সোমবার, ১১ মে, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি
বিএনপি ছাড়া এক মঞ্চে সবাই, রাজনীতিতে বিকল্প পথের ছায়া-নকশা

তৃতীয় শক্তির উত্থান: পিআর পদ্ধতির পক্ষে বিরল ঐক্য

  • আপলোড তারিখঃ ৩০-০৬-২০২৫ ইং
তৃতীয় শক্তির উত্থান: পিআর পদ্ধতির পক্ষে বিরল ঐক্য

বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনীতিতে নানা সমীকরণ ও মৈত্রী গড়ে উঠছে। এরই মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং আলোচিত ঘটনা হয়ে উঠেছে, চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের (ইআবা) ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত মহাসমাবেশ। তবে এই বিশাল জমায়েতে অংশ নেননি বর্তমান রাজনীতির অন্যতম প্রধান বিরোধী শক্তি বিএনপি। মহাসমাবেশ থেকে একটি বাস্তবতা সামনে এসেছে- বিএনপি ছাড়া প্রায় সবাই এখন পিআর পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে একমঞ্চে। এমনকি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় পিআর পদ্ধতির পক্ষে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সমাবেশ ইসলামী দলগুলোর মধ্যে নতুন মোর্চা গঠনের প্রথম ধাপ হতে পারে। জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্বে ছোট দলগুলোর এই সমন্বয় বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার কৌশলও হতে পারে।


সোহরাওয়ার্দীতে ঐক্যের মহড়া:


ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অতীতে বহু রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সাক্ষী থেকেছে, তবে শনিবারের চিত্রটি ছিল ভিন্নমাত্রার। ইসলামী আন্দোলনের ডাকা এই মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই সারা দেশ থেকে নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ঢল নামে। দুপুর নাগাদ পুরো উদ্যান এবং তার আশপাশের এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। এই সমাবেশকে সাম্প্রতিককালের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক সমাবেশ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন অনেক বিশ্লেষক। কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বেশি মনোযোগ কেড়েছে মঞ্চে উপস্থিত রাজনৈতিক দলগুলোর বৈচিত্র্য। মঞ্চে যারা ছিলেন, তাদের তালিকাটিও ছিল চমকপ্রদ। ইসলামী আন্দোলনের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্ব। নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান থেকে শুরু করে সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা এই সমাবেশে যোগ দিয়ে পিআর পদ্ধতির প্রতি তাদের জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করেন।


জামায়াতের পাশাপাশি খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী ঐক্যজোট, নেজামে ইসলাম পার্টি এবং খেলাফত আন্দোলনের মতো প্রতিষ্ঠিত ইসলামপন্থী দলগুলোর মহাসচিব ও শীর্ষ নেতারাও মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন। এটি ছিল ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের ঐক্য প্রদর্শনের


মঞ্চ। তবে সবচেয়ে বড় চমক ছিল ইসলামপন্থী রাজনীতির বাইরে থাকা দলগুলোর সরব উপস্থিতি। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আলোচিত ‘হালের ক্রেজ’ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এবং সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক নূরের নেতৃত্বাধীন গণঅধিকার পরিষদের শীর্ষ নেতারাও এই সমাবেশে যোগ দেন। এনসিপির সদস্যসচিব মুহাম্মদ আখতার হোসাইন এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর- দুজনেই তাদের ভাষণে পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। একইভাবে, বিএনপির সাবেক নেতা এবং বর্তমানে এবি পার্টির সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জুর উপস্থিতি এই জোটের বিস্তৃতিকে আরও স্পষ্ট করে।


এই রাজনৈতিক ঐক্যের প্রদর্শনীকে ভিন্ন এক মাত্রা দিয়েছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ। হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক, বোধিজ্ঞান ভাবনা কেন্দ্রের সভাপতি দয়াল কুমার বড়ুয়া এবং বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি নির্মল রোজারিও-এই তিন নেতা মঞ্চে উপস্থিত হয়ে পিআর পদ্ধতির প্রতি তাদের সম্প্রদায়ের সমর্থন জ্ঞাপন করেন। একটি ইসলামপন্থী দলের ডাকা সমাবেশে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নেতাদের এই উপস্থিতি ছিল এক বিরল এবং তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, যা এই আন্দোলনকে একটি সর্বজনীন রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। জামায়াতের পাশাপাশি খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী ঐক্যজোট, নেজামে ইসলাম পার্টি এবং খেলাফত আন্দোলনের মতো প্রতিষ্ঠিত ইসলামপন্থী দলগুলোর মহাসচিব ও শীর্ষ নেতারাও মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন। এটি ছিল ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের ঐক্য প্রদর্শনের মঞ্চ। এদিকে মহাসমাবেশের এই জমজমাট আয়োজনের মধ্যে বিএনপির অনুপস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দলটি কেন ছিল না? তাদের অবস্থান কী?


