শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

এক মিনিটের ‘কিয়ামত’

  • আপলোড তারিখঃ ২৮-০৮-২০২৬ ইং
এক মিনিটের ‘কিয়ামত’

আকাশ পুরোপুরি পরিষ্কার, ছিল না কোনো বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসও। অথচ চোখের পলকে পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে এলো কাদা, পাথর আর বরফের এক বিধ্বংসী স্রোত। নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলে ঘটে যাওয়া এ বিরল হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে গেছে একের পর এক লোকালয়। মানুষ অনুভব করলো ১ মিনিটের ‘কিয়ামত’। ভয়াবহ এ বিপর্যয়ে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অন্তত ৩৬২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গত বুধবার হিমবাহ ধ্বসের পর কাদাপানি ও পাহাড়ি ঢলের তোড়ে নেপাল এবং চীন (তিব্বত) সীমান্ত অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। সর্বশেষ পাওয়া তথ্যানুযায়ী, শিশু ও ৮০০ জনেরও বেশি বিদেশি পর্যটকসহ নিখোঁজ রয়েছেন ১,৫০০-র বেশি মানুষ। প্রধান প্রধান সেতু ও মহাসড়ক ধসে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধারকর্মীদের পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। নেপাল পর্যটন বোর্ডের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বন্যা কবলিত অঞ্চলগুলোতে অন্তত ৬৪৪ জন পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক এবং ১২৭ জন স্থানীয় নেপালি পর্যটক। বন্যার পর পাহাড়ি নদীগুলোর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করে বহু ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করতে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, কাদামাটি ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের সন্ধানে কাজ অব্যাহত রয়েছে। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় পর্যটকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া ৬৩ জন মার্কিন, ৫৩ জন ইউক্রেনীয়, ৩৪ জন অস্ট্রেলীয়, ৩৩ জন ব্রিটিশ ও ২৫ জন কানাডীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। বিভিন্ন দেশের নিজস্ব হিসাবের সঙ্গে নেপালের তালিকায় কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। দুর্গত এলাকায় উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। নেপাল সেনাবাহিনীসহ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নদীর তীর, ভাটির এলাকা ও ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালাচ্ছেন। রসুয়ার তিমুরে আটকে পড়া ১২৩ জনকে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় আকাশপথেই অনেক এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ পৌঁছানো হচ্ছে।


ভয়াবহ এই বন্যায় ৩৫টি মোটরযান চলাচলযোগ্য সেতু, ৪৫টি ঝুলন্ত সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে নিখোঁজদের সন্ধান ও দুর্গতদের কাছে ত্রাণ পৌঁছাতে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে উদ্ধারকারী দলকে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে বরফ ও পাথরের ধস থেকে সৃষ্ট প্রবল স্রোত লহেন্দে নদী দিয়ে নেমে এসে ভোতেকোশি নদীতে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে। একই দুর্যোগে চীনের তিব্বত অঞ্চলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কৃত্রিম হ্রদ ভেঙে নতুন বিপর্যয়ের আশঙ্কা, নদীতীর ছাড়ার নির্দেশ : প্রবল বন্যায় বিপর্যস্ত নেপালে এবার দেখা দিয়েছে নতুন ও মারাত্মক এক ঝুঁকি। দেশটির বন্যা উপদ্রুত অঞ্চলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে তৈরি হওয়া একটি কৃত্রিম হ্রদের পানির স্তর ক্রমাগত বাড়ছে। যেকোনো মুহূর্তে হ্রদের বাঁধ ভেঙে নতুন করে ভয়াবহ প্লাবন তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, বুধবার একটি নদীর স্বাভাবিক গতিপথ হঠাৎ অবরুদ্ধ বা অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে এই কৃত্রিম হ্রদটির সৃষ্টি হয়। এরপর থেকে হ্রদে দ্রুত পানি জমতে শুরু করেছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় তলদেশের প্রবল চাপে অবরুদ্ধ অংশ ভেঙে যেকোনো সময় নিম্নাঞ্চলে পানি ছড়িয়ে পড়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় চরম সতর্কতা জারি করেছে নেপাল সরকার। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্থানীয় সাধারণ বাসিন্দা এবং দুর্ঘটনাস্থলে থাকা উদ্ধারকর্মীদের অবিলম্বে নদীর দুই তীর ও আশপাশের এলাকা থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার আকুল আবেদন জানানো হয়েছে। আকস্মিক পানি বৃদ্ধির ফলে বড় ধরনের নতুন দুর্যোগ ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হলেও পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জটিল রূপ ধারণ করেছে।


