বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা, প্রবীণ সাংবাদিকদের স্মৃতিচারণ, ফুলেল শুভেচ্ছা ও কেক কাটার মধ্যদিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের ৬০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন করা হয়েছে। ছয় দশকের পথচলায় সাংবাদিকতা, সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে গতকাল শনিবার সকাল থেকেই প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে ছিল উৎসবের আমেজ। প্রেসক্লাবের সদস্য, অতিথিসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে পুরো আয়োজন হয়ে ওঠে মিলনমেলায়।
গতকাল শনিবার বেলা সাড়ে ১০টায় চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাব থেকে বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও কোর্টমোড় এলাকা প্রদক্ষিণ করে পুনরায় প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে ফিরে আসে। পরে প্রেসক্লাব মিলনায়তনে পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াতের মধ্যদিয়ে শুরু হয় আলোচনা সভা। চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক সময়ের সমীকরণের প্রধান সম্পাদক নাজমুল হক স্বপনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডিসি বলেন, কথায় আছে প্রেসিডেন্ট আমেরিকা শাসন করে ৪ বছর, আর সাংবাদিরকরা শাসন করে চিরকাল। আপনারা সবাই এমন একটি মহান পেশার সাথে জড়িত, বাংলাদেশকে যে সরকারি শাসন করুক না কেন, আপনারাও চিরকারই শাসন করবেন।
তিনি আরও বলেন, সরকারকে লজ্জিত করে সত্য বলানো সাংবাদিকদের প্রধান কাজ। যে বিষয়গুলো মানুষ অপ্রকাশিত রাখতে চান, সেগুলো আপনারা জনগনের সামনে তুলে ধরুন। যার মাধ্যমে সত্য সবসময় জাতি জানতে পারে। তিনি বলেন, অপপ্রচার বন্ধ হোক। আমরা সবাই সত্যের পথে থাকি এবং চলি। আমরা যতটুকু দিয়ে আপনাদের সাহায্য করতে পারি তাতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
তিনি বলেন, আমাদের সমাজ নেতিবাচকতায় ছেয়ে গেছে। তাই আপনাদের কাছে অনুরোধ, সবাইকে ইতিবাচকতার সাথে রাখেন, সাথে থাকেন এবং সবাইকে ইতিবাচকতা ছড়িয়ে দেন। আমাদের দরজা আপনাদের সবার জন্য খোলা। আপনাদের যেকোনো সমস্যা বা সাহায্যে জেলা প্রশাসনের দরজা সবসময় খোলা থাকবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফ ও চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবির খান।
চুয়াডাঙ্গা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, আগামীর বাংলাদেশ ও চুয়াডাঙ্গাকে এগিয়ে নিতে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে যারা সিনিয়র, তাদের নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের তৈরি করতে হবে। এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যাতে সাংবাদিকতা পেশা থেকে লাঞ্ছিত হয়ে শহর ছেড়ে চলে যেতে হয়। তিনি আর বলেন, বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা এখনও পুরোপুরি আসেনি। দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকতা একটি মহৎ পেশা।
দৈনিক সময়ের সমীকরণের সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে নিজের অবস্থান তুলে ধরে শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, তিনি রাজনীতি করলেও নিজের পত্রিকার কোনো সুবিধা ব্যক্তিগতভাবে নেন না। বিরোধী দল কিংবা সরকারি দল—কারও কাছ থেকেই ব্যক্তিগত সুবিধা নেন না। অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে পত্রিকা পরিচালনার চেষ্টা করছেন তিনি।
তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আগামী দিনের বাংলাদেশের জন্য সবাইকে একে অপরের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে। ছাড় দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করে চুয়াডাঙ্গার দুটি প্রেসক্লাবকে ঐক্যবদ্ধ করে একই বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সহকর্মীদের ভবিষ্যৎ কিংবা যেকোনো বিপদ-আপদে পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রেসক্লাবের একটি তহবিল গঠন করা প্রয়োজন। একটি নিয়মের মাধ্যমে সেই তহবিল থেকে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতা করা যেতে পারে।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবির খান বলেন, চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলের সাংবাদিকতার পরিবেশ অনেক পরিচ্ছন্ন ও উর্বর। সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। তবে ডিজিটাল যুগে এই চতুর্থ স্তম্ভে অপসাংবাদিকতা, অপতথ্য, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং নিবন্ধনহীন মোবাইল সাংবাদিকতার মতো বিষয় যুক্ত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মূলধারার সাংবাদিকদের এসব বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সাংবাদিকদের নিজেদের সম্মান নিজেদেরই আদায় করে নিতে হবে। প্রশাসন সাংবাদিকদের সহযোগিতায় সবসময় পাশে থাকবে।
