দিন যত গড়াচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর তত বাড়ছে। বিশেষ করে রফতানি বাণিজ্যে বেশ বড় রকমের ধাক্কা লেগেছে ইরান যুদ্ধের। যুদ্ধের কারণে শুধু মধ্যপ্রাচ্যেরই বিভিন্ন দেশে ৮ কোটি ডলারের পণ্যের বাজার রীতিমতো থমকে আছে। কারণ এই অঞ্চলে রফতানি প্রায় বন্ধের উপক্রম হয়েছে। এ ছাড়া ইউরোপ-আমেরিকার বাজারের অনেক বড় বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশ থেকে পণ্যের ক্রয়াদেশ বাতিল করে দিচ্ছে। জরুরিভিত্তিতে বিমানে করে পণ্য রফতানিও করা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে যুদ্ধের প্রভাবে দেশের রফতানি বাণিজ্য চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে দেশের শিল্প কারখানাগুলোতে জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ায় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হতে শুরু করেছে। শিল্প এলাকাতে লোডশেডিংও দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে ঘরে-বাইরে চাপে পড়েছে রফতানি খাত। শিল্প মালিকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে দিনকে দিন পরিস্থিতি এমন জটিল হচ্ছে-ব্যবসা পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সময়ের আলোকে বলেন, ‘শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের বিষয়টি অতটা গুরুত্ব না দিলেও এখন আমরা চিন্তায় পড়ে গেছি। দুই সপ্তাহ হতে চলল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। ইতিমধ্যেই এই যুদ্ধের প্রভাব বেশ ভালোভাবেই টের পাচ্ছি আমরা। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পোশাকসহ সব ধরনের পণ্য রফতানি প্রায় থমকে গেছে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো- যুদ্ধের কারণে ইউরোপ-আমেরিকার অনেক প্রতিষ্ঠান রফতানি আদেশ বাতিল করছে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন করে রফতানি আদেশ দেওয়াও স্থগিত রাখছে। তারা মনে করছেন এই যুদ্ধকালে হয়তো আমরা সময়মতো তাদের কাছে পণ্য পাঠাতে পারব না। তারা ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না। বাংলাদেশের বাজার ছেড়ে ওই ক্রেতারা ভিন্ন কোনো দেশ থেকে পোশাক ক্রয়ের আদেশ দিচ্ছে। এটা নিয়ে আমরা চিন্তিত। কারণ এক ক্রেতা একবার অন্য বাজারে চলে গেলে তাকে আবার বাংলাদেশের বাজারে ফিরিয়ে আনা কঠিন।
মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, ‘গত সপ্তাহে ইউরোপের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকে আমাকে মেইল দেওয়া হয়েছে। মেইলে তারা উল্লেখ করেছেন পূর্বেকার দেওয়া আড়াই মিলিয়ন ডলারের রফতানি আদেশ তারা স্থগিত করেছেন। আপাতত এই পণ্য তারা নেবেন না। আমার মতো এ রকম আরও অনেক রফতানিকারকের কাছে চিঠি দেওয়া হচ্ছে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে। সুতরাং, ইরান যুদ্ধ যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তা হলে দেশের রফতানি বাণিজ্য থমকে যাবে।’ অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব ইতিমধ্যে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার মতো প্রধান রফতানি গন্তব্যে পড়তে শুরু করেছে, বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। রফতানিকারকদের আশঙ্কা, এসব দেশে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে ভোক্তারা তৈরি পোশাকের মতো নিত্যপণ্য নয়, এমন পণ্যের পেছনে কম ব্যয় করবেন। এতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। রফতানিকারকদের ভাষ্য, ইউরোপের কিছু ক্রেতা ইতিমধ্যে তাদের ক্রয়াদেশের পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন, আবার কেউ কেউ অর্ডার বাতিলও করেছেন। শুধু যে তৈরি পোশাক পণ্যের রফতানি আদেশ বাতিল হচ্ছে তা নয়, পাটপণ্যসহ অন্যান্য পণ্যেরও রফতানি আদেশ বাতিল হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে থমকে আছে রফতানি : রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবে, গত বছর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ থেকে রফতানি হয়েছে ৮ কোটি ডলারের পণ্য। যুদ্ধে হুরমুজ প্রণালি বন্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের ফ্লাইট বন্ধ থাকায় এই বিশাল অঙ্কের পণ্য রফতনি এখন প্রায় থমকে আছে। যুদ্ধের কারণে আমদানি-রফতানিতে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে সিঙ্গাপুর কলম্বোসহ ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরগুলোতে বাড়বে কনটেইনার জট, পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ। বাংলাদেশি সবজি ও ফলমূলের বড় বাজার মধ্যপ্রাচ্য, যা মোট সবজি রফতানির প্রায় ৬০ শতাংশ। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বছরে কয়েক কোটি ডলারের সবজি রফতানি হয়। ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের জেরে অধিকাংশ এয়ারলাইন্স তাদের মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইট স্থগিত করায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন রফতানিকারকরা। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তাদের আকাশসীমা বন্ধ রাখায় এক দিনেই ঢাকা ও চট্টগ্রাম মিলিয়ে ৮০ টন সবজি রফতানি সম্ভব হয়নি। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন রফতানিকারকরা।
