মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

শিক্ষাক্রমে বিশাল পরিবর্তন

  • আপলোড তারিখঃ ১৪-০৯-২০২১ ইং
শিক্ষাক্রমে বিশাল পরিবর্তন
সমীকরণ প্রতিবেদন: জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিতে আমূল পরিবর্তন আসছে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনে ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম’ রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এই রূপরেখা প্রণয়ন করেছে। ২০২৩ সাল থেকেই বাস্তবায়ন শুরু হবে এই পরিবর্তন। শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচির এই নতুন রূপরেখায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মতিও দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা: দীপু মনি। পরিবর্তিত শিক্ষাক্রমে এসএসসি পর্যন্ত কোনো পাবলিক পরীক্ষা থাকছে না। এইচএসসিতে একটি বোর্ড পরীক্ষার পরিবর্তে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে অনুষ্ঠিত হবে দু’টি পাবলিক পরীক্ষা। পরে এই দুই পরীক্ষার পয়েন্ট মিলিয়ে তৈরি হবে এইচএসসির গ্রেড পয়েন্ট। আর তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য থাকবে না কোনো পরীক্ষা। গতকাল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন। পরে সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষাক্রম রূপরেখার বিস্তারিত তুলে ধরেন ডা: দীপু মনি। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘২০২৫ সাল থেকে নতুন প্রণীত জাতীয় শিক্ষাক্রম পুরোপুরিভাবে কার্যকর করা হবে। তবে তার আগে আগামী বছর থেকে প্রাথমিকের প্রথম শ্রেণী এবং মাধ্যমিকের ষষ্ঠ শ্রেণীতে পাইলটিং শুরু হবে। ২০২৩ সাল থেকে প্রাথমিকের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণী এবং মাধ্যমিকের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীতে শুরু হবে নতুন শিক্ষাক্রম। ২০২৪ সালে তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম ও নবম শ্রেণী এবং ২০২৫ সালে পঞ্চম ও দশম শ্রেণীতে এ শিক্ষাক্রম শুরু হবে। ২০২৫ সালের মধ্যে পুরো শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।’ বর্তমানে সব শ্রেণীতেই ধারাবাহিক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়। নতুন কারিকুলামে বেশ কিছু পরীক্ষা তুলে দেয়া হলেও তাদের মেধার মূল্যায়নে কোনো ঘাটতি থাকবে না বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত থাকছে না পরীক্ষা: খসড়া রূপরেখা অনুযায়ী প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত কোনো বার্ষিক পরীক্ষা থাকছে না। খুদে শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে পরবর্তী শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হতে হবে না। তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত বিদ্যালয়েই ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে; অর্থাৎ ক্লাসে মূল্যায়ন করা হবে। এরপর চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণীতে শিখনকালীন মূল্যায়ন হবে ৬০ শতাংশ। আর ৪০ শতাংশ মূল্যায়ন হবে ক্লাস শেষে পরীক্ষার মাধ্যমে, যেটিকে রূপরেখায় ‘সামষ্টিক মূল্যায়ন’ বলা হচ্ছে। পিইসি-জেএসসির মূল্যায়ন: নতুন প্রণীত জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা অনুযায়ী তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত বার্ষিক পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি জানিয়েছেন, চতুর্থ শ্রেণী থেকেই বছর শেষে প্রতি ক্লাসে মূল্যায়ন হবে। শিখনকালীন ও ক্লাস শেষে পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করে ফল জানানো হবে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘প্রাথমিক ও অষ্টম শ্রেণীতে পাবলিক পরীক্ষা রাখা হয়নি। কারণ আমরা সনদের জন্য শিক্ষা নয়, পারদর্শিতা নিশ্চিত করতে চাই। সনদ দেয়ার জন্য পাবলিক পরীক্ষার দরকার নেই।’ নবম-দশমে নেই বিভাগ বিভাজন: অষ্টম থেকে নবম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়ার পরই শিক্ষার্থীদের একটি বিভাগ পছন্দ করতে হতো; অর্থাৎ বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের যেকোনো একটিতে যেতে হতো। তবে নতুন প্রণীত জাতীয় শিক্ষাক্রমে এ বিভাজন থাকছে না। নবম ও দশম শ্রেণীতে সব শিক্ষার্থীকে অভিন্ন ১০টি বিষয় পড়তে হবে। দশম শ্রেণীর আগে কোনো পাবলিক পরীক্ষাও নেয়া হবে। একেবারে দশম শ্রেণীর পর এসএসসি নামে পাবলিক পরীক্ষা হবে, তবে তা হবে শুধু দশম শ্রেণীর পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে। এখন নবম ও দশম শ্রেণীর পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে পাবলিক পরীক্ষা হয়। