ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মধ্যদিয়ে ফের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ঘটেছে বাংলাদেশ। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেয় সরকার। এরই মধ্যে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় চীন ভারতও নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। এই দুই দেশ বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিবেশী ও গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার। আর এই দুই দেশ পরস্পর নানা ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বীও। বাংলাদেশেও এই দুই দেশ নিজেদের প্রভাব বাড়াতে মরিয়া। ভারত যেমন চায় বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও আর্থ সামাজিক ক্ষেত্রে তার প্রভাব তৈরি করে রাখতে, চীনেরও লক্ষ্য তা-ই এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক দ্বন্দ্বও আছে। তাই দেশ দুটি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ঘনিষ্ঠ হতে নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বড় কোনো রাজনৈতিক টানপোড়েন না থাকলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে চীনের প্রভাব ঠেকাতে চায়। এ নিয়ে দেশটির রাষ্ট্রদূত প্রকাশ্যেই কথা বলেছেন। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। দুই দেশের সম্পর্কও বহুমাত্রিক। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। বিশেষ করে ভারতীয় দিক থেকে অবিরত বাংলাদেশ বিরোধী কার্মকাণ্ড চলতে থাকে। যাতে তিক্ততা চরম রূপ নেয়। ইতিহাসে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক এত বৈরী রূপ আগে নেয়নি।
তবে নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের অবস্থান বদল করেছে ভারত। দেশটি নবনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে চাইছে। বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হচ্ছে। গত জানুয়ারিতে বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসান খালেদা জিয়ার জানাজায় উপস্থিত ছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। যা দেশটির পক্ষ থেকে সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত বলে মনে করা হয়েছিল। পরে বিএনপি নির্বাচনে বিজয়ী হলে তারেক রহমানকে শুভেচ্ছ জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশটির লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। গতকাল রোববার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা। সেখানে তিনি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অভিন্ন স্বার্থ ও পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
পরে সাংবাদিকদের ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, বৈঠকটি মূলত সৌজন্য সাক্ষাৎ ও প্রাথমিক মতবিনিময় হলেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, ইতিবাচক ও ভবিষ্যৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গিতে জনগণকেন্দ্রিক সহযোগিতা জোরদার করতে চায় নয়াদিল্লি। প্রণয় ভার্মা আরও বলেন, নির্বাচনের পরপরই ১৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন বার্তা পাঠান এবং একই দিনে তাদের মধ্যে টেলিফোনে কথোপকথন হয়। এ ছাড়া ১৭ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার শপথ নেওয়ার সময় ভারতের লোকসভার স্পিকার ভারত সরকারের প্রতিনিধিত্ব করে ঢাকা সফর করেন। সফরকালে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীর একটি চিঠি হস্তান্তর করেন। প্রণয় ভার্মা বলেন, এসব উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগে বাংলাদেশ-ভারতের ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভিত্তিতে বহুমাত্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে।
এদিকে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায় চীন। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এ কথা বলেন। তিনি বলেন, চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে স্থাপিত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আমলে এ সম্পর্কের আরও উন্নয়ন হয়। তাই এখন আমরা নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছি। তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় চীন বাংলাদেশের পাশে আছে। আমি চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও ভালো বলে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত।’
সমীকরণ প্রতিবেদন