দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, সরকারি ব্যয়ে সাশ্রয় এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার বার্তা দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অথচ সরকারের ভেতরেই একের পর এক মন্ত্রী-এমপি ও তাদের স্বজনদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। সরকারি কাজের বরাদ্দ, সারের ডিলার নিয়োগ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নানা ঘটনায় প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। এতে শুধু বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরেই নয়, ক্ষোভবাড়ছে ক্ষমতাসীন দলের তৃণমূলেও। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা উপেক্ষা করে এমন কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে সরকারের ভাবমূর্তি ও জনআস্থা বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের ঘোষিত নীতি ও এর প্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে এমন বৈপরীত্য জনমনে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। দেশের কল্যাণে প্রধানমন্ত্রী যে অবস্থান তুলে ধরছেন, সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ তার বিপরীত পথে হাঁটছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দল ও সরকার, প্রশ্নের মুখে পড়ছে দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকারের বিশ্বাসযোগ্যতা। সম্প্রতি রাজধানীর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির একজন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের জন্য ট্যাবলেট-প্যাড কেনায় ৩৪২ কোটি টাকার কাজ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এ কাজের সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াৎ হোসেনের স্বজনদের সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং দরপত্রে প্রতিযোগিতার সুযোগ না দিয়েই কাজটি পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সংসদ সদস্য ও এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরও এ নিয়ে প্রকাশে সমালোচনা করেছেন। সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার প্রশ্নে তাদের প্রতিক্রিয়া নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
শুধু সরকারি কাজের বরাদ্দ নয়, কৃষি খাতের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ সারের ডিলার নিয়োগ নিয়েও উঠেছে স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ। দেশের বিভিন্ন স্থানে ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভছড়িয়েছে ক্ষমতাসীন দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে নিন্দা জানিয়েছে এবং সুষ্ঠু তদন্তের দাবি করেছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভপ্রকাশ করেছেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. রায়হান ফেরদৌস সজীব। গত শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া এক ফেসবুক পোস্টে তিনি
লেখেন, 'সারের ডিলারশিপ না দেন, বিষের ডিলারশিপ দেন-ত্যাগী কর্মীরা মরে যাক।' তার এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। দলের তৃণমূল পর্যায়ের একজন নেতার এমন প্রকাশ্য ক্ষোভ ডিলার নিয়োগ ঘিরে অসন্তোষের বিষয়টি সামনে এনেছে। এর আগে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ছেলেদের নামে ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। এ নিয়ে সরকার ও দলের ভেতরেও অস্বস্তি দেখা দেয়। পরে তার পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৭১ কোটি টাকার সরকারি কাজের জন্য ডিও লেটার দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসে। একইভাবে গত জুলাইয়ে ময়মনসি- ংহ-১১ (ভালুকা) আসনের বিএনপি সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর বিরুদ্ধে তৈরি পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসা জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় তাকে শোকজ করা হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর স্বজনদের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের কাজ পাওয়ার অভিযোগ: সাম্প্রতিক বিতর্কগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর স্বজনদের সম্পৃক্ততায় ৩৪২ কোটি টাকার ট্যাবলেট-প্যাড কেনার কাজ নিয়ে ওঠা অভিযোগ। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনের নির্দেশনা উপেক্ষা করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই সরাসরি এ কাজ দেওয়া হয়েছে। এতে সহায়তার অভিযোগ উঠেছে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ছোট ভাই সরদার তোফাজ্জল হোসেন লিয়াকতের বিরুদ্ধে। তিনি নরসিংদী জেলা বিএনপির সহসভাপতি।
অভিযোগ রয়েছে, ৩২০ কোটি টাকার অ্যান্ড্রয়েড ট্যাবলেট কেনার প্রক্রিয়ায় নৌবাহিনীর সঙ্গে এমন দুটি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হয়েছে, যার একটির মালিকানায় রয়েছেন লিয়াকতের ছেলে সরদার রাফিদ এস এ হোসেন ও মেয়ে অনিকা রাইদা লিয়া। খুচরা বাজারে ২১ হাজার থেকে ৩৪ হাজার টাকায় পাওয়া যায়, এমন ট্যাবলেট সরকারের কাছে ৪৮ হাজার টাকায় বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। নৌবাহিনীর সঙ্গে সম্পাদিত পৃথক চুক্তির তথ্য তুলে ধরে অভিযোগ করা হয়েছে, বুরাক ব্রেক ও সেলেক্সট্রা নামের দুটি প্রতিষ্ঠান নৌবাহিনীকে যে ট্যাবলেট ২৬ হাজার টাকায় সরবরাহ করবে, তা-ই নৌবাহিনী সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে ৪৮ হাজার টাকায় বিক্রি করবে। এভাবে ৬৭ হাজার ট্যাবলেট সরবরাহের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রায় ১০০ কোটি টাকা মুনাফার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। নৌবাহিনীর শিপইয়ার্ডকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করে কাজটি নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া প্রায় ২৬ হাজার হুইলচেয়ার আমদানির ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নমুনা পরীক্ষায় ৬৮ শতাংশ হুইলচেয়ারে ত্রুটি পাওয়া গেলেও মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান এসজিএসের ছাড়পত্র ছাড়াই সেগুলো বাংলাদেশে আমদানি করে নৌবাহিনী। এ প্রক্রিয়ার পেছনেও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাই লিয়াকতের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে ক্রয়প্রক্রিয়া, চুক্তিপত্র, মান যাচাইয়ের প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত জরুরি। দল ও সরকারের জন্য সতর্কবার্তা: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মন্ত্রী-এমপি কিংবা তাদের স্বজনদের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগই সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। বিশেষ করে সরকারি অর্থ ব্যয়, কৃষি উপকরণ বিতরণ এবং রাষ্ট্রীয় ক্রয়প্রক্রিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠলে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। অভিযোগগুলোর দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে জনমনে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। তাদের মতে, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের একাংশের মধ্যেও যখন নিয়োগ ও বরাদ্দ নিয়ে বৈষম্য এবং বঞ্চনার অভিযোগ বাড়ছে, তখন বিষয়টি কেবল বিরোধী দলের রাজনৈতিক সমালোচনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তৃণমূলের ক্ষোভ দলের সাংগঠনিক ভিত্তিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। সরকারের ঘোষিত নীতি বাস্তবায়নে মন্ত্রী-এমপিদের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করা তাই জরুরি।
বিশ্লেষকদের পরামর্শ, সরকারি ক্রয় ও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মন্ত্রী-এমপিদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বার্থের সংঘাত এড়াতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে দলীয় পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের সঙ্গে সরকারের বাস্তব কর্মকাণ্ডের ব্যবধান আরও স্পষ্ট হবে, যার দায় শেষ পর্যন্ত দল ও সরকারকেই বহন করতে হতে পারে।
সমীকরণ প্রতিবেদক