চুয়াডাঙ্গায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার। তিনি বলেছেন, ‘মিলেমিশে বাল্যবিবাহের দাওয়াত খাওয়ার কালচার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এখন থেকে কোনো রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি বা চেয়ারম্যান-মেম্বার বাল্যবিবাহে অংশ নিলে তাদের আটক করা হবে।’ গতকাল বুধবার সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে নিকাহ রেজিস্ট্রারদের (কাজী) সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, ‘যেসব কাজী বাল্যবিবাহ পড়াবেন, তাদের নিবন্ধন বাতিল করা হবে এবং প্রয়োজন হলে সরাসরি জেলেও পাঠানো হবে।’ তিনি অভিযোগ করেন, জেলায় কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ‘লাভ ম্যারেজ’ বাড়ছে। নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরও বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। ১৪ বছর বয়সে বিয়ে এবং ১৬ বছরেই মা হওয়া এই পরিস্থিতির দায় কাজীরা এড়াতে পারেন না।
জেলা প্রশাসকের ভাষ্যমতে, কিছু কাজীর কাছে আলাদা দুটি রেজিস্টার বই থাকে, একটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য, অন্যটি অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। তারা স্থানীয় মৌলভীদের দিয়ে বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করে পরে বয়স পূর্ণ হলে তা নিবন্ধন করেন। তিনি এ ধরনের অনিয়ম বন্ধের নির্দেশ দেন। সভায় জানানো হয়, চুয়াডাঙ্গায় বাল্যবিবাহের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। জেলা প্রশাসক বলেন, ‘বাল্যবিবাহের দিক দিয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলা শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। তালাকের হারও বেশি। আমরা সবাই মিলে এই সমস্যা থেকে বের হতে চাই।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিএম তারিকুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় জেলা রেজিস্ট্রার লোকমান হোসেন, প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম সনি, জেলা মুসলিম নিকাহ রেজিস্ট্রার সমিতির সভাপতি এমএম শামসুল হকসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় উপস্থিত কাজীরা জানান, বহিরাগত কাজী, কিছু আইনজীবী, মাওলানা-মৌলভী, রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের চাপের কারণে অনেক সময় বাল্যবিবাহ ঠেকানো সম্ভব হয় না। এমনকি চাপ দিয়ে তাদের দিয়ে বাল্যবিবাহ পড়ানো হয়।
কুতুবপুর ইউনিয়নের কাজী মাহমুদুল হাসান ফুয়াদ বলেন, ‘আমি বাল্যবিবাহ পড়াই না বলে আমার এলাকায় স্বাভাবিক বিয়েতেও ডাক কমে গেছে। পাশের এলাকার কাজীরা এসব বিয়ে পড়ান। কিছু আইনজীবীও অবৈধভাবে বাল্যবিবাহ ও তালাকের কাজ করছেন।’ চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার স্যানিটারি ইন্সপেক্টর নাসরিন নাহার বলেন, বাল্যবিবাহের কারণে শিশুদের জন্মনিবন্ধন করতে নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে। অনেক শিশু জন্মসনদ না পাওয়ায় শিক্ষা ও সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এসব বক্তব্যের পর জেলা প্রশাসক বলেন, ‘কাজীদের সম্মান ধরে রাখতে হবে। ভুয়া কাজী বা সহকারী ধরা পড়লে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর বৈধ কাজী যদি বাল্যবিবাহ বা অবৈধ তালাকে জড়িত থাকেন, তাদের নিবন্ধন বাতিল করা হবে।’ তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘এখন থেকে কোনো বাল্যবিবাহের খবর পেলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট কাজী, নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের আগে আইনের আওতায় আনা হবে, এরপর অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলা হবে।’
নিজস্ব প্রতিবেদক