উপজেলা পরিষদ চত্বরে সরকারি সার রাখা হয়েছিল খোলা আকাশের নিচে, ত্রিপল টাঙিয়ে। দিন-রাত পাহারার দায়িত্বে ছিলেন নৈশপ্রহরী ও কৃষি অফিসের স্টাফরা। কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থার এমন চরম ফাঁক-ফোকর গলে দুই দফায় হাওয়া হয়ে গেছে কৃষকদের মাঝে বিতরণের জন্য রাখা ৫৩ বস্তা সার। এখানেই শেষ নয়; খোলা জায়গায় ফেলে রাখায় বৃষ্টির পানিতে ভিজে পঁচে নষ্ট হয়েছে আরও অন্তত ২০ বস্তা সার। ঘটনাটি ঘটেছে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে। গতকাল রোববার সকালে কৃষকদের মাঝে সার বিতরণ করতে গিয়ে এই অব্যবস্থাপনার থলে কেটে বিড়াল বেরিয়ে আসে।
জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা কৃষি অফিস বেশ কিছুদিন আগে কৃষকদের মাঝে বিতরণের জন্য বরাদ্দকৃত সার উপজেলা পরিষদ চত্বরে কৃষি অফিসের সামনে ত্রিপল বিছিয়ে রাখে। দিনে এবং রাতে কৃষি অফিসের স্টাফরা সারগুলোর প্রতি নজর রাখছিলেন। একজন নৈশপ্রহরী রাতে নজর রাখা সত্ত্বেও কৃষকের মাঝে বিতরণের উদ্দেশ্যে রাখা সারের ৫৩ বস্তা চুরি হয়ে যায়। এর মধ্যে ২৬ বস্তা আগেই চুরি হয়েছে বলেও জানা গেছে। এবং দু-একদিনের মধ্যে বাকি আরও ২৭ বস্তা সার চুরি হয়েছে। এছাড়া বিতরণের জন্য রাখা এসব সার অযত্ন অবহেলায় রাখায় বৃষ্টিতে ভিজে আরও অন্তত ২০ বস্তা সার পঁচে নষ্ট হয়ে গেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, কিছুদিন আগে ২৬ বস্তা সার চুরি হওয়ার পরও সচেতন হয়নি কেন কৃষি অফিস। বারবার চুরি যাওয়া মালামাল কৃষকের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতকাল রোববার সকালে সার নিতে এসে চরম ভোগান্তি ও ক্ষোভের মুখে পড়েন দূর-দূরান্ত থেকে আসা ৯০ জন কৃষক।
সদর উপজেলার বুজরুক গড়গড়ির কৃষক আমির হানাজালা বলেন, ‘আমরা সার নেওয়ার জন্য উপজেলায় এসেছি। এখানে আসার পর কর্মকর্তারা বলছেন, সার চুরি হয়ে গেছে। তারা বলছেন, আজ সার দেওয়া সম্ভব হবে না, কয়েক দিন পর দেওয়া হবে। আমরা বুঝতে পারছি না, সরকারি অফিস থেকে কীভাবে সার চুরি হয়ে যায়।’
একই ভোগান্তির চিত্র উঠে আসে কেদারগঞ্জ এলাকার কৃষক মিণ্টুর কথায়। তিনি বলেন, ‘আমাদের খাতায় স্বাক্ষর নেওয়ার পর বলা হচ্ছে সার চুরি হয়ে গেছে। প্রায় ৫৩-৫৪ বস্তা সার চুরি হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। আমরা সকাল ১০টার দিকে এখানে এসেছি, কাজকর্ম ফেলে রেখে। আমাদের হয় আজই সার দিতে হবে, না হলে আমাদের দিনের হাজিরা দিতে হবে।’
কৃষি অফিসের এমন খামখেয়ালিপনায় চরম ক্ষুব্ধ সাতগাড়ি গ্রামের কৃষক মিনহাজ। তিনি বলেন, ‘সারগুলো অবহেলা ও অযত্নে বাইরে ফেলে রাখা হয়েছিল। এতে কিছু সার ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা ভেজা ও নষ্ট সার নিতে চাই না। ভেজা সার তো চোর নিয়ে যায়নি, ভালো সারই চুরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অবহেলার কারণেই আজ এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।’
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্ত দিয়ে কয়েকজন কৃষক বলেন, ‘কৃষি অফিস আমাদের জন্য রাখা সার অবহেলায় রেখেছে। উপজেলা পরিষদ চত্বরে এতো রুম থাকা সত্ত্বেও তারা সারগুলো বাইরে খোলা আকাশের নিচে রেখেছে। এছাড়া চুরির বিষয়টি টের পেলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কৃষি অফিস।’
তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আনিছুর রহমান বলেন, ‘আমরা আজ বিতরণের সময় দেখেছি ২৭ বস্তা সার চুরি হয়েছে। এর আগেও একদিন ২৬ বস্তা চুরি হয়েছে। প্রথমে আমরা কৃষকদের অনুরোধ করেছিলাম, একদিন সময় দেন। আমরা বিকল্প ব্যবস্থায় সার আনবো এবং কৃষকদের মাঝে বিতরণ করব। তবে কৃষকরা তা মানতে নারাজ হওয়ায় আজই বিকল্প ব্যবস্থায় আমি নিজ খরচে সার কিনে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করব।’
এসময় সার পঁচে যাবার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘অল্প কয়েকটা বস্তা সার পঁচে গেছে। বৃষ্টিতে ভেজার কারণে এমন হতে পারে। আমরা সেগুলো রিপ্লেস করে দেবো। ত্রিপল বিছিয়ে রাখা ছিল। আসলে আমাদের কোনো গোডাউন না থাকায় এই সমস্যায় পড়তে হয়েছে।’
পুরো ঘটনাটি নিশ্চিত করে সদর উপজেলা সার বিতরণ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তিথি মিত্র বলেন, ‘বিষয়টি আমি শুনেছি। জানার পর পরই থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করার নির্দেশনা দিয়েছি।’
নিজস্ব প্রতিবেদক