমেন্ট বক্স
notebook

এক সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে হার মানলেন আবু সাঈদ