চুয়াডাঙ্গা জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. দেলোয়ার হোসেন। চাকরিতে যোগদানকালে ছিলেন উপ-সহকারী প্রকৌশলী। পরে পদোন্নতি পেয়ে সহকারী প্রকৌশলী ও পরবর্তীতে নির্বাহী প্রকৌশলী হন। চুয়াডাঙ্গায় নির্বাহী প্রকোশলী হিসেবে দায়িত্বে আছেন তিন বছরের অধিক সময়। তিনি নবম গ্রেডের প্রথম শ্রেণির একজন কর্মকর্তা। নিয়ম অনুযায়ী বেতনের সাথে বাসা ভাড়াও পান। অথচ থাকেন তারই অফিসের নির্মাণাধীন বর্ধিতাংশ ভবনের দ্বিতীয় তলায়। এখানে তার প্রায় ৬ মাসের অধিক বসবাস। বেতনের সঙ্গে বাসা ভাড়া তোলেন নিয়মিত। আবার থাকছেন অফিসেই।
মজার ব্যাপার হলো, তার থাকা ভবনের নীচতলায় বসে মাদকের আখড়া। সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে গাঁজা সেবনের দুটি মাটির তৈরি বিশেষ চোঙ (বাঁশি), তামাক পাতা, ইয়াবা সেবনের ফয়েল পেপার এবং ইয়াবা জমে থাকা বোতলের মুটকি। ভবনের নিরাপত্তার জন্য দুটি সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও রহস্যজনকভাবে একটির লাইন বিচ্ছিন্ন এবং অন্যটির মুখ ওপরের (আকাশের) দিকে ঘোরানো। অথচ এসব কিছুই জানেন না খোদ নির্বাহী প্রকৌশলী। জানাননি জেলা প্রশাসন বা পুলিশ প্রশাসনের কাউকে। উল্টো গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতির পর তাড়াহুড়ো করে ওই স্থান পরিষ্কার করে প্রমাণ লোপাটের মরিয়া চেষ্টা চালানো হয়। আর এভাবেই চলছে চুয়াডাঙ্গা জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, চুয়াডাঙ্গা শহরতলীর দৌলতদিয়াড়ে অবস্থিত জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কার্যালয়। এই চত্বরের ভেতরেই পাঁচতলা বিশিষ্ট একটি নতুন ভবনের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। যার কেবল দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত আংশিক কাজ শেষ হয়েছে এবং বিদ্যুৎ ও পানির লাইনসহ অন্যান্য কাজ এখনো পুরোপুরি সমাপ্ত হয়নি। অথচ সরকারি কোষাগার থেকে নিয়মিত বাড়ি ভাড়া বাবদ টাকা উত্তোলন করার পরও, গত ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে এই নির্মাণাধীন ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষকে বিশেষভাবে প্রস্তুত করে বসবাস করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. দেলওয়ার হোসেন। সরকারি খরচে বিদ্যুৎ ও পানি অপচয় করে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে তিনি এখানে থাকছেন।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী খোদ দপ্তর প্রধানের এমন কর্মকাণ্ড অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’ অনুযায়ী, সরকারি বাসা ভাড়া উত্তোলন করার পর অবৈধভাবে অফিসে থাকা এবং রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ-পানি ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা স্পষ্ট ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতি’। এছাড়া ‘দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪’ এবং দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা (সরকারি কর্মচারী কর্তৃক অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ) অনুযায়ী এটি একটি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। আইনজীবীরা বলছেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে দ্বৈত সুবিধা ভোগ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, নির্বাহী প্রকৌশলী যে ভবনের দ্বিতীয় তলায় বসবাস করছেন, ঠিক তার নিচতলার একটি কক্ষে (যা গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহারের কথা) দীর্ঘদিন ধরে চলছে মাদক সেবনের মহোৎসব। সরেজমিনে ওই কক্ষে গাঁজা সেবনের দুটি