চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার আকন্দবাড়িয়া গ্রামের মাদক নির্মূল কমিটির বিরুদ্ধে অভিযোগের যেন শেষ নেই। মাদক উদ্ধারের পর তা আত্মসাৎ, আটকের ঘটনা গোপন রেখে অর্থ আদায় এবং জব্দ করা মাদকের প্রকৃত পরিমাণ কম দেখিয়ে মামলা করার অভিযোগের ঘটনায় সংবাদ প্রকাশের পর এবার দর্শনা থানা এলাকা থেকে জীবননগর থানার মানিকপুর গ্রামে গিয়ে কমিটির সদস্যরা অভিযান চালিয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিষয়টি স্বীকারও করেছেন আকন্দবাড়িয়া গ্রামের মাদক নির্মূল কমিটির সভাপতি আব্দুল মুন্নাফ।
এদিকে, অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির সভাপতি আব্দুল মুন্নাফ ফোনে সাংবাদিককে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেন। পরে অবশ্য তিনি ফোনে এবং থানায় এসে ওই সাংবাদিকের কাছে ক্ষমা চান।
আকন্দবাড়িয়া থেকে মানিকপুর গ্রামে এসে অভিযানের বিষয়টি স্বীকার করে আব্দুল মুন্নাফ বলেন, গতকাল মঙ্গলবার তিনিসহ ৭-৮ জন জীবননগর উপজেলার মানিকপুর গ্রামে যান। সেখানে রাজা নামের এক ব্যক্তিকে ধরতে তারা অভিযান চালান। মুন্নাফের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজাকে ধরতে গেলে তার পরিবারের সদস্যরা বাধা দেন। এসময় উভয় পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে।
তবে দর্শনা থানার আওতাধীন আকন্দবাড়িয়া গ্রামের একটি কমিটির সদস্যরা জীবননগর থানা এলাকায় গিয়ে কোনো সরকারি বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট থানাকে না জানিয়ে এ ধরনের অভিযান চালানোর আইনগত ভিত্তি কী, এমন প্রশ্ন করা হলে সাংবাদিকে গালাগালি শুরু করেন মুন্নাফ। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানালে মুন্নাফ ওই সাংবাদিকের কাছে ফোনে এবং থানায় এসে ক্ষমা চান।
মানিকপুর গ্রামে মাদক নির্মূল কমিটির সদস্যদের অভিযান সম্পর্কে জানতে চাইলে জীবননগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সোলায়মান শেখ বলেন, তাদের এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। আর তারা এটা করতে পারেন না।
আইন কী বলছে:
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ধারা ২৩ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পুলিশের উপ-পরিদর্শক বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা, নির্দিষ্ট পর্যায়ের কাস্টমস কর্মকর্তা, বিজিবির ল্যান্স নায়েক বা তদূর্ধ্ব এবং কোস্ট গার্ডের নির্দিষ্ট পর্যায়ের কর্মকর্তারা মাদক অপরাধের বিষয়ে আইনানুগ শর্তসাপেক্ষে পরোয়ানা ছাড়া তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন।
একই আইনের ধারা ২১-এও ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রকাশ্য স্থান বা চলন্ত যানবাহনে মাদকদ্রব্য তল্লাশি, জব্দ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আটক বা গ্রেপ্তারের বিধান রয়েছে। আর ধারা ২২-এ তল্লাশি, গ্রেপ্তার, জব্দ ও আটকের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির বিধান অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।
ফলে স্থানীয়ভাবে গঠিত কোনো মাদকবিরোধী কমিটির সদস্যরা নিজেদের উদ্যোগে অন্য থানার এলাকায় গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো তল্লাশি, আটক বা জব্দের কার্যক্রম চালাতে পারেন কি না, এ নিয়ে আইনগত প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এদিকে, মাদক কারবারির কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর অভিযুক্ত জসিম মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা আসার ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। তবে প্রশ্ন উঠছে, গত ১৯ সেপ্টেম্বর বেলা ১টা ৫০ মিনিটের দিকে ওই মোটরসাইকেলসহ বিকাশকে আটক করা হয়। তার ৩০-৩৫ মিনিটের মধ্যে কীভাবে জসিমের বিকাশে টাকা এলো। আর এই টাকার বিষয়ে দুই দিনে কোনো পদক্ষেপ কেন নেননি। সংবাদ প্রকাশের পর কেন জিডি করা হলো।
এদিকে মুন্নাফের সঙ্গে ওই সাংবাদিকের কথা হওয়ার পর জসিমও ফোন করেন তাকে। এসময় মুন্নাফের হয়ে ক্ষমা চেয়ে বিষয়টি বাদ দিতে বলেন জসিম। এর আগের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার দুপুরে আকন্দবাড়িয়া স্কুল এলাকার একটি বাঁশবাগানের মধ্যদিয়ে মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলেন গ্রামের বাসিন্দা বিকাশ (৩০)। তার দাবি, মোটরসাইকেলটিতে ছিল ১৩২ বোতল ভারতীয় নিষিদ্ধ নেশাজাতীয় স্কাফ সিরাপ। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় স্থানীয় ‘মাদক নির্মূল কমিটি’র কয়েকজন সদস্য মোটরসাইকেলটির গতিরোধ করে তল্লাশি চালান। সেখানে জসিম, জুয়েল, রিপন ও রকিসসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
বিকাশের দাবি, তল্লাশির পর তার মোটরসাইকেল ও স্কাফ সিরাপগুলো নিয়ে নেওয়া হয়। এরপর মোটরসাইকেলটি ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে তার কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া এবং তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান বিকাশ।
ঘটনার পর বিষয়টি সামনে আসে বিকাশের দুলাভাই রাজাকে ফোন করার মধ্যদিয়ে। রাজা অভিযোগ করেন, জসিম তাকে ফোন করে বিকাশকে মাদকসহ আটকের কথা জানান। একই সঙ্গে মোটরসাইকেলটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। রাজা বলেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা পাঠান। এ লেনদেনের তথ্য-প্রমাণ তার কাছে রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, টাকা দেওয়ার পরও বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়নি।
রাজা অভিযোগ করেন, বিকাশের মোটরসাইকেলে থাকা ১৩২ বোতল স্কাফ সিরাপের মধ্যে ৩৫ পিস পুলিশকে উদ্ধারের কথা জানানো হয়। সঙ্গে উদ্ধার দেখানো হয় মোটরসাইকেলটি।
অর্থাৎ অভিযোগকারীর দাবি অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে থাকা মাদকের পরিমাণ এবং পরে মামলায় দেখানো উদ্ধারকৃত মাদকের পরিমাণের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য নিয়েই এখন উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- আটকের সময় প্রকৃতপক্ষে কত বোতল মাদক ছিল? যদি ১৩২ বোতল থাকে, তাহলে বাকি মাদকের কী হয়েছে? আর যদি ৩৫ বোতলই উদ্ধার হয়ে থাকে, তাহলে ১৩২ বোতলের দাবি কতটা সত্য? এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগও।
দর্শনা থানার ওসি নজরুল ইসলাম বলেন, গত ১৯ সেপ্টেম্বর আকন্দবাড়িয়া এলাকা থেকে ৩৫ বোতল স্কাফ সিরাপ ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে কোনো আসামি পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, এ ঘটনায় দর্শনা থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিষয়টি তদন্ত করে আরও খতিয়ে দেখবেন। তবে মঙ্গলবারের অভিযানের বিষয়ে জানতে ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।
নিজস্ব প্রতিবেদক