ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চুয়াডাঙ্গা সাধারণত দেশের অন্যতম উঁচু একটি জেলা। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো এখানে ঢালাওভাবে বন্যা না হলেও, গত কয়েকদিনের রেকর্ডভাঙা অতিবর্ষণ জেলার কিছু কিছু নিচু এলাকাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। আকস্মিক এই জলাবদ্ধতায় চুয়াডাঙ্গার বেশ কিছু নিচু এলাকার সাধারণ মানুষ হঠাৎ করেই জলবন্দী হয়ে পড়েছেন। ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন খেটে খাওয়া অসহায় মানুষগুলো। ঠিক এই কঠিন মুহূর্তে মানবতার হাত বাড়িয়ে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. শরীফুজ্জামান শরীফ।
চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া
পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামিনুর রহমান জানিয়েছেন, গত
শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গায় রেকর্ড ১৭৪
মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এরপর শনিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত আরও ৯.৯
মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ এখনই শান্ত হচ্ছে
না; আগামী দুই থেকে তিন দিন জেলায় এই ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে বলে
সতর্ক করেছেন তিনি।
টানা বৃষ্টির এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচতে চুয়াডাঙ্গার
ভেমরুল্লাহ এলাকার বেশ কিছু অসহায় পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে স্থানীয় ভেমরুল্লাহ
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। গতকাল শনিবার বেলা ১০টার দিকে সেখানে
গিয়ে দেখা যায় এক আবেগঘন পরিবেশ। আকস্মিক এই দুর্যোগে হঠাৎ সব হারিয়ে
আশ্রয়ের জন্য ব্যাকুল তারা। জলাবদ্ধতার কারণে রান্নাবান্না বন্ধ থাকায়
ক্ষুধার্ত শিশুদের কান্না আর বয়োবৃদ্ধদের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠেছিল
আশ্রয়কেন্দ্রের বাতাস।
দুর্যোগের খবর পেয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির
পক্ষ থেকে ভেমরুল্লাহ প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা অত্যন্ত অসহায় ও
জলমগ্ন ৩০টি পরিবারের সদস্যদের মাঝে এক মাসের সম্পূর্ণ খাদ্য উপকরণ ও
ত্রাণ সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। আর্তমানবতার এই সেবায় সশরীরে উপস্থিত হয়ে
ত্রাণ বিতরণ করেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের নবনিযুক্ত
প্রশাসক মো. শরীফুজ্জামান শরীফ। আচমকা এই খাদ্য সহায়তা পেয়ে অনেকের চোখেই
দেখা যায় স্বস্তির অশ্রু।
এসময় জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক
শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, “চুয়াডাঙ্গার ভেমরুল্লাহ গ্রামে আকস্মিক ভারী
বৃষ্টিতে প্রায় ৩০টি পরিবারের অন্তত ১৩০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
তাদের অনেকের ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তারা স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে
আশ্রয় নিয়েছেন। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ওয়ার্ড বিএনপির নেতাকর্মীরা
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাদের থাকা-খাওয়া ও প্রয়োজনীয়
সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গাবাসীর পক্ষ
থেকে আমরা এই অসহায় মানুষদের পাশে আছি। তারা নিজ নিজ বাড়িতে নিরাপদে ফিরে
যেতে না পারা পর্যন্ত আমরা তাদের পাশে থাকবো। আমি আজকে জেলা বিএনপির পক্ষ
থেকে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে এক বস্তা চালসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী
প্রদান করলাম। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী স্থানীয়
নেতাকর্মীদেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এই বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত ভেমরুল্লাহ
গ্রামের মানুষসহ জেলার যেকোনো দুর্যোগে আক্রান্ত মানুষের প্রয়োজনের সময়
সর্বাত্মকভাবে পাশে থাকার জন্য।’
ত্রাণ বিতরণকালে আরও উপস্থিত ছিলেন পৌর
বিএনপির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম মনি, পৌর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক হাফিজুর
রহমান মুক্ত, জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রশীদ ঝন্টু, জেলা জাসাস
সাধারণ সম্পাদক সেলিমুল হাবিব সেলিম, জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহেদ
মোহাম্মদ রাজিব খান, জেলা মহিলা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নাসরীন পারভীন এবং
জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পৌর
বিএনপির ১ নম্বর ওয়ার্ড শাখার সভাপতি আব্দুল করিম, যুগ্ম সম্পাদক লাল্টু,
সদর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান হ্যাপি এবং পৌর ছাত্রদলের
সদস্য শাহারু আহমেদসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
এদিকে ত্রাণের এই স্বস্তির
মাঝেও উথলে উঠেছে বুকভাঙা কষ্ট আর একরাশ অবহেলার যন্ত্রণা। জনপ্রতিনিধিদের
লোকদেখানো সহানুভূতির কথা বলতে গিয়ে ক্ষোভে-দুঃখে কান্নায় ভেঙে পড়েন
আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা নাসরিন আক্তার নামের এক অসহায় নারী। তীব্র আক্ষেপ নিয়ে
তিনি বলেন, “রাত সাড়ে ১০টার দিকে জামাতের (জামায়াত) এমপি সাহেব এখানে
এসেছিলেন। তিনি শুধু ঘটনাস্থল ঘুরে দেখে চলে গেলেন। আমাদের জন্য কোনো
খাবার, আর্থিক সহায়তা কিংবা অন্য কোনো ধরনের সহযোগিতা তিনি করেননি। এরপর আর
কেউ আমাদের খোঁজ নিতেও আসেনি। আমরা না খেয়ে মরছি কি বাঁচছি, তা দেখার যেন
কেউ নেই!”
নিজস্ব প্রতিবেদক