বাংলাদেশে ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে বলে মূল্যায়ন করেছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দেশটির কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিমের (সিপিআইটি) প্রকাশিত এক ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং জনপরিসরে মতপ্রকাশের সুযোগ বেড়েছে। তবে দুর্নীতি দমন, পুলিশ প্রশাসনের সংস্কার ও কাঠামোগত পরিবর্তন বাস্তবায়নে এখনো বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
প্রতিবেদনটি তৈরির অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তিন কর্মকর্তা ২০২৬ সালের ৭ থেকে ১৫ জুন বাংলাদেশ সফর করেন। এ সময় তাঁরা সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। শেখ হাসিনার পদত্যাগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন তাঁরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তুলনায় বর্তমানে রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন ও সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের সুযোগ বেড়েছে। রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া, সভা-সমাবেশ আয়োজন এবং বিভিন্ন বিষয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করার ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীনতা রয়েছে বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
নির্বাচনের পর কমেছে রাজনৈতিক সহিংসতা:
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রতিবেদনে সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবারের নির্বাচনে সহিংসতার মাত্রাও কম ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে বলে প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের কর্মসূচি পালন, প্রচারণা, প্রতিবাদ ও সরকারের সমালোচনা করার সুযোগ পাচ্ছে। তবে কিছু এলাকায় এখনো বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার পেছনে স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং সম্পদ দখলসংক্রান্ত বিরোধের মতো বিষয়কে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের কর্মীদের পরিস্থিতি:
আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলটি নিষিদ্ধ থাকায় প্রকাশ্যে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ সীমিত। বিগত সরকারের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ঘিরে সহিংসতার ঘটনায় দলটির প্রতি জনঅসন্তোষও এখনো রয়েছে। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দুর্নীতি, সহিংসতা বা নিপীড়নের সঙ্গে যুক্ত নন- এমন অনেক তৃণমূল কর্মী ও সাধারণ সমর্থক নিজ নিজ এলাকায় বসবাস করছেন। অন্যদিকে, প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান নিলে কিছু ক্ষেত্রে হয়রানি কিংবা সামাজিক প্রতিরোধের মুখে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দলটির কিছু সদস্য অন্য রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েছেন, কেউ দেশের অন্য এলাকায় চলে গেছেন, আবার কেউ বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
২১ হাজারের বেশি মামলা বাতিলের তথ্য:
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টিও প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে এতে বলা হয়েছে, আগের আমলের ২১ হাজারের বেশি রাজনৈতিক ও কথিত মিথ্যা মামলা বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া পুরোনো অন্যান্য মামলার আইনগত পর্যালোচনা এখনো চলছে। তবে আওয়ামী লীগের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা, কর্মী এবং সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা বিগত সরকারের সময়কার কর্মকাণ্ড ও জুলাই আন্দোলন ঘিরে বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগে ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হচ্ছেন। এসব মামলার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ও সাধারণ আদালতে চলছে। কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পেলেও অনেকে বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালে আটক রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংস্কার ও দুর্নীতি দমনে এখনো চ্যালেঞ্জ:
রাজনৈতিক পরিবেশে অগ্রগতির কথা তুলে ধরলেও বাংলাদেশের সামনে থাকা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের বিষয়টি এড়িয়ে যায়নি যুক্তরাজ্যের প্রতিবেদন। দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ, পুলিশ প্রশাসনের কর্মক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং বাহিনীটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা এতে উঠে এসেছে। এছাড়া গণঅভ্যুত্থানের পর প্রস্তাবিত বিভিন্ন কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নের গতি নিয়েও নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের সামগ্রিক মূল্যায়নে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে অগ্রগতির চিত্র উঠে এলেও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সুশাসন, জবাবদিহি, পুলিশি সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে।
সমীকরণ প্রতিবেদন