পুলিশ সুপার বলেন, অনেকেই ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছেন। অনুমোদনহীন কিছু ভুয়া সাংবাদিকও এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত। এসব কর্মকাণ্ড সাংবাদিকতা পেশাকে অসম্মানিত করে এবং সমাজে মিথ্যা তথ্যের উপস্থিতি বাড়ায়। পরে তিনি প্রেসক্লাব ও সাংবাদিকদের সার্বিক মঙ্গল কামনা করেন।
সভাপতির বক্তব্যে চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক সময়ের সমীকরণের প্রধান সম্পাদক নাজমুল হক স্বপন বলেন, প্রেসক্লাবকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিতে নানা পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে একটি কল্যাণ তহবিল রয়েছে। তবে এই তহবিল থেকে কোনো সদস্য মারা গেলে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হলেও কেউ হঠাৎ বিপদে পড়লে কিংবা অর্থসংকটে পড়লে সহযোগিতা করা সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, প্রেসক্লাবের সবচেয়ে বড় দুঃখ হলো একটি শক্তিশালী তহবিল গঠন করতে না পারা। ফলে কোনো সাংবাদিক অসুস্থ হলে তাঁকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমান তহবিলে হাত দিলে তা মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায়। এ কারণে আরও একটি পৃথক তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নাজমুল হক স্বপন আরও বলেন, প্রেসক্লাব ভবনের চতুর্থ তলায় একটি অডিটোরিয়াম করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন এবং অতিথিদের বসার ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে। তিনি জানান, প্রেসক্লাবের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য জেলা পরিষদের প্রশাসক ইতোমধ্যে ছয় লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন। পর্যায়ক্রমে যারা প্রেসক্লাবের সঙ্গে থাকবেন এবং প্রতিষ্ঠানটিকে সমৃদ্ধ করতে সহযোগিতা করবেন, তাঁদের সহযোগিতা নিয়েই প্রেসক্লাবকে আরও এগিয়ে নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, সাংবাদিকরাই সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রকে দেশের এই অবস্থানে নিয়ে আসার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। দেশের অর্থ পাচারের যে পরিসংখ্যান সামনে এসেছে, সেটিও প্রথমে সাংবাদিকরাই তুলে ধরেছেন। সবকিছু মিলিয়ে চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের কার্যনির্বাহী সদস্য হুসাইর মালিকের সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম সনি। আরও বক্তব্য দেন প্রফেসর সিদ্দিকুর রহমান, সরদার আলী হোসেন, এমএম শাহজাহান মুকুল, বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম প্রমুখ। অনুষ্ঠানে প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য কামরুল আরেফিনসহ প্রবীণ সাংবাদিকেরা স্মৃতিচারণ করেন। এর আগে জেলার বিভিন্ন উপজেলা প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। পরে অতিথিরা কেক কেটে প্রেসক্লাবের ৬০ বছর পূর্তি উদযাপন করেন।
অনুষ্ঠানে আলমডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. বশিরুল আলম, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মীর ফাহিম ফয়সাল, আলমডাঙ্গা উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি নাহিদ হাসান ও সাধারণ সম্পাদক শাওন, দামুড়হুদা প্রেসক্লাবের সভাপতি শামসুজ্জোহা পলাশ, জীবননগর প্রেসক্লাবের সভাপতি ফয়সাল মাহতাব মানিক ও সাধারণ সম্পাদক মো. রিপন হোসেন, জীবননগর প্রেসক্লাবের (একাংশ) সভাপতি এম. আর. বাবু ও সাধারণ সম্পাদক (একাংশ) নূর আলম চুয়াডাঙ্গা প্রসক্লাবের সভাপতি নাজমুল হক স্বপন ও সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম সনিকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
নিজস্ব প্রতিবেদক