চুয়াডাঙ্গার তরুণ সাংবাদিক মেহেরাব্বিন সানভীর জন্মদিন আজ। ছোটবেলা থেকেই সংবাদ ও সমাজের নানা বিষয় নিয়ে আগ্রহী সানভী শিশু সাংবাদিক হিসেবে পথচলা শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সেই আগ্রহ রূপ নিয়েছে পেশাদার সাংবাদিকতায়। বর্তমানে তিনি দৈনিক সময়ের সমীকরণ-এর যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি জাতীয় দৈনিক আজকের পত্রিকা ও ইংরেজি দৈনিক ডেইলি মর্নিং গ্লোরির চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করছেন।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার গাড়াবাড়িয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া সানভী সাংবাদিকতাকে কেবল পেশা হিসেবে দেখেন না। তাঁর কাছে সংবাদ মানুষের কথা, সমাজের বাস্তবতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর একটি মাধ্যম। তাই বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করলেও দুর্নীতি, অনিয়ম ও অবিচারের চিত্র তুলে ধরতেই তাঁর কলম সবচেয়ে বেশি সক্রিয়।
সানভীর সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু হয় খুব অল্প বয়সে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় শিশু সাংবাদিক হিসেবে ‘ÔSave the Children’ ও শিশু একাডেমির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। পরে শিশু সংগঠন ন্যাশনাল চিলড্রেন টাস্কফোর্সের (এনসিটিএফ) সঙ্গেও দীর্ঘদিন কাজ করেন। সে সময় সেভ দ্য চিলড্রেন ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের সহযোগিতায় প্রকাশিত শিশু বিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘শিশু কথা’র সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দায়িত্বকালীন সময়ে পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশিত হতো।
চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক মরিয়ম শেলীর স্নেহ ও উৎসাহে তাঁর লেখা কিছু প্রতিবেদন তখন স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর সাংবাদিকতার আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ছোটবেলাতেই তিনি বুঝতে শুরু করেন, সংবাদ শুধু কাগজে ছাপা কিছু শব্দ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের অনুভূতি, অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের গল্প।
২০১৬ সালে শিশু সাহিত্যবিষয়ক সাপ্তাহিক পাতা ‘স্বপ্নচারী’র সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মধ্যদিয়ে দৈনিক সময়ের সমীকরণ-এর সঙ্গে তাঁর পথচলা আরও ঘনিষ্ঠ হয়। পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক নাজমুল হক স্বপন, বার্তা সম্পাদক হুসাইন মালিক এবং নিজস্ব প্রতিবেদক এস এম শাফায়েতের স্নেহ ও সহযোগিতা তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের শুরুর দিনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তী সময়ে হুসাইন মালিক ও এস এম শাফায়েত কর্মস্থল পরিবর্তন করলেও প্রধান সম্পাদক নাজমুল হক স্বপন এখনো তাঁর অভিভাবক হিসেবে রয়েছেন।
২০১৯ সালে ডেইলি মর্নিং গ্লোরি এবং ২০২১ সালে আজকের পত্রিকার চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া, বিনোদন ও প্রকৃতিসহ নানা বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তাঁর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিভিন্ন অনিয়ম, অন্যায় ও দুর্নীতির ঘটনা। এসব প্রতিবেদন প্রকাশের পর অনেক ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। তবে নিজের কাজের প্রচার নিয়ে খুব একটা আগ্রহী নন সানভী।
সহকর্মীদের ভাষ্য, নিজের প্রতিবেদনকে তিনি মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবেই দেখতে পছন্দ করেন। তাঁর বিশ্বাস, সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব সত্য তুলে ধরা; নিজেকে সামনে নিয়ে আসা নয়। এ কারণেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশের পরও প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকেন তিনি।
সানভীর পরিচয় শুধু একজন সাংবাদিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও রয়েছে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ। তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চুয়াডাঙ্গা জেলা কমিটির সদস্য। পাশাপাশি বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চুয়াডাঙ্গা ইউনিট, চুয়াডাঙ্গা সরকারি গণগ্রন্থাগার ও চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের আজীবন সদস্য। চুয়াডাঙ্গা সাহিত্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এছাড়া চুয়াডাঙ্গা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদ্য সাবেক সদস্য, উদীচীর আজীবন সদস্য এবং চুয়াডাঙ্গা ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা হিসেবেও যুক্ত রয়েছেন।
নদী রক্ষার আন্দোলন থেকে শুরু করে তরুণদের মধ্যে যুক্তিবোধ ও চিন্তার চর্চা ছড়িয়ে দেওয়ার কাজেও তাঁর আগ্রহ রয়েছে। ২০১৫ সালে শিক্ষক ও লেখক কাজল মাহমুদের সহযোগিতায় চুয়াডাঙ্গা শহরের আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তার্কিক শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন চুয়াডাঙ্গা বিতর্ক চর্চা কেন্দ্র। সংগঠনটির আহ্বায়ক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আন্তঃস্কুল বিতর্ক, ক্ষুদে বিজ্ঞান বিতর্ক এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করেন তিনি। বিতর্ক ও উপস্থিত বক্তৃতায় নিজেও জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে কয়েকটি পুরস্কার অর্জন করেছেন।
শুধু সাংবাদিকতা কিংবা সামাজিক কর্মকাণ্ড নয়, নেতৃত্বের চর্চাও শুরু হয়েছিল তাঁর স্কুলজীবনে। সীমান্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্টুডেন্ট কেবিনেট নির্বাচনে বিপুল ভোটে কেবিনেট প্রধান নির্বাচিত হন সানভী। সপ্তম শ্রেণি থেকেই বিদ্যালয়ের অ্যাসেম্বলির দায়িত্ব পালন করতেন। প্রধান ক্যাপ্টেন হিসেবে দশম শ্রেণি পর্যন্ত নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
ছাত্রজীবনের এসব অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংগঠন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁর অংশগ্রহণের পথ তৈরি করে। জেলা লোকমোর্চা, খেলাঘর আসর ও বন্ধুসভার মতো সংগঠনেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং সমাজ-সংস্কৃতিবিষয়ক নানা প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন।
চুয়াডাঙ্গার জনপ্রিয় জাতীয় ফল কাঁঠাল উৎসবের সঙ্গেও রয়েছে তাঁর নিবিড় সম্পৃক্ততা। ২০১৭ সালে প্রথম আয়োজন থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রতিটি উৎসবে সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। উৎসবটির আয়োজন সফল করতে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
জন্মদিনে মেহেরাব্বিন সানভীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন দৈনিক সময়ের সমীকরণ-এর সম্পাদক ও প্রকাশক এবং চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের প্রশাসক শরীফুজ্জামান শরীফ, পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক নাজমুল হকসহ সমীকরণ পরিবারের সদস্যরা।
শিশু সাংবাদিকতা থেকে শুরু করে পেশাদার সংবাদকর্মী হয়ে ওঠার এই পথচলায় সানভী যুক্ত থেকেছেন সাংবাদিকতা, সাহিত্য, বিতর্ক, সংস্কৃতি ও সমাজসেবার নানা কর্মকাণ্ডে। প্রচারের আলোয় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেয়ে মানুষের কথা তুলে ধরাকেই যিনি গুরুত্ব দেন, তাঁর এই পথচলা চুয়াডাঙ্গার সাংবাদিকতা ও সামাজিক অঙ্গনে এক স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছে।
সমীকরণ প্রতিবেদন