অসিফ কাজল, ঝিনাইদহ:
বাসাবাড়িতে অন্যের থালাবাসন মেজে, গায়ের ঘাম রক্ত পানি করে ছেলেকে পড়িয়েছিলেন মা ময়না আচার্য। মায়ের সেই অমানুষিক ত্যাগ আর নিজের কঠোর মেধা দিয়ে দারিদ্র্েযর সব দেয়াল ভেঙেছিলেন মিশন আচার্য। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ আর জিপিএ-৪.৮৩ পেয়ে ভর্তি হন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে অংশ নেন প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায়। চূড়ান্ত ফলাফলে মেধার সাক্ষর রেখে প্যানেলে সুপারিশপ্রাপ্তও হন তিনি। কিন্তু এত সব লড়াইয়ের পর অর্জিত সেই স্বপ্নের চাকরিটি এখন আটকে গেছে স্রেফ একটি ‘ভিটেমাটি’ না থাকার অজুহাতে।
নিজের কোনো স্থায়ী জমি ও ঘরবাড়ি না থাকায় ঝিনাইদহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে তাঁকে দেওয়া হয়নি কাক্সিক্ষত নিয়োগপত্র। জেলা থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত ১৮২ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৮০ জনের হাতে ইতোমধ্যে নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া হলেও ভিটেহীন মিশন আচার্য সরকারি দপ্তরের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন একটুখানি মানবিক সুবিচারের আশায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ৩০ বছর বয়সী তরুণ মিশন আচার্যের জন্ম থেকেই লড়াইয়ের শুরু। পিতা নন্দ আচার্য যশোর থেকে এসে ঝিনাইদহে বিয়ে করে সংসার শুরু করেছিলেন। কিন্তু মিশন গর্ভে আসার পরপরই স্ত্রীকে ফেলে নিখোঁজ হয়ে যান তিনি। অসহায় মা ময়না আচার্য দুই সন্তানকে বাঁচাতে ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় উঠে মানুষের বাড়ি বাড়ি ঝি-এর কাজ শুরু করেন। বড় ভাই শৈলেন আচার্য সংসারের ভার সামলাতে বেশি দূর এগোতে না পারলেও ছোট ভাই মিশনের পড়াশোনার অদম্য ইচ্ছা দেখে মা নিজের রক্ত জল করা উপার্জনে পড়ালেখা চালিয়ে যান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সরকারি চাকরির লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা পাস করে যখন জীবনের সুদিন আসার কথা, তখনই নিয়তির চরম পরিহাসের মুখোমুখি মিশন। জাতীয় পরিচয়পত্র, সব শিক্ষাগত সনদে কলাবাগান এলাকার ভাড়া বাসার ঠিকানা দেওয়া এবং পুলিশি তদন্তে তা সত্য প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস তাকে 'স্থায়ী ঠিকানা অনুপস্থিত' বলে আটকে দিয়েছে। যদিও সদর উপজেলার পণ্ডিতপুর গ্রামে মামা বিষ্ণুপদ বিশ্বাসের দেওয়া দুই শতক জমি রয়েছে, কিন্তু অর্থাভাবে সেখানে মাথা গোঁজার একটি টিনের ঘরও তুলতে পারেননি মিশন। স্বপ্ন ছিল চাকরিটা পেলে প্রথম মাসের বেতনে সেই জমিতে ছোট একটা ঘর তুলবেন।
মিশনের এই দুর্দিনের খবর শুনে সহপাঠী ও বন্ধুরা সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে সোচ্চার হয়েছেন। মহেশপুর থেকে নিয়োগপত্র পাওয়া তাঁর বন্ধু জিহাদ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যে ছেলেটি শৈশব থেকে চরম দারিদ্র্যকে জয় করে আজ শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করল, স্রেফ নিজ নামে জমি বা বাড়ি নেই বলে তাকে বাদ দেওয়াটা সামাজিক অবিচার। আমরা অধিদপ্তর পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে লড়ব।’
যোগাযোগ করা হলে ঝিনাইদহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আমজাদ হোসেন বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘মিশন আচার্যের আবেদনটি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছি। স্থায়ী ঠিকানার আইনি জটিলতার কারণে জেলা পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে পুরো বিষয়টি লিখিত আকারে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি অধিদপ্তর থেকে একটি ইতিবাচক সমাধান আসবে।’
একই বিষয়ে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন জানান, ‘মিশন আচার্যের স্থায়ী ঠিকানা সংক্রান্ত আইনি জটিলতা নিরসনে শিক্ষা অফিসে কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি অধিদপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে এবং দ্রুত এর একটি যুক্তিযুক্ত নিষ্পত্তি হবে বলে আশা করছি।’
উল্লেখ্য, এর আগে বরিশালের ‘ভূমিহীন’ আসপিয়া ইসলাম ও কুষ্টিয়ার মিম আক্তারের পুলিশে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে একই ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড়ে বিষয়টি নজরে আসলে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশে তাদের চাকরি নিশ্চিত করা হয়।
ঝিনাইদহ অফিস