বিদায়ের সুর ও বিষাদের ছায়ায় ভক্তদের শ্রদ্ধা ভালবাসায় দেবী দুর্গার বিসর্জন
- আপলোড তারিখঃ
০১-১০-২০১৭
ইং
সারাদেশে দর্পণ বিসর্জনের আগে সংসারের সমৃদ্ধি কামনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীদের সিঁদুর প্রদান
এসএম শাফায়েত: লোকালয় থেকে বিদায় নিলেন দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা। হয় তো এ কারণেই বিকেলে মুখ ভার ছিল আকাশের। অবশ্য বিদায়ের প্রস্তুতি শুরু হয় সকাল থেকেই। মুখে পান পাতা বুলিয়ে, সিঁদুর ছুঁইয়ে মিষ্টি মুখ করিয়ে সারা হয় আনুষ্ঠানিকতা। বিষাদের সুর বাজে মন্ডপে মন্ডপে। শেষ পর্যন্ত ভক্তের মনে মেঘ আর আকাশে বিষাদের ঘন মেঘ জমিয়ে বিদায় নেন দুর্গতিনাশিনী। তবে বিষাদের মাঝেও ভক্তমনের সান্ত¡না- মঙ্গলময় বার্তা নিয়ে সামনের বছর আবার আসবেন দেবী। এই আশার মধ্য দিয়েই শেষ হলো হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। গতকাল শুক্রবার প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয় পাঁচ দিনব্যাপী এই আয়োজন। ভক্তদের চোখের জলে ভাসিয়ে এদিন সপরিবারে দেবী দুর্গা বাবার বাড়ি থেকে ফিরে গেলেন স্বামীর ঘরে কৈলাসে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মানুষের মনের কাম, ক্রোধ, হিংসা, লালসার মতো আসুরিক প্রবৃত্তি বিসর্জন দেয়াই মূলত বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য। এ প্রবৃত্তিগুলোকে বিসর্জন দিয়ে একে অন্যের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই এ আয়োজনের উদ্দেশ্য। সনাতন বিশ্বাস ও বিশুদ্ধ পঞ্জিকা মতে, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) আসেন নৌকায় চড়ে। তবে স্বর্গালোকে বিদায় নেন ঘোটকে (ঘোড়া) চড়ে। যার ফল হচ্ছে শস্যশ্যামলা হয়ে উঠবে পৃথিবী। দূর হবে খাদ্য সংকট। গমন ঘোটকে। অর্থাৎ ঘোড়ায় চড়ে। যা চুড়ান্ত অমঙ্গলজনক। জলস্থর বৃদ্ধি পাবে। বন্যার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। গমনে সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা। দেবীর আগমন ও গমনে বদলে যায় বিশ্ব চরাচর। গোটা বছরের শুভ-অশুভ ইঙ্গিত দিয়ে যান দেবী।
দেবীর বিদায়ের আয়োজন শুরু হয় সকাল থেকেই। এবার জেলার ৯৬টি মন্ডপে করা হয় দশমী পূজা সমাপন ও দর্পণ বিসর্জন। বিষাদের সুর ছিল ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টাসহ বিভিন্ন বাদ্যে, ছায়া ছিল আলোকিত করা ধূপ আরতিতে এবং দেবীর পূজা-আর্চনায়। বিসর্জনের আগে সকাল থেকে চুয়াডাঙ্গা বড় বাজার মন্দিরে চলে সিঁদুর খেলা আর আনন্দ উৎসব। বিকাল সাড়ে ৩টায় প্রতিমা বিসর্জনের উদ্দেশ্যে বের করা হয় বিজয়া শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রাটি মন্দির প্রাঙ্গন থেকে শুরু হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ঘুরে শহীদ হাসান চত্ত্বরে এসে পৌছুলে ঢাক-কাসর আর গানের তালে তালে নাচতে থাকে ভক্তরা। প্রায় আধাঘন্টাব্যাপী সড়ক জুড়ে আনন্দ উৎসবে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা শহর। বেলা সাড়ে ৫টা নাগাত মাথাভাঙ্গা নদীর জ্বীনতলা মল্লিকপাড়া ঘাটে গিয়ে দেবী বিসর্জন দেওয়া হয়। এ সময় ঢাকের শব্দে আর ধূপের গন্ধে মুখরিত হয়ে উঠে গোটাঘাট এলাকা। একই স্থানে দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গার বিজয়া বিসর্জন করে বেলগাছী দুর্গা মন্দিরের ভক্তরা। এ ছাড়াও জেলা সদরের ১১টি স্থানে ২৯টি পূজা মন্ডপ বিজয়া দশমীর মধ্যে দিয়ে বিকেল থেকে সন্ধ্যা অবধি দেবী বিসর্জন সম্পন্ন করে।
