মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

চুয়াডাঙ্গায় স্বাস্থ্য বিভাগের উদাসীনতায় অনিবন্ধিত ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিকে অঘোষিত ছাড়

ছাড়পত্রহীন অযোগ্য প্রতিষ্ঠানে বারবার ভুল রিপোর্ট, চরম ঝুঁকিতে জনজীবন
  • আপলোড তারিখঃ ০৮-০৯-২০২৬ ইং
চুয়াডাঙ্গায় স্বাস্থ্য বিভাগের উদাসীনতায় অনিবন্ধিত ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিকে অঘোষিত ছাড়

স্বাস্থ্য বিভাগের নজিরবিহীন উদাসীনতা ও প্রশাসনিক ঢিলেঢালা ভাবকেই চুয়াডাঙ্গা জেলায় অবৈধ চিকিৎসা বাণিজ্যের মূল জ্বালানি হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। প্রায় দুই বছর ধরে শত শত প্রতিষ্ঠানের না রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বৈধ লাইসেন্স, না আছে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিবেশগত ছাড়পত্র। তবুও কোনো কার্যকর বা স্থায়ী অভিযান নেই। বছর ঘুরে দু-একটি প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য বিভাগ ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথাকথিত ‘লোকদেখানো’ অভিযান হলেও, কোনো ধরনের শর্ত বা কাগজপত্র পূরণ না করেই কয়েক দিনের মধ্যে রহস্যজনকভাবে সেসব প্রতিষ্ঠান আবারও খুলে দেওয়া হয়।


বর্তমানে চুয়াডাঙ্গায় স্বাস্থ্য দপ্তরের অভিযানে বন্ধ হওয়া একটি প্রতিষ্ঠানও খুঁজে পাওয়া যাবে না; নামকাওয়াস্তে কয়েকটি অভিযানে বন্ধ দেখানো সবগুলো ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারই বহাল তবিয়তে চালু রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে মানুষ মেরে ফেলার মতো ঝুঁকিপূর্ণ এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছেন না স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দীন প্রতি মাসেই গড়পড়তা এক মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার ঘোষণা দেন, কিন্তু তিন বছর পার হয়ে গেলেও যেন সিভিল সার্জনের সেই এক মাস আর শেষ হয় না।


এমনকি গত আগস্ট মাসেও জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার অবৈধ ক্লিনিক নিয়ে সিভিল সার্জনকে প্রশ্ন তুললে, তিনি আগস্ট মাস পর্যন্ত সময় দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। অথচ আগস্ট পার হয়ে সেপ্টেম্বরের ৭ তারিখ গড়ালেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি, দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেননি সিভিল সার্জন। ফলে সরকারি লাইসেন্স ছাড়াই বুক ফুলিয়ে চলছে অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলো, আর প্রতিনিয়ত ভুল চিকিৎসা ও ভুল রিপোর্টের শিকার হয়ে চরম ক্ষতি ও প্রাণসংশয়ে পড়ছেন চুয়াডাঙ্গার অবুঝ, সহজ-সরল সাধারণ মানুষ।


চুয়াডাঙ্গা জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, জেলায় অনলাইনে নিবন্ধিত বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত মোট ১৮৪টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ছিল। এর মধ্যে বর্তমানে ১৩৬টিরই গত প্রায় তিন বছর ধরে লাইসেন্স নবায়ন করা নেই। এর মধ্যে রয়েছে- চুয়াডাঙ্গা সদরে ১৭টি, আলমডাঙ্গায় ১০টি, দামুড়হুদায় ৬টি এবং জীবননগরে ১০টি প্রাইভেট ক্লিনিক। অন্যদিকে, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদরে ৩৯টি, আলমডাঙ্গায় ২১টি, দামুড়হুদায় ১৫টি এবং জীবননগরে ১৮টির লাইসেন্স নবায়নহীন অবস্থায় রয়েছে।


মূলত পরিবেশ অধিদপ্তর এবং নারকোটিক্সের ছাড়পত্র না থাকা, নীতিমালার চরম লঙ্ঘন এবং হরেক রকমের অনিয়ম ও অবৈধতার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন আটকে রয়েছে। এর মধ্যেই নতুন লাইসেন্স প্রাপ্তির জন্য আরও ৪টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে রেখেছে।