এ প্রশ্নের জবাবে ইসলামী আন্দোলনের প্রচার ও দাওয়া বিষয়ক সম্পাদক শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, বিএনপি যেহেতু পিআর পদ্ধতির সঙ্গে একমত নয়, তাই তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তিনি আরও জানান, আওয়ামী বিরোধী আন্দোলনে একসঙ্গে থাকলেও মৌলিক কিছু রাজনৈতিক অবস্থানে বিএনপির সঙ্গে মতবিরোধ রয়েছে। সেই কারণেই তাদের বাদ দিয়ে নতুন বলয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, বিএনপি বরাবরই পিতার পদ্ধতির বিরোধী। তাদের মতে, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এতে নির্বাচন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ব্যপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, পিআর পদ্ধতি আমরা অনেক আগেই প্রত্যাখ্যান করেছি। বাংলাদেশে এর কোনো ইতিহাস নেই। এটা একটি নতুন ও পরীক্ষিত নয় এমন ধারণা। যারা এখন এই পদ্ধতির কথা বলছেন, তাদের উদ্দেশ্য হতে পারে নির্বাচন বিলম্বিত করা বা জাতীয় নির্বাচন ঠেকানো। আমরা জনগণের শক্তিতেই বিশ্বাসী পিআর নয়।


পিআর বনাম প্রচলিত পদ্ধতি : মতবিরোধের মূল কেন্দ্র:-


এই মুহুর্তে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে নির্বাচনি পদ্ধতি নিয়ে। বিএনপি চায় বিদ্যমান পদ্ধতিতেই দ্রুত জাতীয় নির্বাচন, এরপর স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আর ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াত চায় পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং তার আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। নতুন বলয়ভু দলগুলো চাইছে সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কার এবং নির্বাচনি কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন। এ মতপার্থক্য এখন শুধু কৌশলগত নয়, বরং আদর্শিক ও বাস্তব রাজনীতির অংশ হিসেবেই সামনে এসেছে।


পিআর পদ্ধতি কী? কেন আলোচনায়:-


প্রপোশনাল রিপ্রেসেন্টেশন (পিআর) বা সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ভোটের অনুপাতে সংসদে আসন বণ্টন করা হয়। এতে ছোট ও মাঝারি দলগুলোর জন্য বেশি সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং একক প্রভাবশালী দলের একচেটিয়া আধিপত্য কমে আসে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পদ্ধতির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক বৈচিত্র্য, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ অনেকাংশে বাড়ে। তবে, এর বিরোধিতাকারীদের মতে এটি জটিল সময়সাপেক্ষ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা বেশি।


নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে ইসলামী মোর্চা গঠনের প্রস্তুতি:-


সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত এই মহাসমাবেশ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চোখে কেবল একটি দাবিমূলক সভা নয়, বরং এটি একটি ইসলামী মোর্চা গঠনের আগাম মহড়া বলেও বিবেচিত হচ্ছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতৃত্বে জামায়াত, এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদসহ আরও কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল নিয়ে একটি নতুন বিরোধী জোট গঠনের প্রচেষ্টা চলছে। এই বলয়টি নিজস্ব রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে জাতীয় রাজনীতিতে বিকল্প শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্বে আয়োজিত মহাসমাবেশে যে বৈচিত্র্যময় উপস্থিতি দেখা গেছে, সেটি ভবিষ্যতের নির্বাচনি রাজনীতিতে বড় রকমের সমীকরণ বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপির দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতের অবস্থান এখন অনেকটাই স্বতন্ত্র। এনসিপি ও এবি পার্টির মতো নতুন দলগুলোও নিজেদের কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে।


সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় স্পষ্টভাবে একটি বিষয় সামনে এসেছে- আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরেও তৃতীয়মুখী একটি শক্তি গঠনের প্রবল চেষ্টা চলছে। পিআর পদ্ধতির দাবিকে কেন্দ্র করে সেই চেষ্টায় গতি এনেছে ইসলামী আন্দোলনের মহাসমাবেশ। তবে বিএনপির অংশগ্রহণ ছাড়া এই ঐক্য কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। দলটির রাজনৈতিক অবস্থান ও সাংগঠনিক শক্তি এখনো গণআন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তবুও স্পষ্টতই বলা যায়- পিআর পদ্ধতি এখন আর শুধুমাত্র ইসলামী আন্দোলনের একক দাবি নয়। এটি ক্রমেই বিরোধী রাজনীতির বিকল্প পথের ছায়া-নকশা হয়ে উঠছে। জুলাইয়ের রাজনৈতিক রোডম্যাপ ও আরও কিছু মাইলফলক সিদ্ধান্তের পর চিত্র আরও স্পষ্ট হবে- বাংলাদেশ কী পুরনো পথে চলবে, না কী পিআর পদ্ধতির নতুন পথে হাঁটবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ঢাকার রাজপথ এক নতুন এবং জটিল রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা প্রত্যক্ষ করল, যার রেশ থেকে যাবে আরও অনেক দিন।




কমেন্ট বক্স
notebook

তরুণ প্রজন্মকে ডিজিটাল সাক্ষরতার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে: তথ্যমন্ত্রী