শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬
সর্বশেষ স্থানীয় সংবাদ জাতীয় রাজনীতি আর্ন্তজাতিক সারাদেশ অর্থনীতি খেলা বিনোদন আজকের পত্রিকা প্রযুক্তি চাকরি

অ্যাসিডের ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত পরিবেশ, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

  • আপলোড তারিখঃ ২৪-০৫-২০২২ ইং
অ্যাসিডের ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত পরিবেশ, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
অধিকাংশ কারখানার নেই লাইসেন্স ও পরিবেশ ছাড়পত্র, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেন জেলা প্রশাসক সোহেল রানা ডালিম: চুয়াডাঙ্গা বড় বাজার এলাকায় বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে গহনা তৈরির শতাধিক ছোট ছোট কারখানা। আর এসব কারখানা থেকে নিঃসৃত অ্যাসিডের বিষাক্ত ধোঁয়া যেমন বাড়াচ্ছে স্বাস্থঝুঁকি, তেমনি বিষিয়ে তুলেছে আশেপাশের পরিবেশ। ৬-৭ ফুট আয়তনের এসব ছোট ছোট কারখানায় ৭-৮ জন কারিগর গাদাগাদি করে অ্যাসিড নিয়ে কাজ করায় খোদ কারিগররাই রয়েছেন চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। অসচেতন কারখানার মালিকরাও তোয়াক্কা করছেন না অ্যাসিড ব্যবহারের বিধি-নিষেধ। অনিয়ন্ত্রিতভাবে অ্যাসিড ব্যবহারে কারখানাগুলো থেকে দিন-রাত নির্গত হচ্ছে অ্যাসিডের বিষাক্ত ধোয়া। নাইট্রিক অ্যাসিড ও সালফিউরিক অ্যাসিড থেকে নিঃসৃত ধোঁয়া কারখানার স্বল্প উচ্চতার পাইপ দিয়ে বের হয়ে মিশে যাচ্ছে বাতাসে, প্রবেশ করছে পথচারীসহ আশপাশের ভবন, ব্যাংক বীমা, অফিসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। নিউ মার্কেট এলাকা থেকে হাসান চত্বর হয়ে ভি জে স্কুল পর্যন্ত চলাচলকারী প্রত্যেক পথচারীকেই অ্যাসিডের বিষাক্ত ধোঁয়ার সাথে নিঃশ্বাস নিয়ে চলতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফলে শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ, চর্ম ও চক্ষু রোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এই এলাকায় চলাচল ও বসবাস করা সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ। অ্যাসিডের বিষাক্ত ধোঁয়া বাতাসে মিশে যাওয়ার বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় আগের মতো এখন আর চোখে পড়ে না শত শত শালিকের ঝাঁক। স্থানীয়দের অভিযোগ, অধিকাংশ কারখানারই নেই অ্যাসিড ব্যবহারের লাইসেন্স, নেই পরিবেশ ছাড়পত্রও। তারপরও নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে হরহামেশা ব্যবহার হচ্ছে মানবদেহের জন্য চরম ক্ষতিকর এই অ্যাসিড। জেলার স্বর্ণপট্টি বলতে মূলত ভি জে স্কুলের সামনে থেকে নিউ মার্কেট এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই এলাকার বিভিন্ন অলি-গলি, বাড়ির ছাদ, সিঁড়ির নিচে, টয়লেটের পাশে গাদাগাদি করে গড়ে উঠেছে ১ শ’র বেশি গহনা তৈরির কারখান। এসব কারখানার মধ্যে মাত্র পাঁচজনের অ্যাসিড ব্যবহারের লাইসেন্স আছে। চুয়াডাঙ্গাতে স্থানীয়ভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান অ্যাসিড বিক্রি করে না। তবে শহরসহ আশেপাশের এলাকাতে ১৫ থেকে ২০টি ব্যাটারি বিক্রির দোকান রয়েছে। এসকল দোকান মালিকরা বলছেন, তাঁরা খোলা অবস্থায় অ্যাসিড বিক্রি করেন না। ব্যাটারিতে যেভাবে থাকে, তারা সেভাবেই বিক্রি করেন। আর স্বর্ণ কারখানার মালিকরা বলছেন, তাঁদের অ্যাসিডের প্রয়োজন হলে যশোর থেকে দিয়ে যায়। ফোন দিলেই পৌঁছে যায় অ্যাসিড। তাতে কতটুক অ্যাসিড কে কিনল, আর কতটুকু কে ব্যবহার করল, তারও হিসেব নেই কারো কাছে। এদিকে, এসয কারখানায় কারিগর ও সহকারী মিলে প্রায় ৭ থেকে ৮ শর অধিক কর্মী কাজ করছেন। এসকল কর্মীদের প্রত্যেকেরই বিষাক্ত অ্যাসিড নিয়ে কাজ করতে হয় প্রতিদিন। নাইট্রিক অ্যাসিড দিয়ে সোনা খাঁটি করার সময় যে ধোঁয়া বের হয়, তা বাতাসের সাথে মিশে অম্লীয় বাষ্পে রুপ নেয়। পরে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডযুক্ত ওই বাতাস শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এতে করে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, হৃদরোগসহ নানা রকম স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে। এ নিয়েই কাজ করছেন এ সেক্টরের কর্মীরা। সোনার গহনা তৈরিতে মূলত দুই ধরণের অ্যাসিড ব্যবহার করা হয়। একটি নাইট্রিক অ্যাসিড অপরটি সালফিউরিক অ্যাসিড। নাইটিক অ্যাসিড সোনাকে পুড়িয়ে সোনার খাদ বের করা হয়। আর তৈরি গহনার সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে ব্যবহার করা হয় সালফিউরিক অ্যাসিড। সরেজমিনে গহনা তৈরির কারখানাগুলোতে গেলে সেখানে দেখা মেলে ১৬ বছরের শিশু সেতুর সাথে। সেতু প্লেটে সোনার পাত রেখে নাইটিক অ্যাসিড দিয়ে তা পুড়িয়ে সোনার খাদ বের করছে। ওই সময় প্লেট থেকে নাইট্রিক অ্যাসিডের রগরগে ধোঁয়ার কুণ্ডলি বের হচ্ছিল। সে সময় তার মুখে ছিল না মাস্ক, হাতে ছিল না গ্লাভস। সেদিকে  সেতুর এতটুকু ভ্রুক্ষেপও নেই। সে শুধু জানে নাইট্রিক অ্যাসিড দিয়ে সোনার খাদ বের করত হয়। আর কিছু তার জানার প্রয়োজন নেই। এক পর্যায়ে কথা হলো সেতুর সাথে। সেতু মজনুর কারখানার কারিগর। গত তিন বছর ওই কারখানায় কাজ করে সে। নাইট্রিক অ্যাসিডের ধোয়াতে তার কী কী ক্ষতি হচ্ছে, সে বিষয়ে কিছুই জানে না সে। সে বিষয়ে এত গভীরভাবে জানারও কথা না সেতুর। তার এখন লেখাপড়া, খেলাধুলা করার কথা। অথচ সংসারে অভাব-অনটনের কারণে এই বয়সে এত কঠিন কাজের সামনে দাঁড়াতে হয়েছে তাকে। স্বর্ণপট্টির এরকম শত শত সেতু রয়েছে তাদের খবরও রাখে না কেউ। কারখানা মালিক মজনুর কাছে কিশোর সেতুর ব্যাপারে জানতে চাইলে তাতে তার সাফ জবাব, অ্যাসিড ব্যবহারে জন্য তার লাইসেন্স আছে। কিশোর সেতুর বিষয়ে তার কোনো খেয়াল নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অপর কারখানার এক কারিগর বলেন, বিভিন্ন ধরণের অসুস্থতার জন্য চিকিৎসকের কাছে গেলে বিষাক্ত অ্যাসিড নাড়াচাড়ার বিষয়ে বললে তখন চিকিৎসকরাও বিরক্ত হন। চুয়াডাঙ্গা জুয়েলারি কারিগর সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, গহনা তৈরিতে অ্যাসিড ব্যবহারে শরীরে নানা রকম সমস্যা হয়। তারপরও জীবন ও জীবিকার তাগিদে তাদেরকে এই কঠিন কাজই করতে হচ্ছে। এছাড়ও তিনি বলেন, সবকিছু ঠিক করে একটি কারখানা করতে গেলে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা খরচ হবে। তারপরও সাধারণ জনগণের কথা চিন্তা করে তিনি বলেন, এখনই সঠিক সময় কারখানাগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার। এ ব্যপারে চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান সময়ের সমীকরণকে বলেন,  স্বর্ণের কারিগররা যে অ্যাসিড ব্যবহার করেন, সেটাকে বলা হয় রাজ অম্ল। নাইট্রিক ও হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ১:৩ এর মিশ্রণ। যা সোনা ও প্লাটিনামকে গলিয়ে দেয়, যা অন্য কোনো অ্যাসিড গলে না। তিনি আরও বলেন, যে অ্যাসিড সোনাকে গলিয়ে দেয়, তার ধোঁয়া পরিবেশের চরম ক্ষতি করে, এর থেকে যে কালো ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়, তার থেকে গাড় পদার্থ নির্গত হয়। অ্যাসিড বৃষ্টি হয়। শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরের ভেতর প্রবেশ করলে শ্বাষযন্ত্রে ইনফেকশন হয়। শরীরের অভ্যন্তরে নরম যে অঙ্গ-প্রতঙ্গগুলো আছে, সেখানে আক্রমণ করে। চুয়াডাঙ্গা জেলা জুয়েলারি মালিক সমিতির সভাপতি সাইফুল হাসান জোয়ার্দ্দার টোকন অ্যাসিডের ব্যবহার ও এর ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, বিষয়টি নিয়ে তাঁরাও চিন্তিত। তিনি আরও বলেন, চুয়াডাঙ্গাতে স্বর্ণের কারখানাগুলোর পরিবেশগত বেশকিছু সমস্যা আছে। আর এসব সমস্যার কারণে এই সেক্টরসহ আশেপাশের পরিবেশেরও চরম ক্ষতি হচ্ছে। তিনি ঢাকার স্বর্ণের গহণা তৈরির কারখানাগুলোর উদাহরণ দিয়ে বলেন, ঢাকাতে যেভাবে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশবান্ধব কারখানা গড়ে উঠেছে, তাতে সেখানকার স্বর্ণ কারিগররা সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারছেন। তিনি এও বলেন, স্থানীয় প্রশাসন যদি স্বর্ণ তৈরির কারখানাগুলো স্থানান্তরসহ নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে আনতে চায়, সে বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা জুয়েলারি সমিতি তাঁদেরকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করবে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম খান সময়ের সমীকরণকে বলেন, অ্যাসিডের ধোঁয়া মানবদেহের জন্য চরম ক্ষতিকর। স্বর্ণের কারখানাগুলোতে ব্যবহৃত অ্যাসিডের ধোঁয়া নির্গমনের জন্য যে পাইপ দেওয়ার কথা, সেগুলো আছে কি না। তাছাড়াও এই কারখানাগুলোতে শিশুশ্রমসহ বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে পরিদর্শন করে নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


কমেন্ট বক্স
notebook

কার্পাসডাঙ্গায় কাচামাল ব্যবসায়ীর ছু*রিকাঘা*তে ফল ব্যবসায়ী মধু নি*হ*ত