জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহিদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই মামলার ৩০ আসামির মধ্যে ৩ জন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্য ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুজন আসামি হলেন- পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। তারা দুজনেই গ্রেপ্তার আছেন। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল বৃহস্পতিবার এই রায় ঘোষণা করেন। এই ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন- বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদসহ এ মামলার আসামি মোট ৩০ জন। এর মধ্যে ৬ জন গ্রেপ্তার আছেন। তারা হলেন- বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সাবেক চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী মো. আনোয়ার পারভেজ, পুলিশের সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন, সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় এবং নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ।
তাদের ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদসহ এ মামলার ২৪ আসামি পলাতক। পলাতক আসামির মধ্যে রয়েছেন: রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মো.মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মন্ডল, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার মো. হাফিজুর রহমান, সাবেক সেকশন অফিসার মো. মনিরুজ্জামান পলাশ, বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মন্ডল, সাবেক এমএলএসএস এ কে এম আমির হোসেন, সাবেক নিরাপত্তা প্রহরী নুর আলম মিয়া এবং সাবেক অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. মাহাবুবার রহমান। রংপুর মহানগর পুলিশের (আরপিএমপি) সাবেক কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান, আরপিএমপির সাবেক উপকমিশনার মো. আবু মারুফ হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. শাহ নূর আলম পাটোয়ারী, সাবেক সহকারী কমিশনার মো. আরিফুজ্জামান, সাবেক পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ও সাবেক এসআই (নিরস্ত্র) বিভূতিভূষণ রায়ও পলাতক। আবু সাঈদ হত্যা মামলার আসামি চিকিৎসক মো. সরোয়ার হোসেনও (চন্দন) পলাতক।
এছাড়া রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়া, বিশ্ববিদ্যালয়টির সাধারণ সম্পাদক মো. মাহাফুজুর রহমান, সহসভাপতি মো. ফজলে রাব্বি, সহসভাপতি মো. আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার, দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেন ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মাসুদুল হাসান এ মামলার পলাতক আসামি। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তাকে হত্যার ভিডিও সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি করে। ভিডিওতে দেখা যায়, আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন আর পুলিশ তার বুকে একের পর এক গুলি করছে। এ হত্যাকাণ্ড আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং সারা দেশে ক্ষোভছড়িয়ে পড়ে। মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় গত বছরের ২৪ জুন ৩০ জনকে আসামি করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। পরে ৬ আগস্ট আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল।
২৭ আগস্ট সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। পরদিন আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন এ মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। যুক্তিতর্ক শেষ হয় গত ২৭ জানুয়ারি। পূর্ণাঙ্গ রায় পর্যালোচনা করে আপিলের সিদ্ধান্ত নেবে প্রসিকিউশন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হওয়ার পর সেটি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করা হবে কি না। বৃহস্পতিবার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুইজনকে মৃত্যুদণ্ড ও তিনজনকে যাবজ্জীবন এবং বাকি ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়ে ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার পর সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
রায় ঘোষণার পর ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমি প্রথমেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই এনটিভির সেই সাংবাদিকের (মঈনুল হক) প্রতি। তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার ক্যামেরাম্যানসহ এই ভিডিও ধারণ করার কারণেই এই নির্মম হত্যাকাণ্ডটি সারা দুনিয়ার মানুষ দেখতে পেয়েছিল।’ এসময় তিনি গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকার জন্য অন্যান্য সংবাদকর্মীদেরও প্রশংসা করেন। রায় নিয়ে প্রসিকিউশন সন্তুষ্ট কি না-সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘রায়ে দুজনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, তিনজনের যাবজ্জীবন হয়েছে। আমাদের যে ধরনের চার্জ ছিল তাদের ভূমিকা অনুযায়ী সেই সাজাগুলো হয়েছে বলে মনে হয়।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘তারপরও আমরা পূর্ণাঙ্গ জাজমেন্ট পাওয়ার পরে সেটা পর্যালোচনা করব। যদি আম আমাদের কাছে মনে হয় যে, যেসব চার্জ থেকে তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ থাকলে পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পাওয়া সাপেক্ষে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’
বিচারের সফলতা তুলে ধরে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, বলেন, ‘আমরা সন্তুষ্ট বলতে আমরা তো ৩০ জনকে আসামি করেছিলাম। ৩০ জনকেই দণ্ডিত করা হয়েছে। কেউ কিন্তু এ মামলায় খালাস পায়নি। কোয়ান্টাম অব সেন্টেন্স (সাজা) হয়তো কোনোটা কম কোনোটা বেশি মনে হতে পারে, সেটি বিচার্য বিষয়। আমাদের ট্রাইব্যুনালের মান-নীয় বিচারপতিগণ তারা সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে হয়তো সেই সেন্টেন্সটা দিয়েছেন।’ এক প্রশ্নের জবাবে প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটির জায়গা থেকে আগেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল, পুলিশের আইজিপির কিন্তু আরেকটি মামলায় শাস্তি হয়েছে। এই কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি কিন্তু সারা বাংলাদেশের সব ক্ষেত্রেই কাজ করেছে। সেকেন্ডলি হচ্ছে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ঘটনাটা ঘটেছে, সেখানে যারা সুপিরিয়র অফিসার ছিলেন তাদেরকেও কিন্তু এই মামলায় দণ্ডিত করা হয়েছে অতএব আমরা কোনোটাই কোনো চার্জই প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছি বলে মনে করি না।’
রায় শুনে আবু সাঈদের মা বললেন, ‘আত্মা ঠান্ডা হয় নাই’ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারেনি তার পরিবার। রায় ঘোষণার পর এক প্রতিক্রিয়ায় আবু সাঈদের বাবা আবুল হোসেন ও মা মনোয়ারা বেগম সাংবাদিকদের কাছে এ অসন্তোষের কথা জানান। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার দায়ে পুলিশের সাবেক দুই সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। তারা হলেন সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। রায়ে মামলার ২৮ জন আসামির মধ্যে ৩ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার পর রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর জাফরপাড়া গ্রামে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথ্য বলেন আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন, মা মনোয়ারা বেগম ও চাচাতো ভাই রুহুল আমিন। মকবুল হোসেন বলেন, ‘দুইজনকে ফাঁসি দিয়েছে, তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিছে। আরও লোকের ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল। এই রায়ে আমি সন্তুষ্ট হতে পারলাম না। অনেক আসামি তো ছাড়া পায়া গেছে, যারা অপরাধী। কড়াভাবে সাজা দেওয়া উচিত ছিল।'’
আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা খুশি নই। আমরা যদি আরও বেশি করে সাজা, বেশি করে অনেক আসামিক ফাঁসি দিলে তেন আমরা খুশি হনু (হতাম)। তা ছাড়া আমরা খুশি নই। আসামি ছাড়া গেছে, আসামির ফাঁসি হয় নাই, সেই জন্য আমরা বেজার (অসন্তুষ্ট)। এখন আমার অন্তর ভালো হয় নাই, আত্মা ঠান্ডা হয় নাই।’ আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী এই মামলার বাদী। তিনিসহ তার ছোট ভাই আবু হোসেন রায় ঘোষণার সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ছিলেন। পরিবারের পক্ষে পীরগঞ্জে নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন হত্যা মামলার সাক্ষী ও চাচাতো ভাই ওমর ফারুক। ওমর ফারুক বলেন, ‘আমরা আশা করছি, এই রায়ের যদি আরও অন্য কিছু করা যায়, আপিল করা যায়, করে যদি সাজা বাড়ানো যায়, তাহলে অন্তত পরিবার থেকে সবাই খুশি থাকবে। আমরা আসলে এই দুইজন আসামিকে মাত্র মৃত্যুদণ্ড দিল, এটা আশা করিনি। আবার অনেক আসামি পলাতক, তাদের ধরারও কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেই।’
সমীকরণ প্রতিবেদন