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত অভিন্ন ১০ বিষয়: খসড়া শিক্ষাক্রম অনুযায়ী ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে ১০টি অভিন্ন বিষয়ে পড়ানো হবে। এরপর একাদশ শ্রেণীতে গিয়ে শাখা পরিবর্তনের সুযোগ রাখা হবে। বর্তমানে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত কিছু অভিন্ন বই পড়তে হয় এবং নবম শ্রেণীতে গিয়ে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা এসব শাখায় ভাগ হয়ে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে। নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত যে ১০ বিষয়ে পড়ানো হবে; সেগুলো হলোÑ বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, সামাজিক বিজ্ঞান, জীবন ও জীবিকা, ধর্ম, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি। বর্তমানে এসব শ্রেণীতে ১২ থেকে ১৪টি বই পড়ানো হয়। একাদশ ও দ্বাদশে পাবলিক পরীক্ষা: আগের মতো একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণী শেষ করার পর এইচএসসি ও সমমানের পাবলিক পরীক্ষা নেয়া হবে না। একাদশ শ্রেণীতে বছর শেষে একটি ও দ্বাদশে আরেকটি পরীক্ষা নেয়া হবে। এ দু’টিই হবে পাবলিক পরীক্ষা। দুই পাবলিক পরীক্ষার ফল মূল্যায়ন করে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হবে। এ ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ পরীক্ষাভিত্তিক ও ৩০ শতাংশ ক্লাস মূল্যায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। ডা: দীপু মনি বলেন, ‘২০২৩ সাল থেকে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর আদর্শিক বিষয়গুলোর ওপর শিখন জ্ঞানের ৩০ ভাগ ও সামষ্টিক মূল্যায়নে ৭০ ভাগ নম্বর মূল্যায়নের আওতায় আনা হবে। তার ভিত্তিতে পাবলিক পরীক্ষায় ৭০ শতাংশ আর শিখন জ্ঞানের ওপর ৩০ শতাংশ নম্বর দেয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘ঐচ্ছিক বিষয়ে শিখন জ্ঞানের ওপর শতকরা শতভাগ নম্বর দেয়া হবে। প্রকল্পভিত্তিক মূল্যায়নের সুযোগ থাকবে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে প্রতি বছর শেষে একটি করে পরীক্ষা দিতে হবে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর দুই পরীক্ষা শেষে উভয় স্তরের নম্বর মূল্যায়ন করে এইচএসসির চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে হবে।’ নতুন শিক্ষাক্রম যেভাবে বাস্তবায়ন: এনসিটিবি প্রণীত নতুন এ শিক্ষাক্রম রূপরেখা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ১০০টি প্রতিষ্ঠানে পাইলটিং হবে। তার মধ্যে কারিগরি ও মাদরাসাকে যুক্ত করা হবে। আর ২০২৩ সাল থেকে প্রাথমিকের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণী এবং মাধ্যমিকের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীতে শুরু হবে নতুন শিক্ষাক্রম। ২০২৪ সালে তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম ও নবম শ্রেণী এবং ২০২৫ সালে পঞ্চম ও দশম শ্রেণীতে এ শিক্ষাক্রম শুরু হবে। ২০২৫ সালের মধ্যে পুরো শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।’ নতুন শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য: নতুন এ জাতীয় শিক্ষাক্রমের মূল লক্ষ্য পড়াশোনাকে আনন্দময় করে তোলা। একই সাথে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকে ঝরে পড়া কমানো। শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগ পাঠগ্রহণ শেষ করতে পারা নিশ্চিত করা; অর্থাৎ পুরো শিক্ষাক্রম হবে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক। এ প্রসঙ্গে দীপু মনি বলেন, ‘আনন্দময় পড়াশোনা হবে। বিষয়বস্তু ও পাঠ্যপুস্তকের বোঝা ও চাপ কমানো হবে। গভীর শিখনে গুরুত্ব দেয়া হবে। মুখস্থ নির্ভরতার বিষয়টি যেন না থাকে, এর বদলে অভিজ্ঞতা ও কার্যক্রমভিত্তিক শেখাকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীর দৈহিক ও মানসিক বিকাশে খেলাখুলা ও অন্যান্য কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ক্লাস শেষে যেন শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো সময় কাটাতে পারে। পড়াশোনার বাইরে খেলাধুলা বা অন্যান্য বিষয়ের সুযোগ কমে গেছে, এটি যেন না হয়। জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। এ দিকে সরকারের নতুন এই শিক্ষাক্রমের বিষয়ে সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন গতকাল সন্ধ্যায় নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকার অনেক দেরিতে এ উদ্যোগ নিয়েছে। আরো আগেই তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারত। কেননা আজ সরকার শিক্ষাক্রমে যেসব পরিবর্তন নিয়ে এসে বাহবা নেয়ার চেষ্টা করছেন এগুলো ২০০৬ সালেই তৎকালীন জোট সরকার বাস্তবায়নের জন্য কাজ শুরু করেছিল। শুধু রাজনৈতিক মনোবৃত্তির কারণেই সরকার ১৪টি বছর নষ্ট করেছে। তিনি বলেন, সরকার শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের জিপিএ বাড়িয়ে সস্তা বাহবা নেয়ার চেষ্টা করেছে। প্রকৃত অর্থে শিক্ষার্থীদের শিখন পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে মানবসম্পদ উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। তবে নতুন উদ্যোগে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পরীক্ষা না নেয়ার সিদ্ধান্ত এবং পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে মন্তব্য করেন তিনি।


কমেন্ট বক্স
notebook

তরুণ প্রজন্মকে ডিজিটাল সাক্ষরতার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে: তথ্যমন্ত্রী