দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত এক দশকে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ কোটি ১৭ লাখ ছাড়িয়েছে। একই সময়ে বেড়েছে কর্মসংস্থান, সম্প্রসারিত হয়েছে সেবা ও শিল্প খাতের কার্যক্রম। দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য এসব তথ্যকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪’র জাতীয় প্রতিবেদন (ন্যাশনাল রিপোর্ট) বিষয়ক এক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জেলা প্রশাসনের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিসহ গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন। জেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা ওয়ালিয়র রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার।
সেমিনারে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০১৩ সালের অর্থনৈতিক শুমারিতে দেশে মোট অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৭৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৫। ২০২৪ সালের চূড়ান্ত ফলাফলে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৭৯২-এ। অর্থাৎ, গত ১১ বছরে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোর মধ্যে সেবা খাতের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে সেবা খাতে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ কোটি ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪৩, যা মোট প্রতিষ্ঠানের ৯০ দশমিক ২ শতাংশ।
অন্যদিকে শিল্প খাতে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৪৯, যা মোটের ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ২০১৩ সালের তুলনায় শিল্প খাতে ২৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৫২ দশমিক ৩২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। একক খাত হিসেবে দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, যার অংশীদারিত্ব ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ। এরপর রয়েছে পরিবহন ও সংরক্ষণ খাত ২২ দশমিক ২২ শতাংশ, উৎপাদন বা ম্যানুফ্যাকচারিং খাত ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং আবাসন ও খাদ্যসেবা কার্যক্রম ৮ দশমিক ১১ শতাংশ। জাতীয় শিল্পনীতি ২০২২ অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাসকৃত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সংখ্যাগতভাবে মাইক্রো ও কুটির শিল্পের আধিপত্য স্পষ্ট। দেশে বর্তমানে মাইক্রো শিল্পের সংখ্যা ৬৬ লাখ ৩১ হাজার ৪৮২, যা মোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ৫৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। কুটির শিল্প রয়েছে ৪৫ লাখ ৩৩ হাজার ৫৮৯টি বা ৩৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এছাড়া ক্ষুদ্র শিল্প ৪ লাখ ৯২ হাজার ৩২৩, মাঝারি শিল্প ৩৬ হাজার ১১২ এবং বৃহৎ শিল্পের সংখ্যা ৯ হাজার ২৮৬।
সেমিনারে আরও জানানো হয়, ২০২৪ সালের শুমারি অনুযায়ী দেশের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত জনবলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬ লাখ ৩২ হাজার ৬৬১ জনে। ২০১৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪৫ লাখ ৮৫০। ফলে এক দশকের ব্যবধানে কর্মসংস্থানেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের গ্রামীণ অঞ্চলে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ৭৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮২৮ এবং শহরাঞ্চলে ৪৩ লাখ ১৬ হাজার ৯৬৪। ২০১৩ সালের তুলনায় গ্রাম ও শহর উভয় এলাকাতেই অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বিস্তার ঘটেছে এবং প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঠিক চিত্র তুলে ধরতে অর্থনৈতিক শুমারির গুরুত্ব অপরিসীম। উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কর্মসংস্থানের বাস্তব চিত্র জানতে নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্তের বিকল্প নেই। তিনি বলেন, পরিসংখ্যান ও শুমারি কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে হবে এবং যাচাই-বাছাই শেষে তা উপস্থাপন করতে হবে। কারণ সঠিক তথ্যই কার্যকর পরিকল্পনা ও উন্নয়নের ভিত্তি।
সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক শারমিন আক্তার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) নয়ন কুমার রাজবংশী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বি.এম. তারিক উজ জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোস্তাফিজুর রহমান, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা অহীন্দ্র কুমার মণ্ডল, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সাহাবুদ্দিন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক দীপক কুমার সাহা, সদর উপজেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা বিল্লাল হোসেন, চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক সময়ের সমীকরণ-এর প্রধান সম্পাদক নাজমুল হক স্বপন, প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম সনি, দৈনিক মাথাভাঙ্গার সম্পাদক ও প্রকাশক সরদার আলামিন, দৈনিক খাসখবরের প্রধান সম্পাদক রাজীব হাসান কচি, দৈনিক আজকের চুয়াডাঙ্গার সম্পাদক ও প্রকাশক বিপুল আশরাফসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, পরিসংখ্যান বিভাগের কর্মী এবং সাংবাদিকেরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক