বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি
নির্বাচন ঘিরে বিদেশি কূটনীতিকদের সক্রিয়তা বাড়ছে

নীরব ভারত, সক্রিয় পশ্চিমা বিশ্ব

  • আপলোড তারিখঃ ২৯-০১-২০২৬ ইং
নীরব ভারত, সক্রিয় পশ্চিমা বিশ্ব

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকদের তৎপরতা তত বাড়ছে। তাদের তৎপরতা কেবল আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা এখন নির্বাচনের ফল, গ্রহণযোগ্যতা ও পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা-এই তিন প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ঘনীভূত হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, তফসিল ঘোষণার পর মাত্র কয়েক সপ্তাহে কূটনৈতিক বৈঠকের সংখ্যা ও পরিধি দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। সূত্র জানায়, তফসিল ঘোষণার পর সবচেয়ে বেশি বৈঠক হয়েছে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার দূতাবাসের প্রতিনিধিরা আলাদাভাবে এবং যৌথভাবে কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। একই সাথে তারা স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সাথে একাধিকবার বৈঠক করেছেন।


ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন কমিশন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আসন্ন নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র সরকার কোনো দলের পক্ষ নেবে না। সেইসঙ্গে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের জনগণের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রস্তুত রয়েছে। কেবল বাংলাদেশি জনগণেরই নির্বাচনে প্রতিনিধি চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশি জনগণ যে সিদ্ধান্ত নেবে তার প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে। বৈঠকের বিষয়ে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে সরকারের প্রস্তুতি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, তারা এখন আর সাধারণ আশ্বাসে সন্তুষ্ট নয়। নির্দিষ্ট পরিকল্পনা, লিখিত নির্দেশনা ও বাস্তব প্রয়োগ জানতে চাচ্ছে। সূত্র মতে, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে সক্রিয় ও কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে। দেখা গেছে, তফসিল ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতাই সবচেয়ে বিস্তৃত। সব পক্ষের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেছে মার্কিন দূতাবাস। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, এসব বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র তিনটি বিষয়ে স্পষ্ট বার্তাম দেয়ার চেষ্টা করেছে। এগুলো হলো- ভোটে বাধা বা সহিংসতার সঙ্গে জড়ালে ভিসা নীতির প্রয়োগ, বিরোধী দলের প্রচারণা ও সমাবেশে বাধা নিয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ, নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অনেকাংশে নির্ভর করবে প্রক্রিয়ার ওপর।


সূত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের পর সবচেয়ে বেশি সক্রিয় রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। তারা কৌশলে নীরব চাপ প্রয়োগ, নির্বাচন পর্যবেক্ষণকে মূল হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে চাইছে। তবে ইইউ প্রকাশ্যে কম কথা বললেও তারা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে একাধিক টেকনিক্যাল বৈঠক করেছে। বৈঠকে তারা পর্যবেক্ষক মিশনের সম্ভাব্য রুট, নিরাপত্তা ও রিপোর্টিং কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ইইউ জানিয়েছে, রাজনৈতিক পরিবেশ অনুকূল না হলে পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষক না পাঠানোর বিকল্পও খোলা রেখেছে। একাধিক কূটনৈতিক সূত্র বলছে, ইইউ সরাসরি চাপ দেয় না, কিন্তু তাদের পর্যবেক্ষণ সিদ্ধান্তটাই সবচেয়ে বড় বার্তা। এদিকে, নির্বাচনের পরিবেশের উপর কড়া নজর রাখছে যুক্তরাজ্য ও কানাডা। এই দুই দেশের কূটনীতিকরা তুলনামূলকভাবে বেশি বৈঠক করছেন। তারা নির্বাচনের পরিবেশের দিকে বেশি জোর দিচ্ছে। একই সাথে তারা মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী ও সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সূত্র জানায়, বেশিরভাগ বৈঠকে তারা নির্বাচনের আগের সময়ের গ্রেফতার ও মামলা, রাজনৈতিক সহিংসতার পরিসংখ্যান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর গুরুত্ব দিয়েছে।


নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের সব পরিস্থিতিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে ভারত। বাস্তবে তারা নীরব থাকলেও ভেতরে ভেতরে সবকিছু পর্যবেক্ষণে রেখেছে। ভারত প্রকাশ্যে বারবার বলছে-বাংলাদেশের নির্বাচন অভ্যন্তরীণ বিষয়। সমালোচকদের মতে, ভারত নির্বাচনকে অভ্যন্তরীণ বললেও বাস্তবে তাদের মোটিভ কী তা বোঝা মুশকিল। যার প্রতিফলন দেখা গেছে, ভারত বাংলাদেশের মিশন থেকে কূটনীতিকদের পরিবারের সদ্যদের দেশে ফিরিয়ে নিচ্ছে। অথচ এ বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অফিসিয়ালি কিছুই জানানো হয়নি। এ প্রসঙ্গে গতকাল বুধবার সাংবাদিকদের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশে থাকা ভারতীয় মিশন থেকে কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের ফিরিয়ে নেওয়ার কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এমন কোনো পরিস্থিতি বিদ্যমান নেই যে, ভারতীয় কর্মকর্তা বা তাদের পরিবার বিপদে আছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন বাংলাদেশে এমন কোনো পরিস্থিতি বিদ্যমান নেই যে তাদের কর্মকর্তা বা পরিবার বিপদে আছে। এ রকম একটি ঘটনাও ঘটেনি। তাদের মনে হয়তো আশঙ্কা থাকতে পারে, অথবা তারা হয়তো কোনো বার্তা দিতে চাইছে। কিন্তু আমি আসলে এর মধ্যে সঠিক কোনো বার্তা খুঁজে পাচ্ছি না। তৌহিদ হোসেন বলেন, তবে আমি এটাকে এভাবে বলব- তারা যদি তাদের পরিবার-পরিজনকে ফেরত নিতে চান, এ ব্যাপারে আমাদের তো কিছুই করার নেই। নিতেই পারেন। সার্বিকভাবে নিরাপত্তায় কোনো বিঘ্ন ঘটেনি।


সূত্র জানায়, প্রকাশ্যে কিছু না বললেও দিল্লি নিয়মিত রিপোর্ট নিচ্ছে ঢাকা মিশন থেকে। তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলাদা মূল্যায়ন করছে। এক সাবেক কূটনীতিকের ভাষায়, ভারত শব্দ কম ব্যবহার করে, কিন্তু হিসাব খুব ঠান্ডা মাথায় করে। অন্যদিকে, নির্বাচনকে সামনে রেখে চীনের কূটনৈতিক তৎপরতা তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও অবস্থান স্পষ্ট। তারা নির্বাচনকে বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করছে। একই সাথে তারা পশ্চিমা চাপের সমালোচনা করছে পরোক্ষভাবে। চীন সরকারের সঙ্গে বৈঠকে উন্নয়ন ও দ্বিপক্ষীয় প্রকল্পের ধারাবাহিকতার কথা বলছে। এছাড়া জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা নথিভিত্তিক মূল্যায়ন করছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। নাগরিক সমাজের ডকুমেন্টেশনকে তারা গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে বিবেচনায় নিচ্ছে। তাদের মূল্যায়ন নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, কানাডা, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা নির্বাচনের ফলের চেয়ে প্রক্রিয়াকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সব মিলিয়ে, এই কূটনৈতিক তৎপরতা নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক সতর্কতা ও আন্তর্জাতিক বার্তার এক জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে।



কমেন্ট বক্স
notebook

এক সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে হার মানলেন আবু সাঈদ