চুয়াডাঙ্গায় সরকারি আইনগত সহায়তা (লিগ্যাল এইড) কার্যক্রমকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করতে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ এবং পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে লিগ্যাল এইড হেল্প ডেস্ক চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকার অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ যেন সহজে বিনামূল্যের আইনগত সহায়তা পান, সে লক্ষ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে তিনটায় চুয়াডাঙ্গা জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা আইনগত সহায়তা কমিটির সভাপতি ও চুয়াডাঙ্গার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ রফিকুল ইসলাম।
সভায় প্যানেল আইনজীবীদের জমা দেওয়া ৩০টি বিল উপস্থাপন করা হলে কোনো আপত্তি না থাকায় তা অনুমোদন করা হয়। নতুন অন্তর্ভুক্ত পাঁচজন প্যানেল আইনজীবীর মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট রবিউল হক, অ্যাডভোকেট ইউনুস আলী ও অ্যাডভোকেট একলাছুর রহমান কাজল। অসুস্থতার কারণে অ্যাডভোকেট হানিফ উপস্থিত ছিলেন না।
দীর্ঘদিন আদালতের কার্যক্রমে অনুপস্থিত থাকায় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অ্যাডভোকেট শামসুজ্জোহাকে সাময়িকভাবে প্যানেল থেকে বাদ দেওয়া হয়। এছাড়া সিদ্ধান্ত হয়, প্রতি মাসে নির্বাচিত পাঁচজন প্যানেল আইনজীবীর মধ্যে কেউ নিয়মিত সভায় অনুপস্থিত থাকলে তার পরিবর্তে নতুন আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হবে।
সভায় আগের সভার কার্যবিবরণী পর্যালোচনা, আইনগত সহায়তা চেয়ে জমা পড়া আবেদনগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং লিগ্যাল এইড কার্যক্রম সম্প্রসারণে শুদ্ধাচার ও নৈতিকতা নিয়েও আলোচনা করা হয়।
সভায় জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মারুফ সারোয়ার বাবু বলেন, লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম সম্পর্কে চুয়াডাঙ্গার প্রত্যন্ত এলাকার অনেক মানুষ এখনও জানেন না। অর্থের অভাবে অনেক অসহায় বিচারপ্রার্থী আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন না। অথচ সরকারি খরচে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে তারা বিনামূল্যে আইনগত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, এই সেবা গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে প্রতি মাসে সম্মিলিতভাবে প্রচারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।
এর জবাবে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ রফিকুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়নে বাজেটের প্রয়োজন রয়েছে। প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ পাওয়া গেলে বিষয়টি বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া হবে। সভায় পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবির খান বলেন, জেলার সব সরকারি দপ্তরকে লিগ্যাল এইড সম্পর্কে জনগণকে জানাতে এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি দপ্তরে একটি করে ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করা যায় কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, জেলা পুলিশ লিগ্যাল এইড সেল গঠনের উদ্যোগ নিতে পারে। এর মাধ্যমে গ্রামের দরিদ্র ও অসহায় মানুষ সহজেই জানতে পারবেন যে, সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে আইনগত সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। পুলিশ সুপার আরও বলেন, লিগ্যাল এইডের প্রচার বাড়াতে পথসভাসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে তথ্য ও পরামর্শ দিতে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে একটি লিগ্যাল এইড হেল্প ডেস্ক চালু করা হবে।
সভাপতির বক্তব্যে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ রফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারের বিনামূল্যের আইনগত সহায়তা যেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরিব, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, সেটিই লিগ্যাল এইড কমিটির মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, কেউ যেন এই সেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কমিটির সদস্যদের আরও সক্রিয় ও আন্তরিক ভূমিকা পালন করতে হবে।
সভা পরিচালনা করেন চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার মোরশেদ আলম। সভায় উপস্থিত ছিলেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সৈয়দ হাবিবুল ইসলাম, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তফা কামাল, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর আশিষ মোমতাজ, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবির খান, সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি ডা. শামীমা ইয়াসমিন, জেলা তথ্য কর্মকর্তা শিল্পী মণ্ডল, জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার অহিদুল আলম, বিশেষ পিপি এম. এম. শাহাজান মুকুল, চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি নাজমুল হক স্বপন, সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম সনি, সিনিয়র সাংবাদিক মানিক আকবর, সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কর্মকর্তা ছানোয়ার হোসেন, জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা নজরুল ইসলামসহ কমিটির সদস্যরা।
উল্লেখ্য, সরকারের আইনগত সহায়তা কর্মসূচির আওতায় আর্থিকভাবে অসচ্ছল, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তিরা বিনামূল্যে আইনজীবী নিয়োগ, মামলা পরিচালনা, আইনগত পরামর্শ এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পেয়ে থাকেন। সভায় এ সেবাকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক