ভোটের মাসে প্রবেশ করেছে দেশ। আর মাত্র ১১দিন পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। গত ২২ জানুয়ারি প্রচারণা শুরুর পর থেকে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। পরস্পর আক্রমণাত্মক বক্তব্যে ভোটের মাঠে উত্তেজনা শুরু হয়েছে। নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গ করে একে অপরের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক ও অশালীন বক্তব্য এলেও নির্বিকার নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আনুষ্ঠানিকভাবে নেওয়া হচ্ছে না কোনো ব্যবস্থা। আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, আচরণবিধি প্রতিপালন দেখভালে প্রতিটি উপজেলা বা থানায় দুইজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং প্রতিটি আসনে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি কাজ করছে। পাশাপাাশি আমাদের কাছে যেসব অভিযোগ আসছে, সেগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ ছাড়াই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ফলে এবারের নির্বাচনে মূল প্রতি অপরকে আক্রমণাত্মকভাবে বক্তব্য দিয়ে ঘায়েল করবার চেষ্টা করছে তাতে নির্বাচনি পরিবেশ অনেকটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ভোটের মাঠের পাশাপাশি এবার স্যোশাল মিডিয়ায়ও শুরু হয়েছে নোংরামী। আক্রমণ-পালটা আক্রমণ চলছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নেই কোনো মনিটরিং।
ইসির তফসিল অনুযায়ী, ভোটের ৪৮ ঘন্টা আগ পর্যন্ত ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাতটা পর্যন্ত প্রচারণা চালাতে পারবেন প্রার্থীরা। নির্বাচনের দিন ভোটগ্রহণ চলবে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত। একইসঙ্গে গণভোট এবং সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হওয়ায় এবার ভোট প্রদানের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। গত ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর পর থেকেই প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী পরস্পর আক্রণাত্মক বক্তব্য শুরু করেছে কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ে। এবারের নির্বাচনে বিএনপির দিক থেকে জামায়াতের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দলটির ভূমিকা, ধর্মের অপব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা এবং ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ষড়যন্ত্র করার অভিযোগগুলো সামনে আনা হচ্ছে।
জামায়াতের দিক থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে দলটির নেতাদের অতীত দুর্নীতি, নেতাকর্মীদের দখল-চাঁদাবাজি এবং তাদের ‘নব্য ফ্যাসিবাদ’ হয়ে ওঠার অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে। এর সঙ্গে দুই পক্ষ থেকেই একটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বসহকারে সামনে আনা হচ্ছে, সেটি হলো ‘বিদেশি আধিপত্য’। বিএনপির দিক থেকে জামায়াতকে লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে পিন্ডি, অর্থাৎ পাকিস্তান। আর জামায়াতের দিক থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে দিল্লির আধিপত্যবাদ চাপানোর চেষ্টা হচ্ছে। সব মিলিয়ে এবার ভোটের মাঠে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি মুখোমুখি লড়াই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে যে স্পষ্টত ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো সামনের দিনগুলোতে পরস্পর আক্রমণের ধার আরও বাড়তে পরে।
এদিকে নির্বাচনি প্রচার শুরুর আগে থেকেই বিএনপির দিক থেকে জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, দলটির মহিলা কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারীদের বিভ্রান্ত করছেন। তারা এনআইডি কার্ড সংগ্রহ করছেন, মোবাইল ফোন নম্বর নিচ্ছেন। এ কারণে বিভিন্ন স্থানে জামায়াতের নারী কর্মীদের অবরুদ্ধ করা, কোথাও কোথাও হামলার ঘটনা ঘটেছে। জামায়াত আমিরের নির্বাচনি এলাকায় এ ধরনের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। ঢাকায় নির্বাচনি প্রচারে গিয়ে গত সপ্তাহে ডিম হামলার শিকার হন ঢাকা- ৮ সংসদীয় আসনের জামায়াত-এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। এই ঘটনায় প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাসকে গ্যাংস্টার, চাঁদাবাজসহ আপত্তিকর অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
অন্যদিকে জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থীর বিরুদ্ধে উসকানিমূলক ও অশালীন বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ এনেছে বিএনপি। সব মিলিয়ে এই আসনে বিএনপি এবং জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থীর পালটাপালটি বক্তব্যে ভোটের মাঠে উত্তেজনা রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমেও এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। এসব ঘটনার বাইরেও সারাদেশের বিভিন্ন আসনে বাগযুদ্ধ এবং বাগযুদ্ধ থেকে সংঘর্ষে রূপ নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে ধর্ম এবং ধর্মীয় পরিভাষা ব্যবহার করে কোনো কোনো প্রার্থী ভোটারদের কাছে ভোট চাইতে গেলেও সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনি প্রচারণায় এভাবে ধর্মের ব্যবহার করায় গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে ইতোমধ্যে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, নির্বাচনের প্রচারণায় ধর্মকে ব্যবহার করা কিংবা অন্যান্য ধর্মচর্চাকারী নাগরিকদের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করে ভোট চাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক।
জামায়াতের আমিরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা, এনসিপি এবং ডাকসুর ভিপিও আক্রমণাত্মক ভাষায় বিএনপির বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়েছে, যা পুরোপুরি নির্বাচন আচরণ বিরোধী। নির্বাচনে দল ও প্রার্থীদের জন্য প্রণীত আচরণবিধির ১৫ ধারায় উল্লেখ আছে- ‘কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কিংবা উহার মনোনীত প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা তাহাদের পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি-নির্বাচনী প্রচারণাকালে ব্যক্তিগত কুৎসা রটনা, অশালীন এবং আক্রমণাত্মক বা ব্যক্তিগত চরিত্র হনন করিয়া বক্তব্য প্রদান বা কোনো ধরনের তিক্ত বা উস্কানিমূলক বা মানহানিকর কিংবা লিঙ্গ, সাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগে এমন কোন বক্তব্য প্রদান করিতে পারিবেন না।’ কিন্তু ইসির আচরণ বিধির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দিলেও নির্বাচন কমিশন অনেকটা নির্বিকার। নেওয়া হচ্ছে না কোনো ব্যবস্থা। তবে ইসির তথ্যমতে, গত ৮ জানুয়ারি থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারা দেশে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ২১৩টি সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ১৩৭টি মামলা হয়েছে। ১৩ লাখ ৯৪ হাজার ৩০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাচনি অনুসন্ধান এবং বিচারিক কমিটিও কাজ করছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ২১টি সংসদীয় আসনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় ১৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে এক লাখ ৭০ হাজার টাকা।
সমীকরণ প্রতিবেদন