শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

বিএনপির ঘাঁটিতে জামায়াতের উত্থান, নেপথ্যের কারণ কী

ভরাডুবিতে ঝিনাইদহে বিএনপির তৃণমূলে হতাশা
  • আপলোড তারিখঃ ২৭-০২-২০২৬ ইং
বিএনপির ঘাঁটিতে জামায়াতের উত্থান, নেপথ্যের কারণ কী

আসিফ কাজল, ঝিনাইদহ:
দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ঝিনাইদহের তিনটি সংসদীয় আসনে ভরাডুবির পর দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে গভীর হতাশা নেমে এসেছে। নির্বাচন শেষের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত চায়ের দোকানগুলোতে পরাজয়ের কারণ নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।


১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা চার নির্বাচনে জেলার চারটি আসনে জয় পেয়ে বিএনপি শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায় এবং তৃতীয় শক্তি হিসেবে থাকা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শক্ত অবস্থান তৈরি করে। তৃণমূলের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতাকর্মীদের দিয়ে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাওয়ানো বড় ভুল ছিল। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কিছু চিহ্নিত নেতাকর্মী প্রকাশ্যে প্রচারণায় অংশ নেওয়ায় নির্যাতিত বিএনপি পরিবারগুলো ক্ষুব্ধ হয়ে গোপনে জামায়াতের পক্ষে ভোট দেন। এছাড়া দলীয় কোন্দল, দুর্বল প্রার্থী মনোনয়ন, চাঁদাবাজি, জমি দখল, সালিশে অনিয়ম, হাট-বিল দখল ও কিছু নেতার অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ তৈরি করেছিল।


তথ্য নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির অনেক সমর্থক এমনকি গ্রাম ও ইউনিয়নের নেতার স্ত্রী সন্তানরা জামায়াতের পক্ষে ভোট করেছেন। এমনও দেখা গেছে স্বামী বিএনপির ওয়ার্ড সভাপতি, কিন্তু স্ত্রী জামায়াতের রুকন। এ কারণে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিএনপির এমন চার নেতাকে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। মূলত তারা বিএনপির পক্ষে ভোট করেননি। আবার ঝিনাইদহের জাহেদী ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রভাবশালী বড় প্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার কর্মী সমর্থক শেষ মুহূর্তে বিএনপির প্রার্থীর উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। তাদের ভোট ব্যাংক নির্বাচনে বড় একটি ব্যবধান গড়ে দেয়।


তৃণমূল বিএনপির অভিযোগ, সদর উপজেলার মধুহাটি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহম্মেদ জুয়েল, পৌর এলাকার খাজুরা গ্রামে যুবলীগ নেতা সাইদ, জেলার পূর্বাঞ্চলে চেয়ারম্যান কাজল, রিপন, বিকাশ বিশ্বাস, সাধুহাটি ইউনিয়নে নাজির উদ্দীন, আলতাফ ও হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় আবুল কালাম ও শিলুসহ আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতাদের মাঠে নামানো হয় ধানের শীষের প্রচার কাজে। আবার অনেক আওয়ামী লীগের সমর্থক বিএনপির ছত্রছায়ায় আত্মগোপন থেকে ফিরে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেনবলেও প্রচার রয়েছে। এসব কারণে ঝিনাইদহ-২ আসনে আব্দুল মজিদ, ঝিনাইদহ-৩ আসনে মেহেদী হাসান রণি ও ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী রাশেদ খান পরাজয় বরণ করেন।
মহেশপুর উপজেলা নেপা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আমিনুর রহমান অভিযোগ করেন, বিএনপির নারী কর্মীদের সংগঠনে কৌশলগত ব্যর্থতাও ছিল নির্বাচনে দৃশ্যমান। দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও পারিবারিক যোগাযোগভিত্তিক কাজ ও বৈঠকের নামে জামায়াত যে নীরব সংগঠন গড়ে তুলেছিল, তার পাল্টা প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি বিএনপি। ফলে বহু এলাকায় নারী ভোটব্যাংক ধরে রাখায় কঠিন হয়ে পড়ে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কেন্দ্রে কেন্দ্রে জামায়াত সমর্থিত নারীদের উপস্থিত ছিল চোখে পড়ার মতো।


নির্বাচনে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ছিল মামলা, হামলা ও নির্যাতনের শিকার কর্মীদের অবমূল্যায়ন করে ৫ আগস্টের পর গজিয়ে ওঠা বিএনপির নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন ও নেতৃত্বের আসনে বসানো। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মাঠকর্মীদের মতামত উপেক্ষা করা। ফলে গ্রামে গ্রামে প্রচারযুদ্ধে প্রয়োজনীয় উদ্যম দেখা যায়নি। নির্বাচনের দিন কেন্দ্রভিত্তিক সমন্বয় অত্যন্ত দুর্বল ছিল, ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করার কার্যকর পরিকল্পনা ছিল না। বিপরীতে প্রতিপক্ষ জামায়াত ছিল সংগঠিত, লক্ষ্যভিত্তিক ও কৌশলী। তারা ভোর সকালে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভোটারদের মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অনুকূলে জনসমর্থন আনতে সক্ষম হয়।
পরাজয়ের কারণ সম্পর্কে ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মজিদ জানান, ঝিনাইদহ-২ আসনে দেরিতে মনোনয়ন ঘোষণা করায় বিএনপির সাধারণ ভোটাররা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন। দীর্ঘ সময় তারা অপেক্ষা করতে করতে জামায়াতের কব্জায় চলে যায়। এছাড়া জামায়াতের কালো টাকা, বিএনপির কতিপয় নেতার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও জাহিদী ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের বিশ্বাসঘাতকতা পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখে। তারাও কালো টাকা ছড়িয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে অবস্থা নেয়।


ঝিনাইদহ-৩ আসনের প্রার্থী মেহেদী হাসান রণি বলেন, জামায়াত নির্বাচনে কালো টাকা ব্যায় করে তাদের নারী কর্মীদের দিয়ে গ্রামের সাধারণ নারী ভোটারদের বাগে আনতে সক্ষম হয়। সাথে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে নারী ভোটারদের বিভ্রান্ত করে। এছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় কিছু নেতা ভোটের মাঠে নামেনি। তারা কাজ করলে নির্বাচনে জয়ী হওয়া সম্ভব হতো, কারণ ইতঃপূর্বে এই আসনে জামায়াত বিএনপির সঙ্গে ভোট করে জিততে পারেনি।
ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী রাশেদ খান জানান, তিনি মূলত ঝিনাইদহ-২ আসনের জন্য প্রস্তুত নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে অন্য আসনে দেওয়া হয়। এর কারণে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে তার ভোট কাটাকাটি হয়। এছাড়া বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর বিশ্বাসঘাতকতা ও জামায়াতের কালো টাকা বিএনপির পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখে।



কমেন্ট বক্স
notebook

জীবননগর উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় ইউএনও