সুচির অবস্থান নড়বড়ে : প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেনাবাহিনীর দখলে
- আপলোড তারিখঃ
১৫-০৯-২০১৭
ইং
রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কথিত হামলার পরপরই সেনাবাহিনীকে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন্স’-এর অনুমতি
ফের সেনা বিদ্রোহের শঙ্কা : মিয়ানমারে মরিয়া ‘অন্ধকার বাহিনী’
সমীকরণ ডেস্ক: রোহিঙ্গা সংকটকে ঘিরে মিয়ানমারে ফের সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অং সান সুচিকে ফাঁদে ফেলে দেশটির ব্যাপক ক্ষমতাধর সেনাবাহিনী ফের ক্ষমতা দখল করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
মিয়ানমারের ৭০ বছরের ইতিহাসে ৫৫ বছরই শাসন করেছে সেনাবাহিনী। দেশটিতে আবার সেনাশাসন ফিরতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে বৃহস্পতিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে টাইম ম্যাগাজিন।
২০১৫ সালে একটি অবাধ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার পর অং সান সুচির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি ক্ষমতায় এলেও সেনাবাহিনী এখনও দেশটির দ-মু-ের কর্তা।
সংসদে ২৫ ভাগ আসন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে তারা। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তবিষয়ক মন্ত্রণালয়গুলো এখনও সেনাবাহিনীর দখলেই রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এসব মন্ত্রণালয়ের ওপর দেশটির ডি ফ্যাক্টো নেতা সুচির কোনো ক্ষমতাই নেই।
রাষ্ট্রীয় অখ-তা ও নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে সেনাবাহিনী। ক্ষমতায় টিকে থাকতে সুচি প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে তাদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন।
চাইলেও সেনাবাহিনীর ক্ষমতার লাগাম টানার ক্ষমতা তার নেই। তাই রাখাইনে গত ২৫ আগস্ট নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর ‘রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের’ কথিত হামলার পরপরই ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন্স’-এর অনুমতি দেয়া হয় সেনাবাহিনীকে। সমালোচকরা বলছেন, সুচিকে আরও দুর্বল ও রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ শুরু করতে সেটি ছিল সামরিক বাহিনীর নীলনকশার একটি অংশ। এরপর সেখানে সেনাবাহিনী পোড়ামাটি নীতি অনুসরণ করে চলেছে। খোদ প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র বুধবার স্বীকার করেছেন যে, রাখাইনের ৪৭১টি রোহিঙ্গা গ্রামের ১৭৬টি তথা ৪০ ভাগ গ্রাম এখন জনশূন্য। গ্রামগুলোতে রোহিঙ্গাদের বাস ছিল।
এ পরিস্থিতিতে সেনা অভিযানের নিন্দা জানানোর জন্য সুচির ওপর চাপ দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং তারই একসময়ের ঘনিষ্ঠজনরা। তবে সুচি তাতে কর্ণপাত করছেন না। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তাকে ফের ক্ষমতাচ্যুত করা হতে পারে। সেনারা তাকে দীর্ঘ ১৫ বছর গৃহবন্দি রেখেছিল।
টাইম ম্যাগাজিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশটির ক্যাথলিক ধর্মগুরু কার্ডিনাল চার্লস মং বো। ২০১৫ সালে তাকে মিয়ানমারের প্রধান ক্যাথলিক ধর্মগুরু পদে নিয়োগ দেন পোপ ফ্রান্সিস। মিয়ানমার থেকে তিনিই প্রথম ক্যাথলিক ধর্মগুরু যাকে কার্ডিনাল পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কাডির্নালরাই ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ পদে বাছাই করে থাকেন।
টাইম ম্যাগাজিনকে বো বলেন, সুচির অবস্থান নড়বড়ে। মিয়ানমারে গণতন্ত্র এখনও ভঙ্গুর। তিনি বলেন, সুচি ২০১৫ সালের নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেলেও এখন ‘দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটছেন’। সেনাশাসন ফেরাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ‘অন্ধকার বাহিনী (ডার্ক ফোর্স)’।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সেনাবাহিনীর সমান্তরালে অবস্থান নিয়ে সুচি সারা দুনিয়া থেকে যেভাবে নিন্দা কুড়াচ্ছেন, যেভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন তাতে তার অবস্থান উল্টো আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। মিয়ানমারের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী এখনও তাকে সমর্থন দেয়। তবে তিনি ক্ষমতাহীন নেত্রী- এ ধারণা জনমনে বদ্ধমূল হলে তাতে সেনাবাহিনীর অবস্থানই পাকাপোক্ত হবে।
টাইম ম্যাগাজিনকে কার্ডিনাল বো বলেন, আমার কষ্ট লাগে যে কিছু লোক উগ্র জাতীয়তাবাদী অনুভূতি ছড়াচ্ছে। রাখাইনের লোকজন চরম দুর্ভোগ, অবহেলা ও দুর্ব্যবহারের শিকার বলে মন্তব্য করেন তিনি। বেশিরভাগ বৌদ্ধের মধ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য কোনো সহানভূতি দেখা যাচ্ছে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
রাখাইন রাজ্যে মানবাধিকার ও মানবিকতার ট্র্যাজেডি আসন্ন। চলমান দমন-পীড়ন আরও বেশ কিছুদিন চলতে পারে। তবে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা ও বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের যে মুখোশ রাখাইনে উন্মোচিত হয়েছে তা দেশটির ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে!
কমেন্ট বক্স