আতঙ্কিত হয়ে অনেকে ছাড়ছে গ্রাম!
- আপলোড তারিখঃ
০৪-০৬-২০১৭
ইং
চুয়াডাঙ্গায় জেলা জুড়ে ধারাবাহিক ডাকাতি ও নারীর শ্লীলতাহানি চেষ্টার ঘটনা
আতঙ্কিত হয়ে অনেকে ছাড়ছে গ্রাম!
আড়াই মাসে ২০টিরও বেশি ডাকাতির ঘটনা : চারিদিকে নানা গুজবের নেই সত্যতা
নিজস্ব প্রতিবেদক/দর্শনা অফিস: চুয়াডাঙ্গা সদরের বেগমপুর ইউনিয়নের হিজলগাড়ী-নেহালপুর সড়কের ডিহিকৃষ্ণপুর নামকস্থানে ডাকাতি ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় ওই এলাকাসহ আশপাশ এলাকায় অজানা আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু ওই এলাকায় না, অজানা এ আতংক ছড়িয়ে পড়েছে এখন গোটা জেলায়। প্রতিনিয়ত গুজব ভাসছে আকাশে-বাতাসে, চায়ের দোকানে এমনকি বাড়ির উঠানে মহিলাদের মধ্যেও। চারিদিক থেকে নানা গুজব আসলে সাংবাদিকরা সেখানে বার বার ছুটে গিয়ে তার কোনও সত্যতা না পেয়ে ফিরে এসেছে। প্রশাসন পর্যন্ত বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে গুজব আতংকের সমাধান দিতে।
লোকমুখে শোনাযায় কোনো এক ৩০/৪০ জনের অজ্ঞাত বাহিনী প্রতিরাতে দল বেধে হানা দিচ্ছে ওই সমস্ত পাড়া/মহল্লায়। তারা বাড়িতে ঢুকে ডাকাতি তান্ডব চালাচ্ছে। লুট করে নিয়ে যাচ্ছে সমস্ত মালামাল। এ সময় তাদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না বাড়ির যুবতী মেয়ে কিবা গৃহবধূরাও। তাদের তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ, নির্যাতনসহ ব্যাপক অত্যাচার করা হচ্ছে। ডাকাতেরা ডাকাতির সাথে সাথে নারীদেরকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে এমন খবরে প্রথমে দর্শনা তারপর আশপাশের গ্রাম গুলোতে পাহারা শুরু হয়েছে। তবে অনেকেই বলছেন এলাকায় চিহ্নিত একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী গ্রুপ বিভিন্ন স্থানে ডাকাতিসহ নারী নির্যাতনের মত অপকর্ম করছে। তবে নির্দিষ্ট ভাবে এ ঘটনার কোনো সত্যতা মেলেনি। এ ভয়ে গ্রামবাসীরা নিজ নিজ গ্রামে পাহারা দেওয়া শুরু করেছে। কেউ কেউ অজানা আতংকে বাড়ি ঘর ফেলে অনত্র আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
বাড়ি ঘর ছেড়ে আসা সবুর আলীর স্ত্রী জানায়, আমাদের বাড়িতে ও আমার দেবরের বাড়িতে ডাকাতি হওয়ার পর থেকে আমরা ডিহিকৃষ্ণপুর মসজিদ পাড়ায় চলে এসেছি। আমাদের বাড়িতে এখন তালা মারা রয়েছে। গত ১৬ মে ১৫/২০জনের একটি ডাকাত দল আমাদের বাড়িতে হামলা করে কানের দুল, টর্চ লাইট, মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। এছাড়া আমার দেবর তুফানের বাড়ি থেকে মেয়ের গলার চেইন, হাতের রুলি, দুই জোড়া কানের দুল ও রুপার গহনা, মোবাইল ফোনসহ নগদ ৩০০/-টাকা নিয়ে যায়। আলাপ চারিতার এক ফাঁকে একজন ২২/২৩ বছর বয়সী মেয়ে এসে বলে ডাকাতদের গালি দিয়েছি বলে আমাদের যা করেছে। এখন মনে হচ্ছে সামনে পেলে জীবন যেত যেত তাদের গলা টিপে মেরে ফেলতাম। তবে অমানবিক (ধর্ষণ) নির্যাতনের ঘটনা তারা সকলেই অস্বীকার করে।
সম্প্রতি শোনাযায় ৩০/৪০ জনের অজ্ঞাত ডাকাতদল সাদা লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরহিত অবস্থায় দেশীয় অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে জেলা সদরের বেগমপুর ইউনিয়নের আকন্দবাড়িয়া ও হরিশপুর গ্রামে হানা দেয়। এ সময় তারা বেশ কয়েকটি বাড়িতে ডাকাতি তান্ডব চালায় এবং
অজানা বাহিনী কতৃক ডাকাতি আর ধর্ষণ/নির্যাতনের গুজব শুধু দর্শনা, বেগমপুর, হিজলগাড়ী, ডিহিকৃষ্ণপুর, আকন্দবাড়িয়ায় নয় গুজব ছড়িয়ে পড়েছে গোটা জেলায়। এখন ডাকাত আতংকে দিনাতিপাত করছে আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা ও জীবননগর উপজেলার সর্বত্র। ডাকাতি মোকাবিলায় এসব এলাকাতেও গ্রাম, পাড়া/মহল্লাবাসী দল বেধে পাহারা শুরু করেছে।
