দেশের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ আছে। স্বৈরাচারী সরকারের নির্বিচার লুটপাটে অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল। সেই সরকারের পতনের পর গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতির ক্রমাগত ধস রোধ করেছে। বিপুল বৈদেশিক ঋণের অর্থ পরিশোধ করেছে। সেই সাথে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এক ধরনের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছে। এখন নতুন নির্বাচিত সরকার কতটা এগিয়ে নিতে পারে সেদিকে মানুষ দৃষ্টি ফেরাবে। তবে এ মুহূর্তে অর্থনীতির যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে আশাবাদের কারণ যেমন আছে, তেমনি শঙ্কাও রয়েছে। নয়া দিগন্তে গতকাল প্রকাশিত রিপোর্টে অর্থনীতির যে চালচিত্র উঠে এসেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, দেশের শেয়ারবাজারের অবস্থা আগের মতো নাজুক, এখন ঢাকা ও চট্টগ্রাম দুই বাজারে চলছে টানা দরপতন। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং করপোরেট মুনাফার নিম্নগতি অব্যাহত। বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বস্তিকর পরিবেশ এখনো আসেনি। আমদানি-রফতানির ব্যবধান এখনো কিছুটা বাড়ছে। অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আমদানি কিছুটা বাড়লেও রফতানি কমেছে। পোশাক খাত ঘুরে দাঁড়ালেও নানা কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা, সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে ঋণপ্রবাহের ভারসাম্যহীনতা, উচ্চ সুদহার, বিপুল খেলাপি ঋণ অর্থনীতির বড় সমস্যা। তবে কিছুটা স্বস্তির কারণ প্রবাসী আয়ের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি, রিজার্ভের স্বস্তিকর স্থিতি ইত্যাদি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২৪ সালে ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যাওয়ার পর এখন ৩০-৩৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা স্বস্তিকর। তবে এটি টেকসই রফতানি-প্রবাহ বা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কারণে হয়নি। হয়েছে রেমিট্যান্স-প্রবাহে বৃদ্ধি, আমদানি কমানো, মুদ্রানীতিতে কড়াকড়ির কারণে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে সবার আগে দরকার শিল্পভিত্তিক প্রবৃদ্ধি। এ জন্য শিল্পকাঠামো মজবুত করতে হবে। দরকার বিনিয়োগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। এ জন্য ব্যাংক খাতের সংস্কার করতে হবে সবার আগে। আওয়ামী সরকারের সময় ব্যাংক খাত ধ্বংসের প্রান্তে চলে যায়। শিল্প খাতে ঋণ দেয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বিনিয়োগ কমে যায় এবং অর্থনীতি নাজুক অবস্থায় পড়ে। এখনো সে অবস্থা কাটিয়ে ওঠা যায়নি। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের বক্তব্য থেকে কিছু দিকনির্দেশনা পাওয়া সম্ভব। তারা ব্যাংক খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণের বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া, পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রফতানি বহুমুখীকরণের কথা বলেছেন। সুদহার কমিয়ে বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ এবং নীতিগত স্থিতিশীলতার ওপর জোর দেন অনেকে। নতুন সরকারের সামনে অর্থনীতি হবে সম্ভবত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কাঠামোগত সংস্কার না করলে চাপ সামলানো কঠিন হতে পারে। নতুন সরকার এর মধ্যে জাতিসঙ্ঘের কাছে চিঠি লিখে এলডিসি থেকে দেশের উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেয়ার অনুরোধ করেছে। বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের কথা ছিল চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর। সেটি ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়াতে চায় সরকার। চিঠিতে বলা হয়েছে, সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করা, চলমান সংস্কারগুলো সংহত করা এবং অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে এই সময় দরকার। সরকার কী উপায়ে অর্থনীতি এগিয়ে নেবে তা-ই এখন দেখার বিষয়।
প্রধান সম্পাদক