মাটির তৈরি বিশেষ চোঙ (বাঁশি), তামাক পাতা, ইয়াবা সেবনের ফয়েল পেপার এবং ইয়াবা জমে থাকা বোতলের মুটকি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। ভবনের নিরাপত্তার জন্য দুটি সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও রহস্যজনকভাবে একটির লাইন বিচ্ছিন্ন এবং অন্যটির মুখ ওপরে আকাশের দিকে ঘোরানো ছিল। চত্বরের ভেতর এমন অপরাধ চললেও দপ্তর প্রধান জেলা প্রশাসন বা পুলিশকে কিছুই জানাননি। উল্টো গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতির পর তাড়াহুড়ো করে ওই স্থান পরিষ্কার করে প্রমাণ লোপাটের মরিয়া চেষ্টা চালানো হয়।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় সদর থানা পুলিশ ও জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিশেষ টিম। এসময় দায়িত্বরত নির্বাহী প্রকৌশলী বিষয়টি ‘জানেন না’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সদর থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাঞ্জারুল বলেন, দেখে মনে হচ্ছে, এখানে নিয়মিত এবং অনেক আগে থেকেই মাদকের আখড়া বসত। অফিসের ভেতর এমন চলতে থাকলে তাদের আগেই জানানো উচিত ছিল। অন্যদিকে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম একে অত্যন্ত দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে বলেন, সরকারি অফিসের মধ্যে এই ধরনের ঘটনা অথচ তারা প্রশাসনকে একবারও জানাননি, এটি কাম্য নয়।
বাসা ভাড়া উত্তোলন করার পরও অফিসেই থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. দেলোয়ার হোসেন থাকার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘অফিসটা কমপ্লিট নয়। ওটাতে বসবাসের যোগ্যও না। জাস্ট যতটুকু করার দরকার, ততটুকু করেই বসবাস করছি। যখন চালু হবে তখন আমাদের রেজিস্ট্রার খাতা থাকবে। তখন সরকারি নিয়ম অনুযায়ী থাকব। বাইরে আমি নিরাপত্তা পাচ্ছি না, তাই এখানে কষ্ট করেই আছি।’
অফিসের মধ্যে মাদক সেবনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এটি দেখিনি। এ সম্পর্কে জানি না। সিসিটিভি ক্যামেরার এই অবস্থা কেন তাও জানি না। পরবর্তীতে আমরা বিষয়টি দেখব।’ এছাড়া শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ভেতরে দেখা যায় একটি পাখিভ্যান চার্জ দেয়া হচ্ছে। সে বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘পাখিভ্যান কার জানি না। বোধহয় মিস্ত্রিরা কেউ এনেছে। চার্জ শেষ হওয়ায় এখানে চার্জ দিচ্ছে।’
এসব বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন চুয়াডাঙ্গার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার। তিনি বলেন, ‘বাসা ভাড়া উত্তোলন করার পর কোনো কর্মকর্তা সরকারি অফিসে থাকতে পারেন না। গেস্ট রুমে থাকলেও নির্দিষ্ট রেজিস্ট্রার মেইনটেইন এবং ভাড়া প্রদান সাপেক্ষে থাকতে হবে। দীর্ঘদিন এভাবে থাকার কোনো সুযোগ নেই। আর অফিস প্রাচীরের মধ্যে মাদকের আখড়া বসা এবং প্রশাসনকে না জানানো অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। আমরা পুরো বিষয়টি তদন্ত করে আইনি আওতায় আনব।’
সচেতন সমাজের মানুষ বলছেন, সরকারি বাসাভাড়া উত্তোলন করে কোনো কর্মকর্তা সরকারি অফিসেই সরকারি খরচে বিদ্যুৎ অপচয় করে থাকতে পারেন না। এটা সম্পূর্ণ বেআইনি। এছাড়া তিনি বেআইনিভাবে যে ভবনে থাকছেন, তা তার অফিস প্রাচীরের মধ্যেই অবস্থিত এবং ঠিক সেই ভবনেই বসেছে মাদকের আখড়া। বহিরাগতরা কীভাবে অফিসের ভেতরে এভাবে মাদকের আস্তানা তৈরি করতে পারলো, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহলের স্পষ্ট দাবি- নিশ্চয়ই এই অফিসের ভেতরের কেউ না কেউ এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
নিজস্ব প্রতিবেদক