এদিকে অজ্ঞাত সূত্রে জানা যায়, গত দু’দিন ধরে জেলা শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় মোটরসাইকেলযোগে অপহরণের ঘটনা ঘটছে। দুষ্কৃতিকারীরা মোটরসাইকেলে চেপে অভিনব কৌশলে শিশু-কিশোর, স্কুল-কলেজ পড়–য়া যুবক-যুবতিদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এলাকাবাসী তাদের প্রতিরোধের চেষ্টা করলে পালিয়ে রক্ষা পায় বলে জানা গেছে। আরো জানা যায় ওই সিন্ডিকেটের বেশ কয়েকজন সদস্য আটকও হয়েছে। তবে এ সমস্থ তথ্যের কোনো সত্যতা মেলেনি এলাকাবাসী এবং প্রশাসনের কাছ থেকে।
তবে জেলাজুড়ে ডাকাতিসহ ছোট বড় অপরাধ বৃদ্ধি পাওয়ার ব্যাপারটা সত্য বলে বিশ্বস্ত সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। জানা যায়, এক মাসের ব্যবধানে জেলার আইন শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সকল প্রশাসনে আমুল পরিবর্তন আসায় এ ধরণের অপরাধ বেড়ে যেতে পারে। সাথে সাথে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাও এক্ষেত্রে নজির রাখে। তবে নবাগত প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যদি দ্বায়িত্বশীল হন তবে সকল অপরাধই দমন সম্ভব।
উল্লেখ্য, গত ১৯ মার্চ রাতে চুয়াডাঙ্গা-আলমডাঙ্গা সড়কের ঘোড়ামারা ব্রিজের অদূরে যাত্রীবাহীবাসসহ বেশ কয়েকটি যানবাহনে দুঃসাহসিক ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এর একদিন না যেতেই দামুড়হুদা উপজেলার দুধপাতিলা-আমতলা সড়কে আরো একটি ডাকাতির ঘটনা সংঘটিত হয়। এর এক সপ্তাহ না যেতেই চুয়াডাঙ্গা সদরের কুতুবপুর ইউনিয়নের খাড়াগোদা-ভুলটিয়া মাঠে সন্ধ্যারাতে সংঘবদ্ধ ডাকাতদল তান্ডব চালায়। এ ছাড়াও ২৭ মার্চ জীবননগর উপজেলার মনোহরপুর-খয়েরহুদা সড়কে সন্ধ্যারাতে গণডাকাতির ঘটনা ঘটে। ৩এপ্রিল দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা ধাপার মাঠ নামকস্থানে ডাকাতির ঘটনায় দু’ব্যবসায়ী সর্বস্ব খোয়ান। এর ৩দিনের মাথায় চুয়াডাঙ্গা সদরের তেঘরিতে এশটি বাড়িতে হানা দিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। পরদিন গত রাতে তেঘরী-কলাগাছি সড়কে ডাকাতদল তান্ডব চালিয়ে কিছু না পেয়ে পথচারীদের উপর হামলা করে। কিছুদিন থমথমে অবস্থা যেতে না যেতেই ২০ এপ্রিল রাতে চুয়াডাঙ্গা সদরের সড়াবাড়িয়া মাঠে ডাকাতদল হানা দিয়ে গরু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লুটপাট চালায়। ওই রাতে আরেকটি সংঘবদ্ধ চক্র জীবননগর উপজেলার মানিকপুর গ্রামের রাস্তায় তান্ডব চালায়। একদিন পার না হতেই ২১ এপ্রিল রাতে জীবননগর উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের মারুফদহ গ্রামের বাটিকাপাড়ায় সংঘবদ্ধ ডাকাতদল এক কৃষকের বাড়ি হানা দিয়ে ওই পরিবারের সকলকে কুপিয়ে জখম করে পালিয়ে যায়। পরদিন গত রাতে দামুড়হুদার কুনিয়া চাঁদপুরে মধ্যরাতে মুখোশধারী ডাকাতদল তান্ডব চালায়। ২৮ এপ্রিল সন্ধ্যারাতে চুয়াডাঙ্গা সদরের খাড়াগোদা-বদরগঞ্জ সড়কের আলোচিত ভুলটিয়া মাঠে আবারো ডাকাতির ঘটনা ঘটে। বহুল আলোচিত ঘটনার জন্ম নেয় সদর উপজেলার বোয়ালিয়া ও বলদিয়া গ্রামের ২৫/৩০জন অস্ত্রধারী ডাকাতদলের তান্ডবের মধ্যে দিয়ে। ৭ মে গ্রাম দুটিতে ডাকাতির সময় অস্ত্রের মুখে পরিবারের নারী সদস্যদের শীলতাহানির ঘটনাও ঘটে। এক সপ্তাহের মাথায় ১৫ মে রাতে চুয়াডাঙ্গা সদরের হিজলগাড়ী- নেহালপুর সড়কের মধ্যবর্তী স্থানে মুখোশধারী ডাকাতদল তান্ডব চালায়। সড়কে গাছ ফেলে লুটপাট ও বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় চক্রটি। শুধু তায় নয় ওই রাত থেকে আলোচনা সমালোচনা ও আতংক ছড়িয়ে পড়ার কেন্দ্র বিন্দুতে ছিলো এক নারীর উপর শীলতাহানির চেষ্টা। তবে ওই নারী পরে স্বীকার করে রাতে ডাকাত দলের এক সদস্যের সাথে প্রাণ বাচাতে হাতাহাতি ছাড়া আর তেমন কিছুই ঘটেনি। তারপর গত ২৬ মে গভীররাতে রাস্তার উপর গাছ ফেলে ডাকাতি চেষ্টা চালায় সংঘবদ্ধ একটি চক্র। সর্বশেষ ৩১ মে রাতভর চুয়াডাঙ্গা খেজুরতলায় তান্ডব চালায় ডাকাতদল। এমন সিরিজ আর ধারাবাহিক ডাকাতির ঘটনায় জনমনে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। আড়াই মাসের ব্যবধানে ২০টিরও বেশি ডাকাতির ঘটনা ঘটায় সমগ্র জেলাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।
কমেন্ট বক্স