চুয়াডাঙ্গার প্রাণ ও মাতৃনদী হিসেবে পরিচিত মাথাভাঙ্গাসহ জেলার পাঁচটি নদ-নদীর অনেক অংশই এখন প্রভাবশালী দখলদারদের কবলে। নদী রক্ষা কমিশনের নির্দেশনায় সম্প্রতি জেলা প্রশাসন অবৈধ দখলদারদের একটি তালিকা প্রকাশ করলেও তালিকাটি অসম্পূর্ণ। অভিযোগ উঠেছে, জেলা প্রশাসনের এই তালিকায় অনেক বড় বড় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম বাদ পড়েছে। নদী বাঁচাও আন্দোলনের কর্মীরা একে অসম্পূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন।
গত ১২ মার্চ জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তালিকায় মাথাভাঙ্গা নদীর দখলদার হিসেবে মাত্র পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নাম স্থান পেয়েছে। এগুলো হলো- কেন্দ্রীয় মহাশ্মশান প্রগতি সেবা সমিতি, চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা, ওয়েভ ফাউন্ডেশন, রাফিদ পোল্ট্রি ফার্ম এবং ফারুক হোসেন নামক এক ব্যক্তির স্থাপনা। তবে এই তালিকায় স্থান পায়নি চুয়াডাঙ্গা পুলিশ পার্কসহ আরও বেশ কিছু বড় প্রতিষ্ঠানের নাম। এমনকি তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও দখলকৃত জমির পরিমাণ প্রকৃত পরিমাণের চেয়ে অনেক কম দেখানো হয়েছে বলে অভিজ্ঞদের মত।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চুয়াডাঙ্গা শহরের বুক চিরে বয়ে চলা মাথাভাঙ্গা নদীর জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে ‘পুলিশ পার্ক’। এনজিও ওয়েভ ফাউন্ডেশনের দখল প্রক্রিয়া আরও ব্যাপক। মালোপাড়ায় তাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সেপটিক ট্যাংক সরাসরি নদীর ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে, আছে মূল ভবনের স্থাপনাও এবং ফকিরপাড়ায় ‘গো গ্রিন সেন্টার’- নামে একটি বিশাল ক্যাম্পাস নদীর জায়গা গ্রাস করেছে। অথচ তালিকায় তাদের মাত্র একটি স্থানের কথা উল্লেখ আছে। একইভাবে রাফিদ পোল্ট্রি ফার্ম নদীর জায়গায় অবৈধ স্থাপনা ও ময়লা ফেলার ভাগাড় তৈরি করেছে।
অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী চিত্রা ও নবগঙ্গা নদীতে কোনো দখলদার নেই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, নবগঙ্গা নদীর মূল গতিপথের ওপর সরাসরি গড়ে তোলা হয়েছে সরকারি যুব উন্নয়ন ভবন। নদী খনন করা হলেও এই ভবনের কারণে নদীর অস্তিত্ব উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সরকারি জমি ক্রয় করে সরকার এই ভবন নির্মাণ করেছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী মুকুল হোসেন বলেন, ‘মাথাভাঙ্গা এই জেলার নদীগুলোর মা। এই নদী দখলমুক্ত করতে না পারলে চুয়াডাঙ্গার পরিবেশ ও অন্য নদীগুলোকে বাঁচানো সম্ভব হবে না।’ মাথাভাঙ্গা নদী বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ (অবসরপ্রাপ্ত) শাহজাহান আলী প্রশাসনের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শত শত দখলদার থাকলেও তালিকায় নাম এসেছে মাত্র পাঁচটির। ওয়েভ ফাউন্ডেশনের দুটি স্পট থাকলেও দেখানো হয়েছে একটি। পুলিশ পার্কের নাম নেই। এটি একটি একচোখা তালিকা। প্রশাসনের সদিচ্ছা ছাড়া নদী রক্ষা অসম্ভব।’
আন্দোলনের প্রচার সম্পাদক ও সাংবাদিক মেহেরাব্বিন সানভী বলেন, ‘জেলা প্রশাসন যে তালিকা তৈরি করেছে সেটি অসম্পূর্ণ। জেলা প্রশাসন নদীগুলোর খোঁজ না নিয়েই বা অভিজ্ঞদের সাথে আলোচনা না করেই তালিকা তৈরি করেছে। আমাদের সাথে কোনো যোগাযোগও করা হয়নি।’
তালিকার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর ও সিনিয়র সহকারী কমিশনার এস এম আশিস মোমতাজ বলেন, ‘এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। দখলদারদের তালিকাটি আরও বিশদভাবে যাচাই করা হবে। নতুন কেউ স্থাপনা করলে বা আপনারা তথ্য দিলে আমরা তা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করব।’ তবে পুলিশ পার্ক বা নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার এ বিষয়ে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘আমি এই জেলায় নতুন যোগদান করেছি। বিষয়টি এখনো বিস্তারিত জানি না। তবে আমি ফাইলপত্র দেখে খোঁজ নেব এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করব।’
সমীকরণ প্রতিবেদন