বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

ফুটপাতে নিরাপত্তাহীনতার রাত, কোর্টের বারান্দায় দিন

নির্মম বাস্তবতার জীবন্ত দলিল লিপি খাতুন
  • আপলোড তারিখঃ ০৯-০৭-২০২৬ ইং
ফুটপাতে নিরাপত্তাহীনতার রাত, কোর্টের বারান্দায় দিন

কোলে দুই বছরের এক অবুঝ কন্যা শিশু। পরনে মলিন, জরাজীর্ণ পোশাক। মাথার ওপর ছাদ বলতে চুয়াডাঙ্গা কোর্ট মোড়ে অবস্থিত পুরাতন জেলা কারাগারের একটি পরিত্যক্ত পানির ট্যাংকির সামান্য একটুখানি ছাউনি। রোদ-বৃষ্টি কিংবা কনকনে শীত- সব ঋতুতেই মা-মেয়ের ঠিকানা এই এক চিলতে ফুটপাত। এভাবেই প্রায় দুই বছর ধরে চুয়াডাঙ্গা আদালত প্রাঙ্গণের ধুলোবালি মেখে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন লিপি খাতুন। এক বুক আশা আর দুচোখ ভরা ক্লান্তি নিয়ে প্রতিদিন সকাল হলেই তিনি আদালত চত্বরের বারান্দায় বারান্দায় ঘোরেন। সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে তাঁর একটাই আকুতি- তিনি একটু ‘ন্যায্য বিচার’ চান।


কিন্তু যে বিচারের আশায় তিনি বছরের পর বছর আদালতের বারান্দার পাথর ক্ষয় করছেন, সেই বিচার যেন আজ এক মরীচিকা। সরেজমিনে চুয়াডাঙ্গা কোর্ট মোড় এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এক বুক কাঁপানো দৃশ্য। পিচঢালা সড়কের পাশে ধুলোমলিন পরিত্যক্ত পানির ট্যাংকির নিচে মায়ের কোল ঘেঁষে বসে আছে নিষ্পাপ শিশুটি। মানুষের কাছে হাত পেতে যা মেলে, তা দিয়েই কোনো রকমে চলে মা-মেয়ের ক্ষুধার লড়াই। শিশুটির কপালে জোটেনি কোনো ভালো জামা, নেই কোনো খেলনা। তার একমাত্র খেলার সঙ্গী একটি ময়লা ও ছেঁড়া পুতুল। যেখানে প্রতিবেলা পেট ভরে দুমুঠো অন্ন সংস্থান করাই এক চরম বিলাসিতা, সেখানে শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দ তো এক দূর আকাশের তারা। অনেক দিন এমনও যায়, অনাহারেই কেটে যায় মা ও মেয়ের দিন-রাত।


কেবল ক্ষুধা বা অভাব নয়, প্রতিটা মুহূর্ত তাদের তাড়া করে বেড়ায় এক তীব্র নিরাপত্তাহীনতা। খোলা আকাশের নিচে অরক্ষিত অবস্থায় রাত কাটাতে গিয়ে লিপি খাতুনকে লড়তে হয় আরেক অদৃশ্য দানবের সাথে। লিপি খাতুন কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘এখানে রাতে থাকা যে কত কষ্টের, তা বোঝাতে পারব না। অনেকেই গভীর রাতে খারাপ উদ্দেশ্যে আসে। আমি একা নারী, কোলে সন্তান। যখন চিৎকার করে প্রতিবাদ করি, তখন তারা পালিয়ে যায়। প্রতিটা রাত কাটে আতঙ্কে।’


লিপি খাতুনের জীবনের গল্পটা নির্মম বাস্তবতার এক জীবন্ত দলিল। স্বামী মহাসীন আলীর সাথে বিয়ের সময় ১০ হাজার টাকা দেনমোহর ধার্য হলেও, পরবর্তীতে লিপির পরিবার বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৮০ হাজার টাকা যৌতুক দেয়। কিন্তু লোভের কি কোনো শেষ আছে? আরও ২ লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে শুরু হয় অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। টাকা দিতে অপারগ হওয়ায় একপর্যায়ে লিপিকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেন। আগের সংসারের এক ছেলে ও এক মেয়েকে কেড়ে নিয়ে রাখা হয় দাদার বাড়িতে। মা হয়েও নিজের সন্তানদের মুখ দেখার অধিকারটুকু হারান তিনি। এরপর শুরু হয় বেঁচে থাকার নতুন সংগ্রাম।


পেটের দায়ে লিপি কাজ নেন চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জের ‘তৃপ্তি হোটেল’-এ। কিন্তু ভাগ্য সেখানেও তাঁর সাথে নির্মম পরিহাস করে। হোটেলে কাজ করার সময় রনি নামের এক ব্যক্তির সাথে তাঁর পরিচয় হয়। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে রনি লিপিকে একাধিকবার ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ ওঠে। যার নির্মম পরিণতি হিসেবে লিপির কোলে আসে এই ছোট্ট কন্যাসন্তান। বর্তমানে এই ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। অথচ লিপি খাতুনের অভিযোগ, মামলা করায় আসামিপক্ষ প্রতিনিয়ত তাকে ও তার এই নিষ্পাপ সন্তানকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।


লিপি খাতুনের এই দীর্ঘ লড়াইয়ে আইনি সহায়তা দিচ্ছে চুয়াডাঙ্গা জেলা লিগ্যাল এইড অফিস। তাঁর পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহাজামাল জামাল জানান, ‘যৌতুক ও খোরপোষের মামলাটি স্বামী ও শ্বশুরের বিরুদ্ধে প্রায় ৮ থেকে ১০ বছর ধরে চলছে। বর্তমানে এটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু সাক্ষীরা আসামির নিজ গ্রামের হওয়ায় তারা আদালতে উপস্থিত হচ্ছেন না, যার কারণে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, ‘পরবর্তীতে দেনমোহর ও খোরপোষের দাবিতে আরেকটি পারিবারিক মামলা করা হয়েছে, যা বর্তমানে বিবাদীপক্ষের জবাব দাখিলের পর্যায়ে রয়েছে।’


অন্যদিকে, ধর্ষণ মামলার জটিলতা নিয়ে কথা বলেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (স্পেশাল পিপি) শাহজাহান মুকুল। তিনি বলেন, আসামি রনি ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করলে আদালতের নির্দেশে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। সেই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে, শিশুটি আসামির ঔরসজাত নয়। তবে লিপি খাতুন এই রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করে অভিযোগ তোলেন- প্রভাব খাটিয়ে কৌশলে রিপোর্ট পরিবর্তন করা হয়েছে।’
পিপি শাহজাহান মুকুল আরও বলেন, ‘বিষয়টি রাষ্ট্রপক্ষের নজরে আসায় আমরা দ্রুত আদালতে পুনরায় ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন জানাই। আদালত আমাদের আবেদন মঞ্জুর করেছেন এবং পুনঃপরীক্ষার প্রক্রিয়া চলছে।’ লিপি খাতুন বলেন, ‘আমি এখানে খুব কষ্টে থাকি। বিচারটা শেষ হয়ে আদালতের একটা রায় পেলে আমি কিছুটা স্বস্তি পাই।’



কমেন্ট বক্স
notebook

চুয়াডাঙ্গায় স্কুলে ঢুকে প্রধান শিক্ষককে চড়-থাপ্পড়, নারী গ্রেপ্তার