সরোজগঞ্জ অফিস জানিয়েছে, প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যদিয়ে গতকাল সাড়ে ৫টার দিকে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। বিশুদ্ধ পঞ্জিকামতে, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দূর্গা এবার সরোজগঞ্জ কাছারি পাড়ায় পূজা উৎযাপন হয়েছে। বিজয়া দশমী উপলক্ষে গতকাল শনিবার সরোজগঞ্জ কাছারি পাড়া ও বোয়ালিয়া, ধুতুরধাট দাসপাড়া, তেঘরিসহ চুয়াডাঙ্গার শংকরচন্দ্র ও কুতুবপুর এবং তিতুদহ ইউনিয়ানের বিভিন্ন পূজামন্দিরে দেবী দূর্গাসহ অন্যান্য দেব-দেবীকে এ শোভাযাত্রা বের হয়। সেখানে বিসর্জনের মাধ্যমে তাদের আনুষ্ঠানিক বিদায় জানানো হয়। দেবী মর্ত্যলোক থেকে আবার স্বর্গলোকে গমন করবেন। এবার চুয়াডাঙ্গার শংকরচন্দ্র ও কুতুবপুর এবং তিতুদহ ইউনিয়নে পূজামন্দিরে পূজা উৎযাপন করা হয়েছে। সরোজগঞ্জ কাছারি পাড়ার পূজামন্দিরে সভাপতি উত্তম কর্মকারের সভাপতিত্বে পূজামন্দিরে উপস্থিত ছিলেন কুতুবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলী আহম্মেদ হাসানুজ্জামান( মানিক), পূজামন্দিরে সেক্রেটারি আসোক কুমার ঘোষ, শংকর শর্মা, দেবাশীস, সিজন, সুজয়, শুভংকর, শ্যামলসহ প্রমুখ। গতকাল শনিবার প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে গতকাল শনিবার বিকাল সাড়ে ৫ টার দিকে খাড়াগোদা চিত্রা নদীতে।
আলমডাঙ্গা অফিস জানিয়েছে, কয়েকদিন পূজা অর্চনা শেষে গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় ভক্তদের কাঁদিয়ে বিদায় নিলেন দেবী দূর্গা। দেবী দূর্গা পূজারী আর ভক্তদের চোখের জলে মর্ত্য থেকে স্বর্গলোকে যাত্রা করলেন। কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণ ও উৎসব মুখর পরিবেশে শেষ হলো হিন্দু ধর্মাবল্বীদের বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। আলমডাঙ্গা পৌর এলাকার ৯ টি প্রতিমা বেলা ৫-৩০ টা থেকে একে একে আলমডাঙ্গা শহর সংলগ্ন ক্যানেলের পাড়ে নিয়ে আসে স্ব স্ব মন্দির কমিটির নেতৃবৃন্দ সহ ভক্তগন। সব কটি প্রতিমা ক্যানেল পাড়ে উপস্থিত হলে শুরু হয় বিসর্জনের পালা। ভক্ত পূজারীরা তাদের অশ্রু স্বজল চোখে ক্যানেলে বিসর্জন দেয়। প্রতিমা বিসর্জন স্থলে উপস্থিত ছিলেন পৌর মেয়র হাসান কাদির গনু, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অফাব্দুল মোমেন, উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ডা. অমল কুমার বিশ্বাস, পৌর প্যানেল মেয়র কাউন্সিলর সদরুদ্দীন ভোলা, প্যানেল মেয়র কাউন্সিলর জহুরুল ইসলাম স্বপন, কাউন্সিলর মতিয়ার রহমান ফারুক, আ: গফ্ফার, আলী আজগর সাচ্চু, আলালউদ্দীন, জাহিদুল ইসলাম, মামুন অর রশিদ হাসান, ফারুক হোসেন, পুজা উদযাপন পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক পরিমল কুমার কালু ঘোষ, হিন্দু যুব সম্প্রদায়ের আহবায়ক বিশ্বজিৎ সাধুখাঁ, যুগ্ম আহবায়ক পলাশ আচার্য্য সহ হাজারো পুজারী ভক্ত ও দর্শনার্থী। শারদীয় দূর্গা উৎসব শান্তিপূর্ণ ও উৎসব মুখর পরিবেশে শেষ হওয়ায় আলমডাঙ্গা উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ডাঃ অমল কুমার বিশ্বাস আলমডাঙ্গা উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, পৌর মেয়র, কাউন্সিলরবৃন্দ, সাংবাদিকবৃন্দসহ সর্বস্তরের জনগনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
