মাদকবিরোধী অভিযান, লক্ষ্য মাদক নির্মূল। স্থানীয়ভাবে গঠিত হয়েছে ‘মাদক নির্মূল কমিটি’। কিন্তু সেই কমিটিরই কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ- মাদক আটকের পর তা আত্মসাৎ, আটকের ঘটনা গোপন রেখে অর্থ আদায় এবং জব্দ করা মাদকের প্রকৃত পরিমাণ কম দেখিয়ে মামলা করার। ঘটনাটি চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানাধীন আকন্দবাড়িয়া গ্রামের।
অভিযোগ অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে করে মাদক নিয়ে যাওয়ার সময় এক যুবককে আটক করে স্থানীয় মাদক নির্মুল কমিটির কয়েকজন সদস্য। তার কাছ থেকে ১৩২ বোতল ভারতীয় নিষিদ্ধ নেশাজাতীয় স্কাফ সিরাপ নেওয়া হলেও মোটরসাইকেলটি ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে দাবি করা হয় ২০ হাজার টাকা। পরে সেই টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেওয়ার পরও বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়নি। বরং ৯৭ বোতল আত্মসাৎ করে পুলিশকে দেওয়া হয় মাত্র ৩৫ বোতল স্কাফ সিরাপ ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের তথ্য। এ ঘটনায় করা হয় মামলা।
জানা গেছে, গত ১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার দুপুর। আকন্দবাড়িয়া স্কুল এলাকার একটি বাঁশবাগানের মধ্যদিয়ে মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলেন গ্রামের বাসিন্দা বিকাশ (৩০)। তার দাবি, মোটরসাইকেলটিতে ছিল ১৩২ বোতল ভারতীয় নিষিদ্ধ নেশাজাতীয় স্কাফ সিরাপ। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় স্থানীয় ‘মাদক নির্মূল কমিটি’র কয়েকজন সদস্য মোটরসাইকেলটির গতিরোধ করে তল্লাশি চালান। সেখানে জসিম, জুয়েল, রিপন ও রকিসসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
বিকাশের দাবি, তল্লাশির পর তার মোটরসাইকেল ও স্কাফ সিরাপগুলো নিয়ে নেওয়া হয়। এরপর মোটরসাইকেলটি ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে তার কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া এবং তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান বিকাশ।
ঘটনার পর বিষয়টি সামনে আসে বিকাশের দুলাভাই রাজাকে ফোন করার মধ্যদিয়ে। রাজা অভিযোগ করেন, জসিম তাকে ফোন করে বিকাশকে মাদকসহ আটকের কথা জানান। একই সঙ্গে মোটরসাইকেলটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। রাজা বলেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা পাঠান। এ লেনদেনের তথ্য-প্রমাণ তার কাছে রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, টাকা দেওয়ার পরও বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়নি।
রাজা অভিযোগ করেন, বিকাশের মোটরসাইকেলে থাকা ১৩২ বোতল স্কাফ সিরাপের মধ্যে ৩৫ পিস পুলিশকে উদ্ধারের কথা জানানো হয়। সঙ্গে উদ্ধার দেখানো হয় মোটরসাইকেলটি।
অর্থাৎ অভিযোগকারীর দাবি অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে থাকা মাদকের পরিমাণ এবং পরে মামলায় দেখানো উদ্ধারকৃত মাদকের পরিমাণের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য নিয়েই এখন উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- আটকের সময় প্রকৃতপক্ষে কত বোতল মাদক ছিল? যদি ১৩২ বোতল থাকে, তাহলে বাকি মাদকের কী হয়েছে? আর যদি ৩৫ বোতলই উদ্ধার হয়ে থাকে, তাহলে ১৩২ বোতলের দাবি কতটা সত্য? এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ২০ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগও।
রাজা আরও অভিযোগ করেন, জসিম, জুয়েল, রিপন ও রকিসসহ কয়েকজন ‘মাদক নির্মূল কমিটি’র নাম ব্যবহার করে মাদক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে মাদক সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। তার অভিযোগ, মাদক উদ্ধারের পর সেটি যথাযথভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তরের পরিবর্তে নিজেদের মধ্যে রেখে দেওয়ার পাশাপাশি আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে।
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত মাদক নির্মুল কমিটির সদস্য জসিমের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি। তবে আকন্দবাড়িয়া মাদক নির্মুল কমিটির সভাপতি মুন্নাফ বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। তিনি বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে জানার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, অভিযুক্তরা মাদক সেবনও করেন না বলে তিনি জানেন। তবে কমিটির নাম ব্যবহার করে কেউ যদি এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে থাকে এবং অভিযোগের তথ্য সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দর্শনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম বলেন, গত ১৯ সেপ্টেম্বর আকন্দবাড়িয়া এলাকা থেকে ৩৫ বোতল স্কাফ সিরাপ ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে কোনো আসামি পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, এ ঘটনায় দর্শনা থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিষয়টি তদন্ত করে আরও খতিয়ে দেখবেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক