বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি
চুয়াডাঙ্গায় জোড়াতালির মাতৃসেবা : মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র নিজেই এখন সংকটে ধুঁকছে

দুই বছর বন্ধ অ্যাম্বুলেন্স, নেই ওষুধ-জনবল; রোগীদের দুর্ভোগ

  • আপলোড তারিখঃ ২১-০৫-২০২৬ ইং
দুই বছর বন্ধ অ্যাম্বুলেন্স, নেই ওষুধ-জনবল; রোগীদের দুর্ভোগ

প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত পরিবারের প্রসূতি মায়েদের নিরাপদ মাতৃত্ব ও চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসাস্থল চুয়াডাঙ্গা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র| অস্ত্রোপচারের চেয়ে স্বাভাবিক প্রসব বা নরমাল ডেলিভারিতে হাসপাতালটির সাফল্য অত্যন্ত ঈর্ষš^ীয় হলেও বর্তমানে তীব্র অবকাঠামোগত ও প্রশাসনিক সংকটে ধুঁকছে এই সেবামূলক প্রতিষ্ঠানটি| দীর্ঘ দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে জরুরি অ্যা¤^ুলেন্স সেবা, বন্ধ রয়েছে সরকারি ওষুধ সরবরাহ, সেই সাথে যোগ হয়েছে তীব্র জনবল সংকট ও নিরাপত্তাহীনতা| ফলে একদিকে যেমন চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চরম ঝুঁকি ও ভোগান্তির মধ্যদিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন, অন্যদিকে দূর-দূরান্ত থেকে আসা প্রসূতি ও তাদের ¯^জনেরা পড়ছেন চরম বিপাকে|

হাসপাতালটির চিকিৎসা সেবার মান এবং প্রসূতিদের আস্থার চিত্র ফুটে ওঠে এখানকার প্রসব সংক্রান্ত পরিসংখ্যান থেকে| সিজারিয়ান বা অস্ত্রোপচারের প্রবণতা কমিয়ে নরমাল ডেলিভারিকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে এই কেন্দ্রটি প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে| সরাসরি মাঠপর্যায়ের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে চুয়াডাঙ্গা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার সামসুন নাহার শম্পা বলেন, ‘আমাদের চুয়াডাঙ্গা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে ২০২৬ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে ১৯ মে পর্যন্ত মোট ৫৭টি ডেলিভারি হয়েছে| তারমধ্যে ৪৭টা নরমাল ডেলিভারি এবং ১০টি সিজারিয়ান ডেলিভারি| পরবর্তী দিনগুলোতে আরও কিছু রোগীর ডেলিভারি হবে বলে আশা করা যাচ্ছে| আরও কিছু রোগী আছেন, যাদের সম্ভাব্য ডেলিভারির তারিখ আছে|’

বিগত বছরের সাফল্যের ধারাবাহিকতা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসে¤^রের ৩১ তারিখ পর্যন্ত মোট ২৩৪টা ডেলিভারি হয়েছিল| তারমধ্যে ২২০টা নরমাল ডেলিভারি এবং ১৪টা সিজারিয়ান ডেলিভারি ছিল|’ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেখানে বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সিজারিয়ানের হিড়িক পড়ে, সেখানে এই সরকারি কেন্দ্রে নরমাল ডেলিভারির এই উচ্চ হার অত্যন্ত ইতিবাচক ও অনুকরণীয়|

একটি চিকিৎসা কেন্দ্রের জন্য অ্যা¤^ুলেন্স অত্যন্ত জরুরি এবং লাইফ-সেভিং অনুষঙ্গ হলেও এই হাসপাতালে তা কেবলই শোভাবর্ধনকারী জড়বস্তু হয়ে পড়ে আছে| তিন দশক পুরনো গাড়িটির যান্ত্রিক ত্রুটির পাশাপাশি সরকারি বাজেট সংকটের কারণে বন্ধ রয়েছে এর চাকা| এই অচলাবস্থার নেপথ্য কারণ ব্যাখ্যা করে মেডিকেল অফিসার সামসুন নাহার শম্পা বলেন, ‘আমাদের অ্যা¤^ুলেন্সটি দীর্ঘদিনের পুরোনো| এটি ১৯৯৫ সালের দিকে ক্রয় করার ফলে এর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ত্রুটিপূর্ণ থাকায় ও জ্বালানির বাজেট না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে| কোনো বাজেট বরাদ্দ করা হয়নি| দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট ফুয়েল পাম্প থেকে বকেয়ার মাধ্যমে জ্বালানি ক্রয় করা হতো| সেখানে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৩১ টাকা বকেয়া আছে| দীর্ঘদিন সেই বকেয়া পরিশোধ না করার ফলে ফুয়েল মালিক আমাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিবেন বলেও হুঁশিয়ারি করেন| ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি জানানো হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি| যার কারণে আমাদের অ্যা¤^ুলেন্সটি পুরোপুরি প্রায় ২ বছর ধরে বন্ধ আছে|’

একই সুরে অ্যা¤^ুলেন্সটির চালক মুজিবুর রহমানও দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও বাস্তবতা তুলে ধরেন| তিনি বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রর অ্যা¤^ুলেন্সটি প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ| এই অ্যা¤^ুলেন্সটি অনেক পুরোনো হওয়ায় অনেক যন্ত্রাংশ পাওয়া যায় না এবং অ্যা¤^ুলেন্সের জ্বালানি বরাদ্দ গত দুই বছর ধরে দেয়া বন্ধ থাকায় অ্যা¤^ুলেন্স সেবাও বন্ধ|’

শুধুমাত্র চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবই নয়, হাসপাতালটি বর্তমানে তীব্র জনবল সংকটে আক্রান্ত, যা এর ˆদনন্দিন চিকিৎসাসেবা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলাকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে| পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় এটি এখন এক অরক্ষিত দুর্গে পরিণত হয়েছে| মেডিকেল অফিসার সামসুন নাহার শম্পা প্রাতিষ্ঠানিক এই অসহায়ত্বের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমাদের এখানে কোনো নিরাপত্তাকর্মী, আয়া ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী নেই| যার ফলে আমরা নিরাপত্তাহীনতার শিখকার হচ্ছি| প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আমাদের স্টোররুম থেকে চুরি হচ্ছে| আমাদের নিজেদের প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে পরিষ্কার করতে হয়| প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহও বন্ধ| প্রয়োজনীয় ভিজিটরও নেই| এখানে ৪ জন ভিজিটর থাকলে সবচেয়ে ভালো হতো| তবে বর্তমানে এখানে ২ জন আছেন এবং দুজনই সংযুক্তিতে কর্মরত| মূল পদ এখানে একটি, কিন্তু সেই পদে বর্তমানে কেউ নেই| এই দুইজন ইউনিয়ন পর্যায়ে কর্মরত ছিলেন, পরে তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে এখানে সংযুক্ত করা হয়েছে| ফলে দুজন ভিজিটরকে প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা ডিউটি করতে হয়| অ্যা¤^ুলেন্স চালকেরও আগামী ১৪ জুন চাকরিজীবন শেষ হবে|’

সিজারিয়ান ডেলিভারির ক্ষেত্রে অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার জন্য একজন মেডিকেল অফিসার আছেন, কিন্তু তিনিও সংযুক্তিতে কর্মরত| তাঁর প্রধান দায়িত্ব সদর উপজেলায়| এছাড়া এখানে ফিমেল মেডিকেল অ্যাটেনডেন্ট ও সহকারী নার্সিং অ্যাটেনডেন্টের পদও শূন্য রয়েছে| সরকারি এই মাতৃসদনে যেখানে বিনামূল্যে শতভাগ সেবা ও ওষুধ পাওয়ার কথা, সেখানে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো| জরুরি মুহূর্তে অ্যা¤^ুলেন্স না পেয়ে এবং হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ সরবরাহ না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ ও হতাশ ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ|

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক প্রসূতির মা বন্ধনা রানী ঘোষ যাতায়াতের করুণ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমরা জানি এই ক্লিনিকে একটি অ্যা¤^ুলেন্স আছে, তবে সেটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ| আমরা হাসাপাতালে আসছি ভ্যানে করে, সময়মতো ভ্যান পাওয়া যায় না, ফলে আমরা অনেক ভোগান্তির শিকার হচ্ছি| হাসপাতালের অ্যা¤^ুলেন্সটি যদি ঠিক থাকতো, তবে আমাদের রোগীদের জন্য খুবই সুবিধা হবে|’

একই হাসপাতালে ভর্তি থাকা প্রসূতি শামিমা আক্তারের মা আমেনা আক্তার হাসপাতালের সেবার প্রশংসা করলেও ওষুধ ও অ্যা¤^ুলেন্স সংকটের তীব্র সমালোচনা করেন| তিনি বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গার এই মাতৃসদন হাসপাতালটির সুযোগ-সুবিধা খুবই ভালো| কিন্তু এখানের যে অ্যা¤^ুলেন্সটি আছে, সেটি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট হয়ে আছে, ফলে আমরা সাধারণ মানুষ অ্যা¤^ুলেন্সের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি| এছাড়াও এখানে বিনামূল্যে কোনো ওষুধও পাচ্ছি না আমরা, বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে|’

চুয়াডাঙ্গার সাধারণ ও অসহায় মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এবং প্রসূতি মায়েদের ভোগান্তি লাঘবে ¯^াস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে ওষুধ সরবরাহ বৃদ্ধি, অ্যাম্বুলেন্সের জ্বালানি ও যন্ত্রাংশের বাজেট বরাদ্দ এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন- এটাই এখন চুয়াডাঙ্গাবাসীর দাবি|




কমেন্ট বক্স