দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক ভয়াবহ মোড় নিয়েছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘ দিনের উত্তেজনা। প্রতিবেশী দুই দেশের সীমান্তসঙ্ঘাত এখন রূপ নিয়েছে পূর্ণাঙ্গ আকাশপথের যুদ্ধে। গতকাল শুক্রবার ভোররাতে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশগুলোতে পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর (পিএএফ) ইতিহাসের বৃহত্তম বিমান হামলা এবং এর প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান সরকারের ‘সরাসরি যুদ্ধ’ (ওপেন ওয়ার) ঘোষণার মাধ্যমে পরিস্থিতি এক চরম অস্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। শুক্রবার ভোর পৌনে ৪টায় পাকিস্তান সশস্ত্রবাহিনী আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন গজব-লিল হক’ শুরু করে। পাকিস্তান ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস (আইএসপিআর)-এর মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, এই অভিযানে এখন পর্যন্ত আফগান তালেবান ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর ২৭৪ জন সদস্য নিহত এবং ৪০০-এর বেশি আহত হয়েছেন। অভিযানের সাফল্যের বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, পাকিস্তানি বাহিনী তালেবানের ৭৩টি সামরিক পোস্ট ধ্বংস করেছে এবং ১৮টি এলাকা নিজেদের দখলে নিয়েছে। এ ছাড়া আফগান বাহিনীর ১১৫টি ট্যাংক, সাঁজোয়া যান (এপিসি) এবং আর্টিলারি অস্ত্র গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আত্তাউল্লাহ তারার এই হামলাকে ‘আফগান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত জবাব’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
হামলার সূত্রপাত: এই ভয়াবহ সঙ্ঘাতের সূত্রপাত ঘটে গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে। পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া সংলগ্ন ডুরান্ড লাইন সীমান্তে আফগান সেনাবাহিনী অতর্কিত হামলা চালায়। পাকিস্তানের গণমাধ্যম ‘দ্য ডন’-এর তথ্যমতে, এই হামলায় অন্তত ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হন এবং বেশ কয়েকজনকে বন্দী করে নিয়ে যায় আফগান বাহিনী। আফগান তালেবানের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ এই হামলার দায় স্বীকার করে জানান, এটি ছিল গত ২১ ফেব্রুয়ারি নানগারহার ও পাকতিয়ায় পাকিস্তানি বিমান হামলার পাল্টা প্রতিশোধ। ওই হামলায় ৮০ জনের বেশি আফগান নাগরিক নিহত হয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার রাতের আফগান বাহিনীর এই অপারেশন শেষে রাত ১২টায় তারা ফিরে গেলেও, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় পাকিস্তান পুরো শক্তিতে আফগানিস্তানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
কাবুল ও কান্দাহারে আতঙ্কের রাত: শুক্রবার ভোর ১টা ৫০ মিনিটের দিকে কাবুলের আকাশ কাঁপিয়ে গর্জে ওঠে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান। এএফপির সংবাদদাতারা জানিয়েছেন, রাজধানী কাবুলের বাসিন্দারা দফায় দফায় শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দে জেগে ওঠেন। ভোর আড়াইটা পর্যন্ত কাবুলের কেন্দ্রে ব্যাপক গুলির শব্দ শোনা যায়। কাবুল ছাড়াও পাকতিকা ও কান্দাহারের প্রতিরক্ষা ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে নির্ভুল নিশানায় বোমা বর্ষণ করে পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ কড়া বার্তা দিয়ে বলেছেন, ‘যেকোনো আক্রমণাত্মক উদ্দেশ্য নস্যাৎ করতে আমাদের বাহিনী পূর্ণ সক্ষম’।
সর্বোচ্চ নেতা আখুন্দজাদা নিহতের গুঞ্জন:
এই যুদ্ধের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর খবরটি আসে ওসিন্ট ইউরোপের মাধ্যমে। শুক্রবার ভোর ৬টা ৩ মিনিটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তারা দাবি করে, কাবুলে তালেবান সদর দফতর লক্ষ্য করে চালানো পাকিস্তানি বিমান হামলায় আফগানিস্তানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা এবং বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় কমান্ডার নিহত হয়েছেন। যদিও তালেবান সরকারের পক্ষ থেকে এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত বা অস্বীকার কোনোটিই করা হয়নি। অন্য দিকে তালেবান দাবি করেছে তাদের কোনো ক্ষতি হয়নি; বরং পাকিস্তানের হামলায় কোনো হতাহত নেই। প্রতিক্রিয়া ও নিন্দা: সাবেক আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘আফগানরা ঐক্যের মাধ্যমে নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষা করবে এবং আগ্রাসনের কঠোর জবাব দেবে’। পাকিস্তানের সিনেট থেকেও একটি প্রস্তাব পাস করা হয়েছে, যেখানে আফগান তালেবানকে অবিলম্বে সবধরনের ‘শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড’ বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তানের সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো তালেবানের জন্য হবে আত্মঘাতী। পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান সামরিক শক্তিতে বিশ্বের শীর্ষ ১৫টি দেশের একটি। অন্য দিকে তালেবান বাহিনীর সক্ষমতা মূলত পরিত্যক্ত বিদেশী অস্ত্র ও কালোবাজারের ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া দেশটি বর্তমানে তীব্র অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে তালেবানের সামরিক মুখপাত্রের কণ্ঠে সতর্কবার্তা শোনা গেছে, ‘হামলা হলে আমরা পাল্টা জবাব দেবো, তবে এই মুহূর্তে আমরা সরাসরি সংঘর্ষ বাড়াতে চাই না।’
উত্তেজনা হ্রাসে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা: সীমান্তে চলমান এই সঙ্ঘাত নিরসনে বিশ্বশক্তিগুলো নড়েচড়ে বসেছে। বিশেষ করে চীন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং জানিয়েছেন, বেইজিং উভয় দেশের সাথে কূটনৈতিক যোগাযোগ রাখছে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে প্রস্তুত। এ দিকে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সাথে টেলিফোনে কথা বলেছেন। বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থানরত ইসহাক দারের সাথে উত্তেজনা হ্রাসের উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। কাতার ও তুরস্ক, যারা এর আগে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি করিয়েছিল, তারাও পর্দার আড়ালে তৎপরতা শুরু করেছে বলে জানা গেছে। উল্লেখ্য, গত বছরের অক্টোবর থেকে দোহা চুক্তির মাধ্যমে যে সাময়িক শান্তি বজায় ছিল, তা এখন পুরোপুরি বিলুপ্ত। পাকিস্তানের দাবি, আফগানিস্তান টিটিপির মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মদদ দিচ্ছে। অন্য দিকে আফগানিস্তান এই অভিযোগ অস্বীকার করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই আইএসআইএল যোদ্ধাদের প্রশ্রয় দেয়ার পাল্টা অভিযোগ তুলেছে। বর্তমানে সীমান্ত এবং উভয় দেশের রাজধানীগুলোতে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কাবুলের পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত মনে হলেও আগ্নেয়গিরির মতো যেকোনো সময় ফের বিস্ফোরিত হতে পারে এই সঙ্ঘাত। পাকিস্তানের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং তালেবানের ‘আগ্রাসন রুখে দেয়ার’ অঙ্গীকারের মধ্যে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ নাগরিকরা। এই রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে কোথায় নিয়ে ঠেকায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
সমীকরণ প্রতিবেদন