দামুড়হুদা অফিস জানিয়েছে, আনন্দ-বেদনায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যদিয়ে বিদায় দেয়া হলো দুর্গতিনাশিনী দুর্গাকে। এর মধ্যদিয়ে সম্পন্ন হলো এবারের বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উত্সব শারদীয় দুর্গাপূজা। আগামী বছর ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে ভক্তরা সজল চোখে বিদায় দিয়েছেন মা দুর্গাকে। ঢাকের বাদ্যের সাথে নাচ, সিঁদুর উত্সব আর ধান- দুর্বা ও মিষ্টি-আবির দিয়ে দেবীকে বিদায় জানানোর পালা শুরু হয় সকাল থেকেই। মহালয়ায় দেবীপক্ষের শুরুতে যাকে আবাহন করা হয় দশমীতে সেই দেবী দুর্গাকে বিদায় দেয়া হয়। দেবী দুর্গা এবার হাতির পিঠে চড়ে বিদায় নিচ্ছেন। শাস্ত্র মতে, এতে দেশ হবে ফল-ফুল-শস্যে পরিপূর্ণ। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মনে করেন, অসুরশক্তি বিনাশিনী দেবীর পূজায় সকল অপশক্তি পরাভব মানে। পাঁচ দিনব্যাপি দুর্গোত্সবের শেষ দিনে সকালে ম-পে ম-পে দশমীর বিহিত পূজা অনুষ্ঠিত হয়। উৎসব, বিষাদ আর নানা রকম আয়োজনের মধ্যদিয়ে সারাদেশের মতো দামুড়হুদায় পালিত হয়েছে বিজয়া দশমী। গতকাল শনিবার বিকেলে উপজেলা শহরের পূজাম-প থেকে দুর্গা প্রতিমা নিয়ে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ঢাকের শব্দে পুরো শহর মাতিয়ে তোলে। পরে দেবীকে বিসর্জন দেয়া হয় মাথাভাঙ্গা নদীতে। এবার উপজেলায় ১৯টি পূজা ম-পের আয়োজন করা হয় দুর্গাপূজার। দামুড়হুদায় প্রশাসনের কড়ানজরদারির মধ্যদিয়ে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হয়েছে। দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার রফিকুল হাসান ও দামুড়হুদা মডেলল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জিহাদ উপজেলার ১৯টি পূজাম-প পরিদর্শন করেন এবং তাদের সার্বিক খোঁজখবর নেন। কোথাও কোনো সমস্যা হয়নি বলে তিনি উভয়ে এ প্রতিবেদককে জানান।
দর্শনা অফিস জানিয়েছে, দর্শনায় শারদীয় দুর্গার বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পুজা উৎসব। গতকাল বিকাল ৪টায় দর্শনা পৌরসভার আয়োজনে মাথাভাঙ্গা নদী সংলগ্ন দর্শনা পৌর গোহাটে মাইকের মাধ্যমে এক এক মন্দির কমিটিকে ডেকে নেয় তাদের দুর্গা বিষর্যনের জন্য। এ সময় পুলিশ কর্মকর্তা এস আই জাহাঙ্গির আলম বলেন সনাতন ধর্মের সার্বজনিন শারদীয় দুর্গা পুজা বিশর্জনে দর্শনা পৌরসভার ভিতরে ৫টি মন্দিরে মধ্যে প্রথমে কেরুজ মন্দির কমিটির সভাপতি সৌমির সরকার ও সা:সম্পাদক দীপেন কুমারকে ডেকে নেওয়া হয় তাদের প্রতিমা বিসর্জনের জন্য। এর পরে তালিকা অনুযায়ী আমতলা মন্দিরের সভাপতি রতন বাশফোড় ও সা:সম্পাদক সুমনকে ডাকা হয়। পুরাতন বাজার মন্দির কমিটির সভাপতি উত্তম রণ্জন দেবনাথ ও সা:সম্পাদক অনন্ত শান্তারাকে ডাকা হয়। দাশ পাড়া মন্দিরের সভাপতি শ্যামল দাশ ও সা:সম্পাদক মধু দাশকে ও সর্বশেষ আদিবাসী মন্দিরের সভাপতি যাদব বিশ্বাস ও সা:সম্পাদক শংকর মন্ডলকে ডেকে নেওয়া হয় তাদের প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার জন্য। পুলিশ আরও বলেন এসকল মন্দিরের নেতৃবন্দরা শান্তিপূর্ন পরিবশে স্ব স্ব মন্দিরের প্রতিমা বিসর্জন দেয়। অপরদিকে নদীর অপর পাশে পারকৃষ্ণপুর মন্ডপের প্রতিমা একই সময় বিসর্জন দেওয়া হয়।
কমেন্ট বক্স