দামুড়হুদা উপজেলার ছোট দুধপাতিলা গ্রামে আন্তঃধর্মীয় বিয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সালিশ বৈঠকের নামে এক হিন্দু পরিবারের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগে দুজনকে পুলিশ হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লাভলী ইয়াসমিন। একই সঙ্গে টাকা নেওয়ার ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযুক্তরা হলেন- ছোট দুধপাতিলা গ্রামের মৃত সলেমানের ছেলে সাইফুল ইসলাম (৪৫) এবং একই গ্রামের ইব্রাহিমের ছেলে মাহাবুল ইসলাম।
গতকাল বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে আনসার সদস্যদের হেফাজতে থাকা সাইফুল ইসলাম ও মাহাবুল ইসলামকে দামুড়হুদা মডেল থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ইউএনও লাভলী ইয়াসমিনের নির্দেশে তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ছোট দুধপাতিলা গ্রামের একটি আন্তঃধর্মীয় বিয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কয়েক দফায় সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে সংশ্লিষ্ট পরিবারকে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসে। পরে ইউএনও লাভলী ইয়াসমিন ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি প্রাথমিকভাবে তদন্ত করেন। এরপর সালিশ বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তিদের পাশাপাশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ডেকে পাঠানো হয়। সেখানে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে সাইফুল ইসলাম ও মাহাবুল ইসলাম হিন্দু পরিবারের কাছ থেকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানান ইউএনও।
ইউএনও লাভলী ইয়াসমিন বলেন, ‘ছোট দুধপাতিলা গ্রামের আন্তঃধর্মীয় বিয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সালিশ বৈঠকে তাদের গ্রাম থেকে চলে যাওয়া এবং ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়। এরপর আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি প্রাথমিকভাবে তদন্ত করে আসি।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা সালিশ বৈঠক করেছিলেন এবং যাদের বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, তাদের আমার কার্যালয়ে আসতে বলা হয়। সেখানে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও জিজ্ঞাসাবাদের সময় অভিযুক্তরা ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে হিন্দু পরিবারের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। পরে চাঁদাবাজির অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য থানা হেফাজতে পাঠানো হয়েছে।’
ইউএনও আরও বলেন, শুধু ওই দুইজনই টাকা নেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন কি না, নাকি এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত রয়েছেন- তা খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, সালিশ বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তিদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। যার যার বাসস্থানে সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে হবে। কেউ কাউকে হুমকি-ধমকি দিলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দামুড়হুদা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শেখ মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘চাঁদাবাজির অভিযোগে ইউএনও মহোদয় দুইজনকে আমাদের হেফাজতে দিয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা হচ্ছে। মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অভিযুক্তদের বিষয়ে শুনানি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় ছোট্ট দুধপাতিলা গ্রামের সালিশ বৈঠকে উপস্থিত হাউলি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শহিদুল ইসলাম, ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, হাউলি ইউনিয়ন জামায়াতের আমির ওবায়দুর হক এবং গোবিন্দ হালদার উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ছোট্ট দুধপাতিলা গ্রামের এক হিন্দু পরিবারের দুই সন্তানের জননী এবং একই গ্রামের এক মুসলিম পরিবারের এক নারীর সঙ্গে এক ব্যক্তির সম্পর্ক ও পরবর্তী সময়ে ধর্ম পরিবর্তন করে বিয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় আলোচনা শুরু হয়।
প্রতিবেদক দামুড়হুদা