এদিকে, চুয়াডাঙ্গা পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য আবেদন জমা পড়েছে মোট ১৬২টি প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু এর মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর মাত্র ৩৭টি প্রতিষ্ঠানকে শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ছাড়পত্র প্রদান করতে পেরেছে এবং ৬টি আবেদনের ফাইল প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বাকি ১১৯টি প্রতিষ্ঠানই ছাড়পত্র পাওয়ার অযোগ্য। তাদের অধিকাংশের ফাইল দীর্ঘদিন ধরে ‘ঘাটতি কাগজপত্র জমাদানের নোটিশ’ কিংবা ‘ডডউচ/চিকিৎসা-বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের চিঠি’ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ভাষ্যমতে, শর্ত ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ছাড়পত্র পাওয়ার যোগ্য নয়, আবার তারা নিয়ম মেনে সবকিছু ঠিকঠাকও করছে না।


চুয়াডাঙ্গা পরিবেশ অধিদপ্তর জেলা কার্যালয়ের সিনিয়র কেমিস্ট নরেশ চন্দ্র বিশ^াস বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা জেলায় আমাদের তালিকাভুক্ত মোট ১৬২টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে এ পর্যন্ত ৩৭টি প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘উদ্যোক্তারা সময়মতো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দেওয়ায় অনেক আবেদন যথাসময়ে প্রক্রিয়াকরণ করা সম্ভব হয় না। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও সময়মতো পরিবেশগত ছাড়পত্র পাচ্ছে না। মূলত উদ্যোক্তাদের গাফিলতির কারণেই এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।’


চিকিৎসা বর্জ্য সংক্রান্ত বিষয়ে নরেশ চন্দ্র বিশ^াস বলেন, ‘চিকিৎসা-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী যেসব নির্দেশনা ও শর্ত রয়েছে, অনেক প্রতিষ্ঠান সেগুলো যথাযথভাবে পরিপালন করছে না। ফলে তাদের পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান চিকিৎসা-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় শর্ত যথাযথভাবে পূরণ করছে, তাদেরকে নিয়ম অনুযায়ী যথাসময়ে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে।’
অন্যদিকে, লাইসেন্স না থাকা এবং অভিযানের বিষয়ে চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা জেলায় বর্তমানে অনলাইন লাইসেন্সপ্রাপ্ত ক্লিনিকের সংখ্যা ৬৪টি এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ১২০টি।’


লাইসেন্স নবায়ন না হওয়ার কারণ এবং চলমান পদক্ষেপ সম্পর্কে ডা. হাদী জিয়া উদ্দীন বলেন, ‘পরিবেশের ছাড়পত্র না থাকায় এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স নবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে তাদের নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময় অতিক্রম করার পর আমরা ধারাবাহিকভাবে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে অভিযান পরিচালনা করছি। ইতোমধ্যে আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা সদর ও জীবননগর উপজেলায় অভিযান চলমান রয়েছে। খুব দ্রুতই নিয়ম না মানা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


স্বাস্থ্য বিভাগের এই ঢিলেঢালা ভাব ও তদারকিহীনতায় চরম ক্ষোভ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সুশীল সমাজ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক মহল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অবসরপ্রাপ্ত সাবেক সিভিল সার্জন অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘যে প্রতিষ্ঠান পরিবেশের ছাড়পত্র পাবারই যোগ্য নয়, সেটি কীভাবে স্বাস্থ্যের অনুমতি পাবে? সেটি তো সবার আগে বন্ধ রাখতে হবে। বন্ধ রেখে, যাবতীয় সকল নীতিমালা মেনে অনুমতি পাবার পর চলতে হবে। তবে চুয়াডাঙ্গার বর্তমান সিভিল সার্জন নিশ্চয় সুবিধা পান। না হলে এভাবে মানুষ মারার কারখানাগুলো চালু রাখেন?’


একইভাবে জনস্বাস্থ্য ও ভুল রিপোর্ট নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। নাম গোপন রাখার শর্তে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এসব প্রতিষ্ঠানগুলো ভুল রিপোর্ট দেয়। ফলে চিকিৎসা সঠিক হয় না। সাধারণ মানুষের এই খাতে সবথেকে বেশি কষ্ট। এটার মতো বড় পাপ হয় না। তবুও কেন চুয়াডাঙ্গার স্বাস্থ্য বিভাগ এই পাপ করছে জানি না। আমার মতে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্তাদেরও শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।’



কমেন্ট বক্স
notebook

আন্দুলবাড়ীয়া বাজারের পূর্বের এডহক কমিটি বিলুপ্ত