মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

জনবল ও যন্ত্রপাতিহীন শত কোটি টাকার সরকারি প্রতিষ্ঠান এখন মৃতপ্রায়

২০ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি ঝিনাইদহের ৭টি প্রতিষ্ঠান
  • আপলোড তারিখঃ ১৯-০৫-২০২৬ ইং
জনবল ও যন্ত্রপাতিহীন শত কোটি টাকার সরকারি প্রতিষ্ঠান এখন মৃতপ্রায়

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলে ঝিনাইদহে নির্মিত ও উদ্বোধনকৃত ৭টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অবহেলার শিকার হয়ে মৃতপ্রায় অবস্থায় পড়ে আছে। শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু বিএনপির অবদান ও ফলকে খালেদা জিয়ার নাম থাকার কারণে পূর্ণাঙ্গ জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়নি। ফলে কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় ভবন ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হচ্ছে, আর চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে জনকল্যাণ ও শিক্ষা কার্যক্রম।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিএনপির ১৯৯৩ ও ২০০১ সালের বিভিন্ন সময়ে ঝিনাইদহ অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে এই মেগা প্রকল্পগুলো হাতে নেওয়া হয়েছিল। খালেদা জিয়ার নির্দেশে সাবেক সাংসদ মরহুম মসিউর রহমান এই প্রতিষ্ঠানগুলো নির্মাণে বিশেষ অবদান রাখেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ দুই দশক ধরে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হাসিনা সরকারের এক অদৃশ্য ‘রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা’ আরোপ করে রাখা হয়। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমল থেকেই এসব প্রতিষ্ঠান পঙ্গু করে অচল রাখা হয় বলে অভিযোগ।


এর মধ্যে উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ের ‘ঝিনাইদহ সরকারি খাবার স্যালাইন ফ্যাক্টরি’ প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ফেলে রেখে শেষ পর্যন্ত বাতিলই করে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে হৃদরোগীদের জরুরি চিকিৎসার জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ‘করোনারি কেয়ার ইউনিট’ স্থাপন করা হলেও তা আজ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। সিসিইউ চালুর জন্য প্রয়োজনীয় কোনো যন্ত্রপাতি ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বিগত ২০ বছরেও দেওয়া হয়নি।


২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ঝিনাইদহে বাংলাদেশের একমাত্র ২৫ শয্যাবিশিষ্ট সরকারি শিশু হাসপাতালটি উদ্বোধন করেন। কিন্তু উদ্বোধকের নাম দেশনেত্রীর নাম থাকায় হাসপাতালটিতে কোনো রকম জনবল দিলেও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম দেওয়া হয়নি। ফলে আধুনিক এই বিশেষায়িত হাসপাতালটি শিশুদের কাক্সিক্ষত চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।


ঝিনাইদহ মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (ম্যাটস)-এর চিত্র আরও ভয়াবহ। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী কোনো জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। অনুমোদিত ১০৪টি পদের মধ্যে ১০৪টিই খালি! বর্তমানে তিন বর্ষ মিলিয়ে ১৫৬ জন শিক্ষার্থী থাকলেও মাত্র দুইজন অতিথি শিক্ষক দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।


ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডা. তানজিনা নওশিন এবং শৈলকূপা হাসপাতালের চিকিৎসক ও অতিথি শিক্ষক ডা. জে এম খসরু আল মামুন রেজা দীর্ঘদিন ধরে এখানে দায়িত্ব পালন করলেও তারা কোনো সরকারি বেতন-ভাতা পান না। শিক্ষার্থীদের ভর্তির টাকা দিয়ে স্কুলের অতি জরুরি দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো হচ্ছে। নিয়োগ ও সরকারি সহায়তা বন্ধ থাকায় চরম সংকটে পড়া এই প্রতিষ্ঠানে গত ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষে নতুন কোনো ছাত্র ভর্তি করা সম্ভব হয়নি।


শহরের চাকলাপাড়ায় অবস্থিত ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি) প্রতিষ্ঠানটিও বিএনপি সরকারের অবদান হওয়ায় ২০ বছরেও পূর্ণাঙ্গতা পায়নি। এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৮টি পদ সম্পূর্ণ খালি। এছাড়া শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের জন্য সবচেয়ে জরুরি ‘রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং’ বিভাগে কোনো মেশিনই নেই। ‘রেডিও থেরাপি’ ল্যাবের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকায় শিক্ষার্থীদের ল্যাব ও ব্যবহারিক শিখন কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একই অবস্থা হরিণাকুণ্ডু নার্সিং সেবা ইনস্টিটিউট এবং ঝিনাইদহ ২৫০ বেড হাসপাতাল সংলগ্ন আঞ্চলিক নার্সিং ইনস্টিটিউটের। পর্যাপ্ত জনবল ও বরাদ্দের অভাবে এই দুটি প্রতিষ্ঠানও বছরের পর বছর ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।


এদিকে, ঝিনাইদহ শহরের চাকলাপাড়ায় তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে প্রায় ৯ বিঘা জমির ওপর ৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছিল খুলনা বিভাগের একমাত্র ‘মুক ও বধির আবাসিক স্কুল’। কিন্তু বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বিএনপির নাম থাকার কারণে প্রতিষ্ঠানটি বরাবরের মতোই চরম অবহেলিত ও বৈষম্যের শিকার থেকেছে।


বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী ৯টি পদের মধ্যে আছে মাত্র ৩ জন। ৬টি পদ শুন্য রয়েছে। ৩ জন ধারের শিক্ষক দিয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের কোনোমতে পাঠদান করানো হচ্ছে। এছাড়া আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে যে ৬ জন কর্মচারী এখানে কর্মরত, তারাও নিয়মিত বেতন পান না বলে অভিযোগ। ফলে মানবিক কারণে গড়ে ওঠা এই বিশাল প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষকের অভাবে এখন পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়েছে।


ঝিনাইদহ জেলা পরিষদের প্রশাসক আব্দুল মজিদ অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক সংকীর্ণতার কারণে জনগুরুত্বপূর্ণ এসব সরকারি প্রতিষ্ঠানকে দুই দশক ধরে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় এবং এই অঞ্চলের মানুষের সাথে চরম অন্যায়। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দ্রুত এসব সরকারী প্রতিষ্ঠান চালুর দাবী জানান।


ঝিনাইদহ সিভিল সার্জন ডা. কামরুজ্জামান সোহেল জানান, হাসিনা সরকারের আমলে স্বাস্থ্য সেবা থেকে পৃথক করে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর চালু করা হয়। ফলে ঝিনাইদহের ম্যাটস, আইএইচটিসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানগুলো এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। তিনি জানান, শিশু হাসপাতালটি মোটামুটি চলছে, কিন্তু আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। দুটি নার্সিং ইনস্টিটিউট জনবলের অভাব রয়েছে। ঝিনাইদহ সরকারি খাবার স্যালাইন ফ্যাক্টরি ও করোনারী কেয়ার ইউনিট চালু করার জন্য চেষ্টা চলছে। খুব দ্রুতই এই দুটি প্রতিষ্ঠান সফলতার মুখ দেখতে পারবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।



কমেন্ট বক্স
notebook

৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি অনুমোদন