বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর। পাশে প্রতিবন্ধী ছেলে। সংসারে নেই সচ্ছলতা, নেই সঞ্চয়। তবু পেটের দায়ে প্রতিদিন পাখি ভ্যান নিয়ে বের হতেন আসাদুল হক। দিন শেষে যা আয় হতো, তা দিয়েই চলত দুজনের খাবার ও প্রতিবন্ধী ছেলের ওষুধ। সেই ভ্যানটিই এখন নেই। গত ১৩ সেপ্টেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার বেলগাছি গ্রামে বাড়ির উঠান থেকে চুরি হয়ে যায় তাঁর পাখি ভ্যান। ভ্যানটি হারানোর পর থেকে আয় বন্ধ। ঘরে খাবারের সংকট। প্রতিবন্ধী ছেলের ওষুধ কেনার সামর্থ্যও নেই।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আসাদুল বলেন, ‘আমরা গরিব বলে আমাদের দেখার কেউ নেই। বিষ কেনার টাকা থাকলেও খেয়ে ওপারে চলে যেতাম। কিন্তু আমার প্রতিবন্ধী ছেলেটাকে রেখে কীভাবে যাব?’ কথাগুলো বলার সময় চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি তিনি। ভ্যানটি ছিল তাঁর কাছে শুধু একটি যানবাহন নয়, ছিল বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। ভ্যান চালিয়ে যে টাকা পেতেন, সেটিই ছিল পরিবারের খাবার ও ছেলের চিকিৎসার ভরসা। সেই অবলম্বনটুকু চুরি হয়ে যাওয়ার পর এখন অসহায় হয়ে পড়েছেন তিনি।
আসাদুল জানান, বেলা সাড়ে ১২টার দিকে দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে করে এসে তাঁর পাখি ভ্যানটি নিয়ে যায়। দিনের বেলায় বাড়ির উঠান থেকে ভ্যান চুরি হওয়ার পর বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেন তিনি। পরে পরদিন আলমডাঙ্গা থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন। ভ্যান ফিরে পাওয়ার আশায় থানার সামনে বসেও অপেক্ষা করেছেন তিনি। মনে ছিল ক্ষীণ একটি আশাÑহয়তো পুলিশ তাঁর জীবনের একমাত্র অবলম্বনটি উদ্ধার করে দেবে। কিন্তু অভিযোগের ২০ দিন পেরিয়ে গেলেও ভ্যানটির সন্ধান মেলেনি।
আসাদুল বলেন, ‘রাতে ভ্যানটা চুরি হলে হয়তো নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম। কিন্তু দিনের বেলায় বাড়ির উঠান থেকে নিয়ে গেল। আমি নিজের ভাগ্যকেই দোষ দিই।’ এরপর কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি বলেন, ‘এই ভ্যানটা হারিয়ে আমি শুধু একটা ভ্যান হারাইনি। আমার ছেলের ওষুধের টাকা হারিয়েছি, স্বামী হিসাবে বৃদ্ধ বয়সে স্ত্রীর মুখে খাবার তুলে দেওয়ার পথ হারিয়েছি, সংসার চালানোর পথ হারিয়েছি। ভ্যান হারানোর পর থেকে কীভাবে দিন কাটছে, তা শুধু আমি আর আমার পরিবারই জানি। ক্ষুধার যন্ত্রণায় রাতে পেটে বালিশ চেপে ধরে ছটফট করে রাত পার করি। তবুও মনে একটা আশা, এই বুঝি আমার ভ্যানটা ফিরে পাব, আবার ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাতে পারব, আমার প্রতিবন্ধী ছেলেটার মুখে খাবার তুলে দিতে পারব। সেই আশাতেই প্রতিদিন অপেক্ষা করছি।’
এ বিষয়ে আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহিনুর আক্তার (ইউএনও) বলেন, ‘ভ্যান চুরি হয়ে গেছে, এটা দুঃখজনক বিষয়। তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়ে একটি ভ্যান দেওয়ার মতো তেমন কোনো অপশন নেই।’
প্রতিবেদক, আলমডাঙ্গা