গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে হামলা শুরু করে। তাদের হামলায় মৃত্যু হয়েছে প্রায় তিন হাজার মানুষের। নিহতের তালিকায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও আছেন। এদিকে পাল্টা হামলায় ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে নিশানা বানায় ইরান। জর্ডান, ইরাক, সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ প্রায় এক ডজন দেশে হামলা চালায় তারা। এ যুদ্ধে প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়-ক্ষতির পাশাপাশি স্থবির হয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান পরিবহন ব্যবস্থা; অস্থিরতা তৈরি হয়েছে জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে।
এদিকে, বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি ‘পুরোপুরি’ খোলা রাখার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবাস আরাকচি গতকাল শুক্রবার এক্স পোস্টে লিখেছেন, ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যকার ১০ দিনের যুদ্ধ বিরতি কার্যকর থাকার সময় তেহরান গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি বাণিজ্যিক চলাচলের জন্য পুরোপুরি খোলা রাখবে। এ ঘোষণা আসার পর তেহরানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। লেবাননে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় সরাসরি আলোচনায় বসার বিষয়ে অগ্রগতি হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধের আশাবাদ আরও বেড়েছে। ইরানের হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানে যুদ্ধবিরতি, লেবানন ও ইসরাইল ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ৪০ দেশের ভার্চ্যুয়াল বৈঠকের ডাক- সবকিছু মিলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির আভাস দিচ্ছে বলেই মনে করছে বাকি বিশ্ব। তবে দ্বিতীয় দফা সংলাপ নিয়ে আশাবাদী পাকিস্তান। তারা বলছে, উভয় পক্ষ থেকেই ইতিবাচক সংকেত মিলছে। তবে পরিস্থিতি এখনও নাজুক।
হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত-ইরান:
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, লেবাননের যুদ্ধবিরতির মধ্যে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। লেবাননে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময়ে এই প্রণালি দিয়ে সব বাণিজ্যিক জাহাজ অতিক্রম করতে পারবে। লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা ইরানের অন্যতম দাবি ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল লেবাননে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোর তিনটা থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। এর আগে ৮ এপ্রিল ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। লেবাননও ওই যুদ্ধবিরতির আওতায় ছিল বলে বারবার বলে আসছিল ইরান। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানও সেটাই বলছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তা অস্বীকার করছিল। ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল। ইরান দ্বিতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত হলে গতকাল লেবাননে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। এরপর গতকাল ইরান বলল, লেবাননে যুদ্ধবিরতির ১০ দিন হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত থাকবে।
তেহরানকে ট্রাম্পের ধন্যবাদ:
হরমুজ প্রণালি ‘পুরোপুরি’ খোলা রাখার ঘোষণায় ট্রাম্প বলেন, ইরান এইমাত্র ঘোষণা করেছে যে, হরমুজ প্রণালি এখন পুরোপুরি খোলা এবং জাহাজ চলাচলের জন্য প্রস্তুত। ধন্যবাদ! তবে ধন্যবাদ জানালেও শান্তিচুক্তি না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ দিয়ে ইরানের তেল রপ্তানিতে মার্কিন অবরোধ অব্যাহত রাখার কথা বলেছেন তিনি। যদিও অবরোধের মধ্যে ইরানের তেলবাহী তিনটি ট্যাঙ্কারের পারস্য উপসাগর ত্যাগ করার তথ্য দিয়েছে কেপলার। সমুদ্রে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ‘ডিপ সি’, ‘সোনিয়া ১’ এবং ‘ডিওনা’ নামে তিনটি জাহাজে ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রয়েছে। তেহরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করার লক্ষ্যে গত সোমবার ইরানর বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ শুরু করে মার্কিন বাহিনী।
হরমুজ নিয়ে ৪০ দেশের ভার্চ্যুয়াল বৈঠক:
প্রায় ৪০টি দেশের নেতাদের নিয়ে গতকাল শুক্রবার একটি ভার্চ্যুয়াল বৈঠকের আয়োজন করেছে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত নৌপথ হরমুজ প্রণালি আবার চালুর উদ্যোগ নিয়ে এই বৈঠকে আলোচনা হবে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে তেহরান নিজেদের ছাড়া অন্যান্য জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন গত সোমবার ইরানের বন্দরে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজের ওপর অবরোধ আরোপ করে। যুক্তরাজ্য-ফ্রান্স আয়োজিত বৈঠকে প্রায় ৪০টি দেশের নেতারা ইরানের যুদ্ধবিরতি সমর্থনের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিশ্বনেতারা প্রণালিটি আবার চালু করতে একটি আন্তর্জাতিক মিশন গঠনের উদ্যোগ নেবেন।
লেবানন-ইসরাইল ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি:
অবশেষে লেবানন ও দখলদার ইসরাইলের মধ্যে ১০ দিনের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি গতকাল শুক্রবার থেকে কার্যকর হয়েছে। ইরানের কূটনৈতিক চাপের মুখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ইস্টার্ন টাইম গতকাল বিকেল ৫টা থেকে লেবাননে ১০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, আমি লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে চমৎকার আলোচনা করেছি। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বিকেল ৫টা (ইস্টার্ন টাইম) থেকে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির বিষয়ে সম্মত হয়েছেন। এই উদ্যোগ শান্তি প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে কাজ করবে। ট্রাম্প জানান, তিনি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন।
যে ৬ শর্তে লেবানন-ইসরাইল যুদ্ধবিরতি:
১. ২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল বিকাল ৫টা থেকে লেবানন ও ইসরাইল সব ধরনের শত্রুতা বন্ধ রাখবে। প্রাথমিকভাবে এই যুদ্ধবিরতি ১০ দিনের জন্য কার্যকর থাকবে, যা স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা চুক্তির লক্ষ্যে আলোচনার সুযোগ তৈরির জন্য নেওয়া হয়েছে; ২. আলোচনায় অগ্রগতি হলে এবং লেবানন তার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা দেখাতে পারলে, পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে; ৩. ইসরাইল আত্মরক্ষার অধিকার সংরক্ষণ করবে এবং সম্ভাব্য বা চলমান হামলার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। তবে এসময় লেবাননের ভেতরে স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে কোনো ধরনের আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযান চালাবে না; ৪. আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় লেবানন সরকার হিজবুল্লাহসহ অন্যান্য অনিয়ন্ত্রিত সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কোনো হামলা বা বৈরী কর্মকাণ্ড চালানো থেকে বিরত রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে; ৫. লেবাননের নিরাপত্তা বাহিনীই দেশটির সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় প্রতিরক্ষার একমাত্র দায়িত্বশীল শক্তি হিসেবে স্বীকৃত হবে; অন্য কোনো দেশ বা গোষ্ঠী এ দাবিদার হতে পারবে না; ৬. বাকি অমীমাংসিত বিষয়- বিশেষ করে আন্তর্জাতিক স্থলসীমা নির্ধারণসহ অন্যান্য ইস্যু সমাধানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে দুই দেশ, যাতে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হবে-ট্রাম্প:
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ‘সাফল্যের সঙ্গে’ এগোচ্ছে। এটি শিগগিরই শেষ হবে। নেভাদা অঙ্গরাজ্যের লাস ভেগাসে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, যুদ্ধের অগ্রগতি সন্তোষজনক এবং পরিস্থিতি দ্রুত শেষের দিকে যাচ্ছে। এর আগে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে চুক্তি করার ‘খুবই কাছাকাছি’ অবস্থানে রয়েছে। তেহরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরসহ ‘প্রায় সব কিছুতেই রাজি হয়েছে’। তবে ইরান এখনো বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। এর আগেও ইরানের পারমাণবিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অনেক দাবি করেছে, কিন্তু সেগুলো সত্যি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে ইরানের আলোচনা চলছে। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি আগামী মঙ্গলবার শেষ হওয়ার কথা।
সমীকরণ প্রতিবেদন