বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি
পাট চাষে এবার লাভের মুখ দেখছেন না চুয়াডাঙ্গার কৃষকেরা

আসছেন না বাইরের ক্রেতা, ন্যায্যমূল্য নিয়ে দুশ্চিন্তা!

  • আপলোড তারিখঃ ১১-০৮-২০২৬ ইং
আসছেন না বাইরের ক্রেতা, ন্যায্যমূল্য নিয়ে দুশ্চিন্তা!

দেশের ঐতিহ্যবাহী অর্থকরী ফসল ‘সোনালি আঁশ’ পাট চাষ করে এবারও চরম হতাশার মুখে পড়েছেন চুয়াডাঙ্গার কৃষকেরা। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারে কাক্সিক্ষত দাম না পাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় দিন কাটছে তাদের। জেলার বোয়ালিয়া, ভুলটিয়া, দশমী, মতুজাপুর, আসানন্দপুর, কুতুবপুর, পদ্মবিলা, শংকরচন্দ্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকার পাটচাষিরা একই সংকটের কথা জানিয়েছেন।


কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে পাট চাষ থেকে শুরু করে কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, শুকানো ও বাজারজাত করা পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। এর মধ্যে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, আগাছা পরিষ্কার, শ্রমিকের মজুরি, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও পরিবহন খরচ রয়েছে। বর্তমানে একজন শ্রমিককে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টাকা মজুরি দিতে হচ্ছে।


এক বিঘা জমিতে গড়ে প্রায় ৮ থেকে ১০ মণ পাট উৎপাদন হয়। সরকারি নির্ধারিত দাম যদি প্রতি মণ ২ হাজার ৫০০ টাকা ধরা হয়, তাহলে ৮ মণ পাট বিক্রি করে একজন কৃষক সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পান। অথচ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে খরচ হয় প্রায় ১৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ সব খরচ বাদ দিলে এক বিঘায় কৃষকের হাতে থাকে মাত্র প্রায় ৫ হাজার টাকা। এর মধ্যেও জমির ইজারা, কৃষকের নিজের শ্রম, পরিবহনসহ অনেক খরচ হিসাবের বাইরে থেকে যায়। ফলে বাস্তবে এই আয়কে লাভজনক মনে করছেন না চাষিরা।


কৃষকরা বলছেন, এক বিঘা জমিতে সারা মৌসুম পরিশ্রম করে যদি মাত্র কয়েক হাজার টাকা আয় হয়, তাহলে পাট চাষ করে কৃষকের সংসার চলবে কীভাবে? এ কারণে অনেক কৃষক আগামী মৌসুমে পাট চাষ কমিয়ে দেওয়ার কথাও ভাবছেন।
এদিকে, জেলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী পাইকারি পাটের বাজার সরোজগঞ্জ বাজারেও আগের মতো প্রাণচাঞ্চল্য নেই। একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে ঢাকা থেকে বড় বড় ব্যবসায়ীরা সরোজগঞ্জে এসে সরাসরি বিপুল পরিমাণ পাট কিনে নিয়ে যেতেন। এতে বাজারে ক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকায় কৃষকরাও তুলনামূলক ভালো দাম পেতেন। কিন্তু বর্তমানে ঢাকার বড় ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি অনেকটাই কমে যাওয়ায় স্থানীয় আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে কৃষকদের। ফলে ক্রেতা কম থাকায় বাজারে প্রতিযোগিতা কমেছে এবং পাটের দামও কাক্সিক্ষত পর্যায়ে উঠছে না।


বোয়ালিয়া গ্রামের পাটচাষি আবুল মিয়া বলেন, পাট চাষে অনেক পরিশ্রম ও খরচ হয়। এক বিঘা জমিতে প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ করে যদি ৮ মণ পাট পাই, তাহলে সরকারি দামে ২০ হাজার টাকা বিক্রি হবে। সব খরচ বাদ দিলে হাতে থাকে খুব সামান্য টাকা। নিজের শ্রমের কোনো দামই থাকে না। এভাবে পাট চাষ করে কৃষক কীভাবে লাভবান হবে?


দশমী এলাকার দিনমজুর আব্দুর রহমান বলেন, পাটের মৌসুমে আমরা কাজ করে সংসার চালাই। কৃষক যদি পাটের ভালো দাম না পান, তাহলে তারাও খরচ কমানোর চেষ্টা করেন। এতে আমাদের কাজও কমে যায়। কৃষক ও শ্রমিক- দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।


সরোজগঞ্জ বাজারের পাট ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম সুমন বলেন, আগে ঢাকা থেকে বড় বড় ব্যাপারীরা সরোজগঞ্জ বাজারে এসে সরাসরি পাট কিনতেন। এখন তাদের উপস্থিতি অনেক কম। বড় ক্রেতা কম থাকায় বাজারে প্রতিযোগিতা নেই। ফলে কৃষকরাও আগের মতো ভালো দাম পাচ্ছেন না।


সিঙ্গাপুর প্রবাসী জুয়েল রানা  বলেন, আমাদের পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি। বিদেশে থেকেও পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, পাটের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা দুশ্চিন্তায় আছেন। পাটশিল্পকে শক্তিশালী করা, পাটকলগুলো সচল করা এবং পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো গেলে কৃষকরা উপকৃত হবেন।


পাটচাষিরা মনে করেন, বাংলাদেশের পাটশিল্প ও পাটকলগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু থাকলে পাটের চাহিদা বাড়বে। পাশাপাশি পাট ও পাটজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকরা উৎপাদিত পাটের ভালো দাম পাবেন।



কমেন্ট বক্স