সমীকরণ ডেস্ক: দেশের অভ্যন্তরে টানা বৃষ্টি ও পাহাড় থেকে নেমে আসা পানিতে তলিয়ে গেছে উত্তরাঞ্চলের ২০টি জেলা। গত দু’দিনে মারা গেছেন ৫৮ জন। এর মধ্যে রবিবার মারা যায় ২৬ জন এবং গতকাল মারা যায় ৩২ জন। অন্যদিকে বন্যায় ভেঙে গেছে বেশ কয়েকটি নদী রক্ষার বাঁধ। পানির ¤্রােতের তীব্রতায় হুমকির মুখে পড়েছে তিস্তা ব্যারেজ এলাকা। সংশ্লিষ্ট এলাকায় রেড অ্যালার্ট জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। রেললাইন ও মহাসড়কের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়াসহ মহাসড়কের কয়েক জায়গায় ভেঙে যাওয়ায় লালমনিরহাটের সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেছে রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে উজানের ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও গঙ্গা অববাহিকা থেকে প্রচুর পানি ধেয়ে আসার খবর দিয়েছে আন্তর্জাতিক দুটি সংস্থা। জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কের কার্যালয় (ইউএনআরসিও) ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ গবেষণাকেন্দ্র (জেআরসি) তাদের রিপোর্টে জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার অঞ্চলগুলোতে গত শুক্রবার থেকে পানি বাড়া শুরু হয়েছে। আগামী ১৯শে আগস্ট পর্যন্ত এই পানি বাংলাদেশের ভাটির দিকে প্রবাহিত হবে। রিপোর্টে বলা হয় বিগত ১০০ বছরের মধ্যে তিব্বতের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় সবচেয়ে বেশি পানি বেড়েছে চলতি বছর। ৯৮ বছরের মধ্যে চলতি বছর সব চেয়ে বেশি পানি বেড়েছে তিস্তা অববাহিকায়। এবং ৭৫ বছরের মধ্যে চলতি বছর সব চেয়ে বেশি পানি বেড়েছে গঙ্গা অববাহিকায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইতিমধ্যে উত্তরাঞ্চলের অবস্থা খুবই খারাপ। ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা ও তিস্তা অববাহিকা থেকে একযোগে পানি নেমে আসায় চলতি বছরের বন্যা স্মরণকালের সবচেয়ে বড় বন্যা হতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী সোমবার পর্যন্ত দেশের ৯০টি পানি পর্যবেক্ষণ পয়েন্টের মধ্যে ২৭টি পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে ৬৫টি পয়েন্টে। সংস্থাটি বলছে আগামী তিনদিন পর্যন্ত উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে পরিস্থিতি আরো অবনতি হতে পারে।
সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে এক সংবাদ সম্মেলনে ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম বলেছেন, আমাদের কাছে আসা তথ্য অনুযায়ী বন্যায় ইতিমধ্যে উত্তরাঞ্চলের ২০টি জেলার ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩৯০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উজানের এই পানি নেমে দেশের মধ্য ও নিম্নাঞ্চলের আরো ৯টি জেলাসহ ঢাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। এগুলোসহ মোট ৩৩টি জেলাব্যাপী চলতি বছর বন্যা হতে পারে বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। আমরা সেই অনুযায়ী বন্যা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ইতিমধ্যে ১০ হাজার ৬৩০ টন চাল ও ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আরো প্রচুর পরিমাণে খাদ্য আমদানি ও টাকা বরাদ্দ দেয়া হবে। মন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে ৯৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৫৮৬ জন লোক আশ্রয় নিয়েছেন। প্রত্যেকটি লোককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনী কাজ করছে। এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) এবং মাঠ পর্যায়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
আমাদের রিপোর্টারদের পাঠানো সংবাদে দেখা যায়, দিনাজপুরের ১৩টি উপজেলায় পানিতে ডুবে, সর্পদংশন এবং দেয়াল চাপায় ১৪ জনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছেন জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম।
কুড়িগ্রামে সোমবার মারা গেছেন সর্বমোট ১০ জন। এছাড়া, জেলার ভুরুঙ্গামারীতে বন্যার ¯্রােতে ভেসে গেছে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। রোববার সন্ধ্যায় পাইকেরছড়া ইউনিয়নের আড়ায়ারপার বিলের কাছে রাস্তা পারাপারের সময় দেওয়ানের খামার গ্রামের মজিবর রহমান(১৫) স্রোতের টানে পানিতে ডুবে মারা যায়। অন্যদিকে সোনাহাট সেতুর নিকট সাবমেরিন কেবলের খুঁটি স্রোতের টানে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় দুধকুমর নদের পূর্ব তীরের ছয়টি ইউনিয়ন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নীলফামারীতে মারা গেছেন তিনজন। এর মধ্যে সৈয়দপুরের চওড়া নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে পানিতে ডুবে কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়নের সাতপাই গ্রামে জাকারিয়া (৪৫) নামে একজন নিহত হয়েছেন। এছাড়াও পাটোয়ারী পাড়ায় খরখরিয়া নদীতে ডুবে ২ জন নিখোঁজ রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে তারাও মারা গেছেন। রংপুরে বন্যায় ৪ উপজেলার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ভেসে গেছে ২ শিশু। সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের আজপুর গ্রামে বন্যার পানিতে তলিয়ে মৃদুল মিয়া (৪) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার গামারীতলা ইউনিয়নে বন্যার পানিতে তলিয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
উলিপুরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি: আবু সাঈদ সরকার, উলিপুর (কুড়িগ্রাম) থেকে জানান, কুড়িগ্রামের উলিপুরে বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ৭৭ সেঃ মিটার উপর এবং ধরলা ও তিস্তা নদীর পানি সামান্য কমলেও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নদীর অববাহিকার সাহেবের আলগা, বেগমগঞ্জ, বুড়াবুড়ি, হাতিয়া, দলদলিয়া, থেতরাই, গুনাইগাছ ও বজরাসহ ৮টি ইউনিয়নের শতাধিক চর ও দুইশতাধিক গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যায় উপজেলার কয়েক হাজার ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ১০ হাজার হেক্টর রোপা আমন, বীজতলা পানিতে ডুবে গেছে ও ১৬৫টি পুকুরের প্রায় ৩৫ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে।
নওগাঁ শহরের বিভিন্ন এলাকা পানির নিচে: নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, নওগাঁর মান্দা উপজেলায় আত্রাই নদীর দুটি স্থানে মূল বাঁধ এবং ৬টি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে গিয়ে ৯টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। ছোট যমুনা নদীর ফ্লাড ওয়ালের আউটলেট দিয়ে পানি প্রবেশ করে নওগাঁ শহরের বিভিন্ন এলাকা এক থেকে দেড় ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। আক্রান্ত এলাকার প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। প্রায় ৫০ হাজার বিঘা ফসলি জমির ফসল ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ১ হাজার পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। মান্দায় ৩০টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে।
এছাড়া রাজশাহীতে নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে হাজারও মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।