সবজি ও ফলমূল রফতানিকারক সমিতির সভাপতি মো. মাহবুব রানা বলেন, ‘যে পণ্যগুলো উঠবে এবং যাবে, সেগুলো কাল রফতানি করা যায়নি। হঠাৎ ফ্লাইটগুলো স্থগিত হয়েছে। সে কারণে আমরা অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত। আমাদের পুরো আড়াই লাখ ডলারের পণ্য আটকে গেছে।’ মধ্যপ্রোচ্যের যুদ্ধে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন পোশাক রফতানিকারকরা। আকাশ পথের পাশাপাশি সমুদ্রপথে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট ‘হুরমুজ প্রণালি’ বন্ধের ফলে শুধু জ্বালানি সরবরাহ নয়, পণ্য রফতানিও বিঘ্নিত হচ্ছে। রফতানিকারকরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সার্বিকভাবে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে, এতে রফতানি খাত প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে।
শিপিং এজেন্টরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে হুরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে গালফ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যগামী কনেটেইনার জট তৈরি হবে। এতে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, বাড়বে পণ্য পরিবহন খরচ।
এম এস সি শিপিংয়ের হেড অব অপারেশন্স অ্যান্ড লজিস্টিক আজমীর হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘যদি পুরো রুটটিই অ্যাফেক্টেড হয়, তা হলে আমাদের এই সাপ্লাই চেইনে একটা বড় ধরনের অ্যাফেক্ট তো হবেই। সেসঙ্গে আমাদের কনটেইনারগুলোর ভালো একটা ভলিউম মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যাচ্ছে। সেই কনটেইনারগুলোর মুভমেন্টও কিন্তু অ্যাফেক্টেড হবে।’
ইপিবির তথ্য অনুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশ সবজি, তৈরি পোশাকসহ প্রায় আট কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। এ ছাড়া ইরানে রফতানি করেছে ৫ লাখ ৩৯ হাজার ডলারের পণ্য। অন্যদিকে রফতানিকারকরা আশা করেছিলেন, ২০২৫ সাল কঠিন গেলেও জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের ফলে বিনিয়োগ ও রফতানির জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হবে। ইরান যুদ্ধের কারণে এখন সে আশাও তাদের পূরণ হচ্ছে না। ঘুরে দাঁড়ানোর আশাতে তাদের ফের হোঁচট খেতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘একটার পর একটা সংকট লেগেই আছে। গত কয়েক বছর দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে রফতানি বাণিজ্য চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শুধু গত দুই বছরেই তিন শতাধিক গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলাম যে, জাতীয় নির্বাচন হওয়ার পর একটি গণতান্ত্রিক সরকার আসবে দেশে। ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বাভাবিক গতি আসবে। ভালো মতো নির্বাচনটা হয়ে গেছে, নির্বাচিত সরকারও এসেছে দেশে। আমরাও আশা নিয়ে যখনই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, ঠিক তখনই শুরু হলো ইরান যুদ্ধ। এই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যেই বেশ ভালোভাবেই পড়তে শুরু করেছে। যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয় তা হলে আমাদের আরও গভীর সংকটে পড়তে হবে। বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তাই যুদ্ধ চলতে থাকলে অর্ডার আরও কমে যেতে পারে। কারণ আমরা যতটা খবর পাচ্ছি-ইতিমধ্যেই অনেক রফতানিকারকের রফতানি আদেশ বাতিল হচ্ছে।
জ্বালানির প্রভাব শিল্পের উৎপাদনে : জ্বালানি সংকটে ইতিমধ্যেই কারখানা পর্যায়েও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের মধ্যে ডিজেলের অভাবে কারখানায় জেনারেটর চালু রাখা যাচ্ছে না। এ কারণে কোনো কোনো এলাকায় দিনে গড়ে ৩ ঘণ্টার মতো উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। প্রতি ঈদের লম্বা ছুটির আগে এই দিনগুলোতে পোশাক কারখানায় সাধারণত রাত-দিন উৎপাদন-যজ্ঞ চলে।
রফতানিকারক উদ্যোক্তারা বলছেন, পরিস্থিতি দিনকে দিন বাজে আকার নিচ্ছে। কারখানায় উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার মতো ডিজেলে অগ্রাধিকারের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বাস্তবে পেট্রোল পাম্পগুলো সরকারের এই নির্দেশনা মানছে না। জ্বালানির ব্যবহারে শিল্প উৎপাদনের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার জন্য সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন উদ্যোক্তারা।
সমীকরণ প্রতিবেদন