‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’ প্রতিপাদ্যে চুয়াডাঙ্গায় বিশ্ব পর্যটন দিবস উদ্যাপন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল রোববার সকাল সাড়ে ৯টায় জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলা প্রশাসন চত্বর থেকে এই বর্ণাঢ্য র্যালি বের হয়। র্যালিটি শহরের কোর্ট মোড় প্রদক্ষিণ করে পুনরায় জেলা প্রশাসন চত্বরে এসে শেষ হয়। পরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বি. এম. তারিক-উজ-জামানের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পর্যটন শিল্প অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের অর্থনীতিতে পর্যটনের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। ভারতের জিডিপিতে পর্যটন শিল্পের অবদান প্রায় ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। নেপাল ও শ্রীলঙ্কাতেও এ খাতের অবদান উল্লেখযোগ্য। অথচ বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান প্রায় ২ শতাংশ, কখনো কখনো তা ২ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত ওঠে।
তিনি আরও বলেন, পর্যটন শিল্পকে সঠিকভাবে বিকশিত করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব। এ জন্য শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, নিজেদের দায়িত্বশীলতা ও শৃঙ্খলাবোধও নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের নিজেদের ভুল-ত্রুটি নিজেদেরই চিহ্নিত করতে হবে। জেলা প্রশাসক বলেন, একটি দেশকে নিরাপদ বলা তখনই সম্ভব, যখন একজন নারীও সেখানে একা নিরাপদে চলাচল করতে পারেন। পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে পর্যটকদের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেন্টমার্টিনের মতো বিচ্ছিন্ন একটি এলাকায় স্থানীয় মানুষ পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে দেশের মূল ভূখণ্ডে কেন তা সম্ভব হবে না- এ বিষয়টি আমাদের ভাবতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে অবকাঠামোর পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। চুয়াডাঙ্গাতেও ঘোলদাঁড়ি মসজিদ, কাশিপুর জমিদার বাড়িসহ অনেক ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান রয়েছে। কিন্তু এসব স্থানকে ঘিরে পরিকল্পিতভাবে পর্যটন উন্নয়ন করা হয়নি। তিনি বলেন, মানুষের জন্য সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা না করলে তারা বিকল্প ও অনুপযোগী বিনোদনের দিকে ঝুঁকবে। সুস্থ বিনোদনের অন্যতম বড় উৎস হতে পারে প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্রগুলো। পর্যটনকেন্দ্রিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ না বাড়ালে তরুণ প্রজন্ম নানা ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে।
লুৎফুন নাহার বলেন, পর্যটন মানে শুধু কোনো একটি এলাকায় ঘুরতে যাওয়া নয়। একটি এলাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মধ্য দিয়েই পর্যটনের পূর্ণতা আসে। মানুষের জীবনে আনন্দ ও বিনোদনের পাশাপাশি পর্যটন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও বড় একটি ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, চুয়াডাঙ্গায় পর্যটন নেই, এ কথা বলা যাবে না। জেলার বিভিন্ন পর্যটন স্পটকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত প্যাকেজ তৈরি করা গেলে পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। ইতোমধ্যে ভৈরব নদীর তীরে ‘নজরুল পার্ক’ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানকে কেন্দ্র করে কাজ শুরু করা গেলে একদিকে যেমন মানুষের বিনোদনের সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।
তিনি বলেন, পর্যটন উন্নয়নের বিষয়ে ইতোমধ্যে পর্যটন করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং পর্যটন সচিবের কাছে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। সরকার সব জায়গায় শুধু সরকারি অর্থ বিনিয়োগ করতে চাচ্ছে না। গত বুধবার পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা আগ্রহী উদ্যোক্তাদের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে কাজ করতে চাচ্ছেন। এতে পর্যটন করপোরেশন সম্পৃক্ত থাকবে, তৃতীয় পক্ষ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেবে এবং সেখান থেকে অর্জিত মুনাফার একটি অংশ ভাগাভাগি হবে।
সভায় বক্তারা বলেন, পর্যটনের জন্য সবসময় দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজ জেলা ও নিজ এলাকার মধ্যেই দেখার মতো অনেক স্থান রয়েছে। এসব স্থানকে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে। নিজ জেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে প্রচার ও প্রসার করা গেলে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে এবং অনেক মানুষ স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাবেন।
বক্তারা চুয়াডাঙ্গার ঘোলদাঁড়ি মসজিদ, আটকবর, আক্কাস লেক ভিউ পার্ক, ঠাকুরপুর জামে মসজিদ, বিভিন্ন জমিদার বাড়ি, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান, মাথাভাঙ্গা নদীর দুই তীরে পার্ক ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা, ডিসি ইকো পার্ক, আটচালা ঘর, রাইসার বিল ও বেগমপুর বাওড়সহ জেলার বিভিন্ন সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র পরিকল্পিতভাবে উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক শারমিন আক্তার, আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনুর আক্তার, দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লাভলী ইয়াসমীন, চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সিদ্দিকুর রহমান, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আনিছুর রহমান, জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক দীপক কুমার সাহা, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ মিল্টন, জেলা জাসাসের সভাপতি শহিদুল হক বিশ্বাস, সাধারণ সম্পাদক সেলিমুল হাবিব সেলিমসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
এদিকে, বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে দিনব্যাপী ডিসি ইকো পার্কসহ জেলার কয়েকটি পর্যটনকেন্দ্রে একদিনের জন্য দর্শনার্থীদের জন্য বিনামূল্যে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক