বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাজধানীর পূর্বাচলের ৩০০ ফিট এলাকায় জনসমুদ্রের সামনে মঞ্চে দাঁড়িয়ে সুদীর্ঘ ১৭ বছর পরে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করতে পারায় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে হাজার লক্ষ কোটি শুকরিয়া জ্ঞাপন করে বলেছেন, তার অসীম রহমতে আজ আমি আমার প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসতে পেরেছি, আপনাদের দোয়ায়, আপনাদের ভালোবাসায়। আজ আমরা যদি সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, তাহলে ইনশাআল্লাহ এই লক্ষ-কোটি মানুষের প্রত্যাশাগুলো আমরা পূরণ করতে পারব। একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। সময় এসেছে সবাই মিলে দেশ গড়ার। গতকাল বৃহস্পতিবার স্মরণকালের সর্ববৃহৎ এই গণসংবর্ধনায় লাখো মানুষের উচ্ছ¡াসের মধ্যে তারেক রহমান ৬২ বছর আগে শান্তি ও অধিকার আদায়ের বিশ্ববিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্কিন কিংবদন্তি মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের অমর বক্তৃতা ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’-এর রেশ ধরে জানান, মার্টিন লুথার কিংয়ের যেমন স্বপ্ন ছিল, তারও বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি পরিকল্পনা রয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, “ভাই-বোনেরা, মার্টিন লুথার কিংয়ের নাম শুনেছেন তো? মার্টিন লুথার কিংয়ের একটি বিখ্যাত ডায়লগ আছে ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম’। আজ এই বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আপনাদের সবার সামনে আমি বলতে চাই, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন সদস্য হিসেবে আপনাদের সামনে আমি বলতে চাই- ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি’ (দেশের মানুষের জন্য, দেশের জন্য আমার একটি পরিকল্পনা আছে)। আজ এই পরিকল্পনা দেশের মানুষের স্বার্থে, দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য। যদি সেই প্ল্যান, সেই কার্যক্রম, সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে হয় প্রিয় ভাই-বোনেরা, এই জনসমুদ্রে যত মানুষ উপস্থিত আছেন এবং সারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পক্ষে যত মানুষ আছেন, প্রত্যেকটি মানুষের সহযোগিতা আমার লাগবে। প্রত্যেকটি মানুষের সহযোগিতা আমাদের লাগবে। আপনারা যদি আমাদের পাশে থাকেন, আপনারা যদি আমাদেরকে সহযোগিতা করেন, ইনশাআল্লাহ আমরা ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হব। আসুন, আমরা সবাই একসঙ্গে এগিয়ে আসি। চলুন, আমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে হাত তুলে প্রার্থনা করি। হে রাব্বুল আলামিন, হে একমাত্র মালিক, হে একমাত্র পরওয়ারদিগার, হে একমাত্র রহমতদানকারী, হে একমাত্র সাহায্যকারী আপনি যদি আমাদের ওপর রহমত করেন, তাহলে আমরা এই দেশের মানুষের কাঙ্ক্ষিত অধিকার নিশ্চিত করতে পারব।”
তারেক রহমান বক্তব্য শেষ করার পর যখন শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি অনুষ্ঠান সমাপ্ত করার ঘোষণা দিচ্ছিলেন, তখন আবারও মাইকের সামনে এসে তিনি বলেন, ‘মনে রাখবেন, উই হ্যাভ আ প্ল্যান। উই হ্যাভ আ প্ল্যান ফর দ্য পিপল, ফর দ্য কান্ট্রি। ইনশাআল্লাহ, আমরা সেই প্ল্যান বাস্তবায়ন করব।’ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘আজ যদি আল্লাহর রহমত এই দেশ ও এই দেশের মানুষের পক্ষে থাকে, আল্লাহর সাহায্য ও দোয়া এই দেশের ওপর থাকে, ইনশাআল্লাহ আমরা আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হব।’ তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এলে মহানবি (স.)-এর ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে আমরা দেশ পরিচালনা করব। আমরা যেই ধর্মের মানুষ বা যে রাজনৈতিক দলের অনুসারী হই না কেন; যে কোনো মূল্যে দেশের শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে। যাতে মানুষ নিরাপদ থাকতে পারে। এই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা।’
