বুধবার, ২৬ অগাস্ট, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

ছায়া মন্ত্রিসভার পথে বিরোধীদল, ক্ষমতার আয়নায় বিকল্প মুখ

  • আপলোড তারিখঃ ২৬-০৮-২০২৬ ইং
ছায়া মন্ত্রিসভার পথে বিরোধীদল, ক্ষমতার আয়নায় বিকল্প মুখ

এতদিন ছায়া মন্ত্রিসভার কার্যক্রম অনেকটা আড়ালে রাখা হলেও শিগগিরই এর সদস্যদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দ্বাদশ সংসদীয় রাজনীতির প্রথাগত পথ ছেড়ে এক অভিনব সংসদীয় চর্চার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সরকারের প্রতিটি দাপ্তরিক পদক্ষেপে কড়া নজরদারি রাখা, সংসদের ভেতরে ও বাইরে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং অন্ধ বিরোধিতার বদলে তথ্যভিত্তিক বিকল্প নীতিপ্রস্তাব পেশের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। রাজনৈতিক আলোচনার তুঙ্গে থাকা এই কাঠামোগত উদ্যোগের নাম 'ছায়া মন্ত্রিসভা' বা শ্যাডো ক্যাবিনেট। নীরব প্রস্তুতির পথ পেরিয়ে দলটির এই উদ্যোগ এখন প্রকাশ্য নীতিগত অবস্থানের অংশ, যা দেশের প্রচলিত রাজনীতির ধরণ ও বিরোধী দলের ভূমিকায় এক বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পর্দার আড়ালে প্রস্তুতি ও শীর্ষ নেতৃত্বের দায়িত্ব বণ্টন: জামায়াতের দলীয় সূত্র এবং দায়িত্বশীল নেতাদের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত মাসেই অত্যন্ত  হিসেবে নেতৃত্ব দেবেন। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান আইনজীবী এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, নির্বাহী কমিটিতে যারা আছেন, তাদের সিদ্ধান্তে গত মাসে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে এটি প্রকাশ করা হবে। কারা এই মন্ত্রিসভায় রয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে। সংগঠনের অনেক সিনিয়র নেতা, যারা সংসদ সদস্য নন, তারাও এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত আছেন। মূলত সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতেই এটি গঠন করা হয়েছে। তবে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ছায়া মন্ত্রিসভায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন জামায়াতের নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান। তথ্য মন্ত্রণালয়ে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এবং আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা, ধর্ম মন্ত্রণালয়ে শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি সালাহউদ্দিন আইয়ুবী রয়েছেন বলে জানা গেছে। আগে জোটগতভাবে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের চিন্তা থাকলেও শেষ পর্যন্ত দলীয়ভাবেই এই কাঠামো তৈরি করেছে জামায়াত। এতে দলের শীর্ষ নেতা, সংসদ সদস্য ও কেন্দ ীয় নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সাবেক ছাত্রশিবির নেতাদের যুক্ত করা হয়েছে। সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে একজন করে ছায়া মন্ত্রী রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ভিত্তিক একটি টিমও কাজ করবে। প্রয়োজনে উপমন্ত্রী পর্যায়েও দায়িত্ব বণ্টন করা হবে বলে জানিয়ে জামায়াত। সম্পাদকদের বৈঠকে আমিরের ঘোষণা ও আইনি দৃষ্টিভঙ্গি: রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে আয়োজিত সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের বিষযটি প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আনেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। সভায় তিনি জানান, এরই মধ্যে দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন সম্পন্ন হয়েছে এবং এর সদস্যদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও গতিশীল করা হয়েছে। খুব দ্রুতই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সকল সদস্যদের নাম জনগণের সামনে প্রকাশ করা হবে। দলের এই সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান আইনজীবী এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, মূলত নির্বাহী কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্তেই এটি গঠিত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, যেসব জ্যেষ্ঠ নেতা সংসদ সদস্য নন, কিন্তু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষ দক্ষতা রয়েছে, তাদেরও এই ছায়া মন্ত্রিসভার কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছে। কেবল সংসদীয় বিতর্কেই নয়, বরং রাজপথের বাইরেও সরকারের প্রতিটি ভুল সিদ্ধান্তের কারিগরি ও গঠনমূলক সমালোচনা নিশ্চিত করাই এই ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য। কী এই ছায়া মন্ত্রিসভা? ওয়েস্টমিনস্টার ব্যবস্থা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: সংসদীয় রাজনীতিতে 'ছায়া মন্ত্রিসভা' (মূলত কী এবং কীভাবে এটি কাজ করে? মূলত ওয়েস্টমিনস্টার বা ব্রিটিশ সংসদীয় গণতন্ত্র থেকে আগত এই ব্যবস্থাটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প সরকার কাঠামো। সহজ কথায়, মূল সরকারের একজন 'স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী' বা 'অর্থমন্ত্রী' থাকলে প্রধান বিরোধী দলেরও একজন নির্দিষ্ট 'ছায়ামন্ত্রী' থাকেন। ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যরা বাস্তবে কোনো দাপ্তরিক শাসনক্ষমতা বা সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন না। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বাজেট, গৃহীত প্রকল্প, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং দৈনন্দিন কর্মকা অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন তারা। সরকারের আসল মন্ত্রী যখন সংসদে কোনো নতুন আইন বা বিল উত্থাপন করেন, তখন ছায়ামন্ত্রী তার ত্রুটি তুলে ধরে বিকল্প রূপরেখা পেশ করেন। প্রথাগত বিরোধিতার বদলে বিকল্প প্রস্তাব ও নিবিড় নজরদারি: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতারা দাবি করছেন, প্রচলিত রাজপথ কেন্দি ক ও ধ্বংসাত্মক বিরোধিতার বাইরে গিয়ে তারা গবেষণানির্ভর রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চান। জামায়াতের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকারের প্রতিটি দপ্তরের বিপরীতে কেবল একজন ছায়ামন্ত্রীই থাকবেন না, বরং প্রয়োজনে উপমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী পর্যায়েরও দায়িত্ব বণ্টন করা হবে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ছায়ামন্ত্রিসভার সদস্যরা ইতোমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, জাতীয় বাজেট এবং সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম ১৮০ দিনের কর্মকা পর্যালোচনা শুরু করে দিয়েছেন। তারা প্রতিটি সেক্টরের জন্য বিকল্প 'পলিসি পেপার' তৈরি করছেন, যেন সরকার কোনো ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্ত নিলে তৎক্ষণাৎ জাতির সামনে বিকল্প সমাধান উপস্থাপন করা সম্ভব হয়। এর মাধ্যমে সংসদে ও সংসদের বাইরে একটি আধুনিক, সচেতন ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে চায় জামায়াত। জাতীয় রাজনীতি ও বিদ্যমান সংকট নিরসনে প্রভাব: বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের প্রধান ঘাটতি হলো বিরোধী দলগুলোর তথ্যভিত্তিক প্রস্তাবনার অভাব এবং সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক রূপান্তরের অভিজ্ঞতাহীনতা। জামায়াতে ইসলামীর এই ছায়া মন্ত্রিসভার উদ্যোগ যদি শেষ পর্যন্ত সঠিক প্রক্রিয়ায় ও দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দেশের সার্বিক রাজনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এটি সরকারকে ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য ও অপব্যবহার থেকে বিরত রাখতে সাহায্য করবে। কারণ মূল মন্ত্রীরা জানবেন যে, তাদের প্রতিটি ফাইল ও সিদ্ধান্তের ওপর বিরোধী দলের একজন সমমানের বিশেষজ্ঞ তীক্ষণ নজর রাখছেন। বিভিন্ন জাতীয় বা অর্থনৈতিক সংকটকালে বিরোধী দল কেবল হরতাল বা অন্ধ প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য সমাধান পেশ করতে পারবে। জামায়াতের নেতারা বলছেন, এই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের মূল লক্ষ্য তিনটি সরকারের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা, সরকারের ভুল বা দুর্বলতা চিহ্নিত করে বিকল্প পথ দেখানো এবং ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ নেতৃত্ব ও সম্ভাব্য মন্ত্রী তৈরি করা। অর্থাৎ শুধু বিরোধিতা নয়, সরকার পরিচালনার বিকল্প প্রস্তুতিও এই কাঠামোর অন্যতম উদ্দেশ্য। ছায়া মন্ত্রিসভার কার্যক্রম ব্যাখ্যা করে জামায়াতের শীর্ষ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, গঠনমূলক গণতান্ত্রিক রাজনীতি রয়েছে, এমন দেশগুলোয় বিরোধী দল সরকার গঠিত মন্ত্রিসভার পাশাপাশি একটি প্যারালাল বা ছায়া মন্ত্রিপরিষদ গঠন করে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, গঠনমূলক সমালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হয়। ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. স ম আলী রেজা বলেন, পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রে ছায়া মন্ত্রিসভা কোনো নতুন ধারণা নয় শক্তিশালী নাগরিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি রয়েছে এমন দেশগুলোয় এটি প্রতিষ্ঠিত চর্চা। তিনি বলেন, ছায়া মন্ত্রিসভা সরকারের ওপর একধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করে এবং বিরোধী দলকে গঠনমূলক সমালোচনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দেয়। সরকার বাজেট বা বড় কোনো নীতি প্রস্তাব দিলে সংশ্লিষ্ট ছায়া মন্ত্রীরাও বিকল্প বাজেট বা নীতিপ্রস্তাব জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেন। এতে তুলনামূলক আলোচনা তৈরি হবে এবং সরকারও প্রয়োজনীয় বিষয় গ্রহণের সুযোগ পাবে।



কমেন্ট বক্স
notebook

ছায়া মন্ত্রিসভার পথে বিরোধীদল, ক্ষমতার আয়নায় বিকল্প মুখ