প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সারাদেশের ন্যায় চুয়াডাঙ্গাতেও দীর্ঘদিন ধরে অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থের অপেক্ষায় থাকা এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য ‘ইএফটিআই আইবিএএস’-এর মাধ্যমে অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্ট সুবিধার অর্থ প্রধান অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেছেন। গতকাল শনিবার জুম প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ভিডিও কনফারেন্সে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে জেলার সুবিধাভোগী এমপিওভুক্ত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
এসময় চুয়াডাঙ্গা থেকে ভিডিও কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ পারভেজ রাসেল, জেলা প্রশাসক লুৎফন নাহার, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবীর খান, জেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) আনিসুর রহমান, চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক সময়ের সমীকরণের প্রধান সম্পাদক নাজমুল হক স্বপন, জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মানিক আকবরসহ জেলার সুবিধাভোগী এমপিওভুক্ত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা ও সাংবাদিকবৃন্দ। চুয়াডাঙ্গা জেলায় এ কার্যক্রমের আওতায় মোট ১৯২ জন এমপিওভুক্ত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী সুবিধা পাচ্ছেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০ জন এমপিওভুক্ত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর মাঝে স্মারক চেক প্রদান করেন। এসময় প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কক্সবাজার, বগুড়া, দিনাজপুরসহ চাঁদপুর জেলার শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়ে আলোচনা করেন। এ সময় শিক্ষকরা প্রধানমন্ত্রীর উক্ত উপহারে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তাকে কৃতজ্ঞতা জানান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষকরা সমাজের ‘আলোকবর্তিকা’। অবসরকালীন সুবিধার অর্থের জন্য তাদের আর অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না বলে আশ্বস্ত করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, “আপনারা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমাদের চলমান এই সমাজে আলোকবর্তিকা হিসেবে ভূমিকা রাখবেন এই প্রত্যাশা রাখছি।”
সরকারপ্রধান বলেন, “আজ এই অনুষ্ঠানে একটি কথা তুলে ধরতে চাই, যতদিন আপনাদের নির্বাচিত বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে, অবসরকালীন সুবিধার টাকা পেতে আপনাদেরকে আর অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না। আমাদের চেষ্টা থাকবে যাতে আপনাদের আর কোনো ভোগান্তি পোহাতে না হয়। আর কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর যন্ত্রণা সইতে হবে না। আগামী দিনগুলোতে যথাসময়ে অনলাইনে আপনাদের প্রাপ্য টাকা কোনো ভোগান্তি ছাড়াই আপনাদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে ইনশাআল্লাহ।”
অনুষ্ঠানের শুরুতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কল্যাণে তার উদ্যোগেই ১৯৯১ সালে ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট’ এবং ২০০২ সালে ‘অবসর সুবিধা বোর্ড’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি এ তহবিলে সরকারি তহবিল থেকে প্রথমে ১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেন এবং পর্যায়ক্রমে ৮৯ কোটি টাকার তহবিল গঠন করে এ তহবিলের সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেন।
তারেক রহমান বলেন, “সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া বরাবরই শিক্ষা-শিক্ষক-শিক্ষিকা-শিক্ষার্থী সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করতেন। বিশেষ করে নারীদের একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার ক্ষেত্রে তার উদ্যোগ এবং ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
তিনি বলেন, “অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠিত দুটি তহবিলে শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ প্রতিমাসে যে টাকা জমা দেন সেই টাকার সঙ্গে সরকারও প্রতিটি অ্যাকাউন্টের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে একটি ‘অ্যামাউন্ট’ জমা করেন। এর উদ্দেশ্য হলো, দীর্ঘ চাকরি জীবন শেষে অবসর যাওয়ার সময় প্রত্যেক শিক্ষক-শিক্ষিকা যাতে একটি ভালো ‘অ্যামাউন্ট’ হাতে পান।”
সরকারপ্রধান বলেন, উদ্দেশ্য মহৎ হলেও দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, চাকরি জীবন শেষে অবসরে গিয়ে এই টাকা উত্তোলন করতে শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরকে নানাধরণের ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এমনকি নিজেদের প্রাপ্য টাকা তুলতে গিয়ে মনে হয় ঘুষ দেওয়ার অলিখিত নিয়মও চালু হয়ে গিয়েছিল। আমরা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কোনোরকম ভোগান্তি ছাড়াই অনলাইনে তাদের প্রাপ্য টাকা যার যার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শিক্ষক সমাজ, যারা নীতি-নৈতিকতা আর আদর্শের বাণী শিখিয়ে লাখো কোটি শিক্ষার্থীদেরকে বড়ো করে তোলেন, তাদেরকেই যদি ঘুষ দিয়ে টাকা তুলতে হয় কিংবা অফিসে অফিসে ঘুরে ভোগান্তি পোহাতে হয়, আমি মনে করি, সেটি শুধু শিক্ষকদের হয়রানি নয় বরং জাতি হিসেবে আমাদের ‘দীনতা-হীনতা’ই প্রকাশ পায়।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এবং শিক্ষাসচিব আব্দুল খালেক প্রমুখ বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে জানানে হয়, শিক্ষক-শিক্ষিকা-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণের এই অর্থ পরিশোধে এককালীন ২০৩৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বরাদ্দ করেছে সরকার। চার বছর ধরে জমে থাকা শিক্ষকদের বকেয়ার জট কাটাতে দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে শিক্ষকদের স্ব স্ব ব্যাংক হিসাবে এ অর্থ পাঠানো হচ্ছে। দেশের বেসরকারি স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসার অবসরপ্রাপ্ত ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা ২০২২ সালের পর সরকারি দুটি তহবিলে তাদের জমানো টাকার একটি অংশ ফেরত পাচ্ছেন। এ দুটি তহবিলের একটি হচ্ছে, ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট’ এবং অন্যটি ‘অবসর সুবিধা বোর্ড’।
সমীকরণ প্রতিবেদন