তারেক রহমান তার অসুস্থ মায়ের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আপনারা জানেন এখান থেকে আমি আমার মা, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে যাচ্ছি। যে মানুষটি এই দেশের মাটি, এই দেশের মানুষকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছেন। তার সঙ্গে কী হয়েছে আপনারা প্রত্যক্ষভাবে সে সম্পর্কে অবগত। একজন সন্তান হিসেবে আপনাদের কাছে আমি অনুরোধ করব, আজ আল্লাহর দরবারে আপনারা তার জন্য দোয়া করবেন। আজ তিনি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন। কিন্তু যাদের জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন এই দেশের সেই মানুষগুলোর জন্যই তিনি আজীবন লড়াই করেছেন। আমি কোনোভাবেই চাই না, সেই মানুষগুলো অনিরাপদ থাকুক। সে জন্যই আজ হাসপাতালে যাওয়ার আগে, আপনাদের প্রতি এবং টেলিভিশনের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশে যারা আমাকে দেখছেন, আপনাদের সবার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য আজ আমি এখানে দাঁড়িয়েছি।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আসুন আমরা সবাই নিশ্চিত করি আমরা যে কোনো শ্রেণির মানুষ হই, আমরা যে কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হই, অথবা আমরা নির্দলীয় ব্যক্তি হই, যে কোনো মূল্যে আমরা এই দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখব। যে কোনো মূল্যে আমরা অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা রুখে দাঁড়াব। শিশু হোক, নারী হোক, পুরুষ হোক যে কোনো বয়স, যে কোনো শ্রেণি, যে কোনো পেশা, যে কোনো ধর্মের মানুষ সবাই যেন নিরাপদে থাকতে পারে। এই অধিকারই আমাদের চাওয়া। আজ এই চাওয়াই আমাদের অঙ্গীকার। আসুন, সামনে এগিয়ে যাই।’
গণসংবর্ধনা উপলক্ষ্যে সমবেত লাখ লাখ মানুষের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আজ বাংলাদেশের মানুষ কথা বলার অধিকার ফিরে পেতে চায়, তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পেতে চায়। বাংলাদেশের মানুষ চায় তারা মাথা উঁচু করে বাঁচতে। সবাই মিলে দেশ গড়তে হবে। এই দেশে যেমন পাহাড়ের মানুষ আছে, তেমনি সমতলের মানুষ আছে। এই দেশে মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করে। সবাই মিলে একসঙ্গে আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যে বাংলাদেশে একজন মা স্বপ্ন দেখতে পারেন। অর্থাৎ একটি নিরাপদ বাংলাদেশ। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন নারী, একজন পুরুষ, একজন শিশু যে-ই হোক না কেন, নিরাপদে ঘর থেকে বের হয়ে আবার নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারে, ইনশাআল্লাহ।’ তারেক রহমান বলেন, ‘এই দেশে অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী, ৪ কোটিরও বেশি তরুণ প্রজন্মের সদস্য, প্রায় ৫ কোটির মতো শিশু, ৪০ লাখের মতো প্রতিবন্ধী মানুষ রয়েছেন। প্রায় ১ কোটি কৃষক-শ্রমিক রয়েছেন। এই মানুষগুলোর রাষ্ট্রের কাছে একটি প্রত্যাশা আছে, একটি আকাঙ্ক্ষা আছে। আজ আমরা যদি সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, তাহলে ইনশাআল্লাহ এই লক্ষ-কোটি মানুষের সেই প্রত্যাশাগুলো আমরা পূরণ করতে পারি।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি একাত্তর সালে লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল। একইভাবে পঁচাত্তরে সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে আধিপত্যবাদীদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে নব্বইয়ে স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে এ দেশের জনগণ এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছিল। একাত্তর সালে এই দেশের মানুষ যেমন স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিল, তেমনি ২০২৪ সালেও এ দেশের ছাত্র-জনতা, সর্বস্তরের মানুষ, কৃষক-শ্রমিক, গ্রাম ও শহরের নারী-পুরুষ, মাদ্রাসা ছাত্রসহ দল-মতনির্বিশেষে, শ্রেণি-পেশানির্বিশেষে সব মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। সেদিন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা হয়েছিল। একাত্তর সালে আমাদের শহিদরা এমন একটি বাংলাদেশ গঠনের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। বিগত পনেরো বছরে হাজার হাজার মানুষ গুম ও খুনের শিকার হয়েছেন। শুধু রাজনৈতিক দলের সদস্যরাই নয়, নিরীহ সাধারণ মানুষও প্রতিবাদ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছে, জীবন দিয়েছে। ২০২৪ সালে আমরা সেই ভয়াবহ দিনগুলো নিজের চোখে দেখেছি। আমাদের তরুণ প্রজন্মের সদস্যরা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে। কয়েক দিন আগে এই বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলনের সাহসী প্রজন্মের এক সাহসী সদস্য ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে। ওসমান হাদি শহিদ হয়েছেন এই দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য ২০২৪-এর আন্দোলনে যারা শহিদ হয়েছেন, ওসমান হাদিসহ; একাত্তরে যারা শহিদ হয়েছেন; এবং বিগত স্বৈরাচারীর সময় বিভিন্নভাবে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের সবার আত্মত্যাগ আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। আমরা আমাদের সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলব, যেখানে সবাই মিলে কাজ করব।’
তারেক রহমান বলেন, ‘বিভিন্ন আধিপত্যবাদী শক্তি ও সুবিধাভোগীরা নানা ষড়যন্ত্রে এখনো লিপ্ত রয়েছে। আমাদের ধৈর্যশীল হতে হবে, আমাদের ধৈর্য ধারণ করতে হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের যে সদস্যরা এখানে আছেন, আপনারাই আগামীর দিনে দেশকে নেতৃত্ব দেবেন। এই দেশ গড়ে তোলার দায়িত্ব আপনাদের কাঁধেই। আমরা এই দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারি শক্ত গণতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর, শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর, যাতে বাংলাদেশ একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়।’ তিনি বলেন, ‘আজ আমার সঙ্গে এই মঞ্চে বহু জাতীয় নেতা ও নেতৃবৃন্দ উপস্থিত আছেন। মঞ্চে যারা আছেন, মঞ্চের বাইরে যারা আছেন, আমরা সবাই মিলে এই দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশিত সেই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। যে কোনো উসকানির মুখে আমাদের ধীর ও শান্ত থাকতে হবে। প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আমরা বাংলাদেশে শান্তি চাই, আমরা বাংলাদেশে শান্তি চাই, আমরা বাংলাদেশে শান্তি চাই।’
এর আগে বিমানবন্দর থেকে তিন ঘণ্টা জনস্রোত পেরিয়ে পূর্বাচলের ৩০০ ফিটে গণসংবর্ধনা মঞ্চে ওঠেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিকাল পৌনে ৪টার দিকে সমাবেশস্থলে পৌঁছান তিনি। এরপর বক্তব্য রাখেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তারেক রহমানের নাম ঘোষণা করেন বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন আহমদ। শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি ও সুলতান সালাহ উদ্দিন টুকু যৌথ সঞ্চালনা করেন। সংবর্ধনা মঞ্চে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সালাহউদ্দিন আহমদ ছাড়াও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, রুহুল কবির রিজভী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া দীর্ঘদিনের যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গীদের মধ্যে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি তানিয়া রব, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক, এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, এনপিপির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক নুরুল আমিন ব্যাপারীসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
সমীকরণ প্রতিবেদন