উদ্ধার অভিযানে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সাড়ে ৯ হাজার সদস্য : তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলে আঘাত হানা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর দেশজুড়ে বড় ধরনের উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান শুরু হয়েছে। দুর্গম ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো থেকে নিখোঁজদের উদ্ধার এবং আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সামরিক বাহিনীর বিশাল বহর মাঠে নামানো হয়েছে। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে উদ্ধার তৎপরতা জোড়ালো করতে সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (এপিএফ) সমন্বয়ে সর্বমোট ৯ হাজার ২৬০ জন সদস্যকে মোতায়েন করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, পাহাড় ধস ও আকস্মিক ঢলে দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অনুসন্ধান কাজ পরিচালনায় কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিতভাবে কাজ করছে জরুরি সেবা সংস্থাগুলো।


নেপথ্যে ভূমিকম্প নয়, দায়ী হিমবাহ ধস : নেপাল-চীন সীমান্ত অঞ্চলে সাম্প্রতিক ভয়াবহ ও আকস্মিক বন্যায় (ফ্ল্যাশ ফ্লাড) ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছিল। প্রাথমিক ধারণা করা হয়েছিল এটি ৪.৪ মাত্রার একটি ভূকম্পনের প্রভাব। তবে এবার সেই আশঙ্কা বা ধারণা উড়িয়ে দিয়েছে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)। সংস্থাটির নতুন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোনো ভূমিকম্পের ফলে নয়, বরং প্রকাণ্ড হিমবাহ ধস ও পাথরের ভূমিধসের কারণেই এই ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছে।


প্রাথমিকভাবে ইউএসজিএস কাঠমান্ডুর উত্তরে নেপাল-চীন সীমান্তে ৪.৪ মাত্রার একটি ভূকম্পন রেকর্ড করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে নিকটবর্তী ভূকম্পন কেন্দ্রগুলোর তথ্য, দীর্ঘ-মেয়াদি ভূকম্পন তরঙ্গ এবং কৃত্রিম উপগ্রহের (স্যাটেলাইট) ছবি বিশ্লেষণ করে তারা স্পষ্ট জানায়, সে সময় কোনো ভূমিকম্প হয়নি। বরং অতিরিক্ত বরফ গলার ফলে পানি হিমবাহের তলদেশে গিয়ে পিচ্ছিল পরিবেশ তৈরি করে এবং বরফ-পাথরের বিশাল ধস নামায়। এই অতিমাত্রার বরফ ও পাথরের পতনের ফলে উৎপন্ন কম্পনই যন্ত্রে ৫.২ মাত্রায় রেকর্ড হয়, যা আগে ৪.৪ বলে মনে করা হয়েছিল।


সহায়তার হাত বাড়াল চীন, ভারত ও জাতিসংঘসহ একাধিক দেশ : হিমালয়কন্যা নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের পর ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে এগিয়ে এসেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। প্রতিবেশী দেশ ভারত দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে ১০ মেট্রিক টন জরুরি ত্রাণসামগ্রী নেপালে পাঠিয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে অস্থায়ী তাঁবু, কম্বল, হাইজিন কিট, সোলার ল্যাম্প ও জরুরি ওষুধ। পরবর্তীতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর নিশ্চিত করেন যে, আরও ৩৭.৫ টন ত্রাণ, খাবার ও ওষুধসামগ্রী নিয়ে ভারতের দ্বিতীয় একটি বিমান নেপালের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রও নেপালের এই দুর্যোগে পাশে দাঁড়িয়েছে। নেপালে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) জানান, চীন জরুরি ত্রাণসামগ্রী ও নগদ আর্থিক সহায়তার সমন্বয় করছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, তারা নেপালে একটি দুর্যোগ সাড়াদানকারী বিশেষজ্ঞ দল পাঠাচ্ছে এবং প্রাথমিক সাহায্য হিসেবে ৫ লাখ ডলার বরাদ্দ করেছে। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম নেপালের এই হৃদয়বিদারক পরিস্থিতিতে সমবেদনা প্রকাশ করে প্রায় ৫০ লাখ পাউন্ড (৬৮ লাখ মার্কিন ডলার) আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেইন এক বার্তায় জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) যেকোনো সময় নেপালকে আরও অতিরিক্ত সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।


আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোও নেপালের ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে দ্রুত অর্থ ছাড় করছে। জাতিসংঘের জরুরি মানবিক তহবিল থেকে নেপালের জন্য ২০ লাখ মার্কিন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউএন-ওসিএইচএ প্রধান টিম ফ্লেচার। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ নেপাল রেড ক্রস সোসাইটির ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১০ লাখ সুইস ফ্রাঁ (১২.৪ লাখ ডলার) জরুরি তহবিল প্রকাশ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) নেপাল তাদের অফিশিয়াল এক্স বার্তায় জানায়, তারা জরুরি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী, ওষুধ ও বহুমুখী ব্যবহারের উপযোগী তাঁবু দুর্যোগকবলিত এলাকায় পাঠিয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার অভিযান ত্বরান্বিত করতে আন্তর্জাতিক এই সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে। 



কমেন্ট বক্স