মাদ্রাসার শয়নকক্ষে দুই শিক্ষার্থীর অসামাজিক ও অনৈতিক কাণ্ড দেখে ফেলে শাসন করাই যেন কাল হলো এক শিক্ষকের। নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে এবং শাস্তি থেকে বাঁচতে উল্টো সেই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধেই বলাৎকারের মিথ্যা অপবাদ চাপিয়ে দিল দুই শিক্ষার্থী। আর সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই উত্তেজিত জনতার মবের শিকার হয়ে গণপিটুনি খেয়ে অবশেষে কারাগারে ঠাঁই হলো নির্দোষ ওই শিক্ষকের।
চাঞ্চল্যকর ও স্পর্শকাতর এই ঘটনাটি ঘটেছে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার দুধসরা গ্রামে অবস্থিত ‘দারুল উলুম আসুফফা মাদ্রাসা’য়। মিথ্যা বলাৎকারের অভিযোগে বর্তমানে কারাগারে চিকিৎসাধীন রয়েছেন মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মাওলানা আবুল বাশার।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ৭ সেপ্টেম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারায় কোটচাঁদপুর থানায় ৭ নম্বর মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলার আরজিতে অভিযোগ আনা হয়, প্রধান শিক্ষক আবুল বাশার গত ৫ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১১টা ৫০ মিনিটে লাবিব হাসান নামের এক নাবালক শিক্ষার্থীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বলৎকার করেন। একইভাবে পরদিন ৬ সেপ্টেম্বর রাত দেড়টার দিকে সাজিম নামের অপর এক শিক্ষার্থীর ওপরও তিনি একই নির্যাতন চালান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। তবে ঘটনার সরজমিন অনুসন্ধানে এবং মাদ্রাসার গোপন সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় উন্মোচিত হয়েছে গা শিউরে ওঠার মতো মূল রহস্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থী লাবিব হাসান নিজ বাড়িতে গিয়ে তার বাবা মোস্তফা রশিদী ও দাদা খলিলুর রহমানের কাছে হুজুরের বিরুদ্ধে অপবাদ রটায়। মুহূর্তে খবরটি ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী কোনো কিছু না শুনেই মাদ্রাসায় চড়াও হয়ে প্রধান শিক্ষক আবুল বাশারকে মারধর করে। খবর পেয়ে পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায় এবং পরের দিন ৮ সেপ্টেম্বর তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়। পুলিশ অভিযান চালিয়ে অফিসের কম্পিউটার ও ল্যাপটপ জব্দ করলেও সিসি ক্যামেরার মূল ডিভিআর (ডিজিটাল ভিডিও রেকর্ডার) ফলে ছাদ থেকে উদ্ধার করেন মাদ্রাসার অন্যান্য শিক্ষকরা।
অভিযোগে উল্লিখিত ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বরের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এজাহারে বর্ণিত সময়ে কোনো শিক্ষক শয়নকক্ষে প্রবেশই করেননি। বরং গত ৫ সেপ্টেম্বর রাত ১১টা ৩০ মিনিটের ফুটেজে দেখা যায়, শয়নকক্ষে দুই শিক্ষার্থী নিজেদের মধ্যে চরম আপত্তিজনক ও অসামাজিক কাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে। যেখানে শিক্ষার্থী সাজিম তার সহপাঠী লাবিবকে উত্ত্যক্ত ও অসামাজিক কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য করছে।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে মাদ্রাসার দায়িত্বশীল শিক্ষকরা জানান, সিসিটিভি মনিটরে দুই শিক্ষার্থীর এই কুকর্ম দেখে ফেলেন প্রধান শিক্ষক মাওলানা আবুল বাশার। ৬ সেপ্টেম্বর সকালে তিনি ওই দুই শিক্ষার্থীকে নিজ কক্ষে ডেকে কঠোরভাবে শাসন করেন এবং অভিভাবকদের জানানোর হুমকি দেন। এতে আতঙ্কিত হয়ে নিজেদের অপরাধ ঢাকার জন্য সাজিমের প্ররোচনায় শিক্ষক আবুল বাশারের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ঘৃণ্য অপবাদ রটিয়ে দেয় তারা।
ঘটনার মূল হোতা শিক্ষার্থী সাজিমের মা লতা খাতুন নিজেদের ভুল স্বীকার করে জানান, "আমার ছেলে ছোট মানুষ, একটা মারাত্মক ভুল করে ফেলেছে। সেই ভুলের কারণেই আজ নির্দোষ হুজুর জেলে ফেঁসে গেছেন। হুজুর অনেক ভালো মানুষ, বিষয়টি নিয়ে আমরা চরম লজ্জিত ও অনুতপ্ত।"
একই কথা স্বীকার করে সাজিমের দাদা আব্দুল মজিদ বলেন, "পোলাপান ভুল করে ফেলেছে, কিন্তু সেই ভুল ঢাকতে শিক্ষকের ওপর এই দায় চাপানো মোটেও ঠিক হয়নি।"
এদিকে একজন সজ্জন ও সৎ শিক্ষককে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর প্রতিবাদে এবং মাওলানা আবুল বাশারের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে গত ১০ সেপ্টেম্বর কোটচাঁদপুরে সর্বস্তরের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এ বিষয়ে কোটচাঁদপুর মডেল থানার ওসি মেহেদী হাসান বলেন, "প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে মামলা রুজু করে আসামিকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আসামিপক্ষের কাছে যদি নির্দোষ হওয়ার কোনো সিসিটিভি ফুটেজ বা প্রমাণ থাকে, তবে তারা তা আদালতে উপস্থাপন করতে পারেন।"
ঝিনাইদহ অফিস