অনলাইন এসএমএস ব্যাংকিং কতোটা নিরাপদ?
- আপলোড তারিখঃ
০৭-১০-২০২১
ইং
সমীকরণ প্রতিবেদন:
মোবাইল কিংবা অনলাইন ব্যাংকিং সুবিধা আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। একইসঙ্গে গ্রাহক সেবা আরও সহজ করতে আধুনিক ব্যাংকিংয়ে যুক্ত হয়েছে এসএমএস ব্যাংকিং সুবিধা। ব্যাংকে লেনদেন ও হিসাব নিকাশের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের নানা বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি দিয়েছে এই সেবাগুলো। তবে বাংলাদেশে অনলাইন অথবা এসএমএস ব্যাংকিং সুবিধা গ্রাহকদের জন্য আসলেই কতোটা নিরাপদ? তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যেমন আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এখনো পিছিয়ে রয়েছে, তেমনি অনলাইন কিংবা এসএমএস ব্যাংকিং সুবিধার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের বিড়ম্বনাও রয়েছে। তবে এসএমএস সুবিধা গ্রাহকদের জন্য শতভাগ নিরাপদ দাবি করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর ফলে গ্রাহকরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উপকৃতই হচ্ছেন। যদিও এ ক্ষেত্রে কিছুটা ঝুঁকি রয়েছে বলেও মনে করছেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, এসএমএস ব্যাংকিংয়ে অবশ্যই ঝুুঁকি রয়েছে। এটি পুরোপুরি নিরাপদ নয়। তাই যতোটা সম্ভব এটিকে এড়িয়ে চলা উচিত। বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ বলেন, এসএমএস ব্যাংকিং যদি যথাযথভাবে রক্ষাণাবেক্ষণ না করা হয়, তবে যেকারও কাছে সেটির নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে। তাহলে গ্রাহকদের জন্য এসএমএস ব্যাংকিং সুবিধা শতভাগ নিরাপদ নয় বলে মনে করছেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, কীভাবে এটিকে শতভাগ নিরাপদ বলা যায়? ব্যাংকের সুইফ্ট কোড যেখানে হ্যাকিং হচ্ছে, আরটিজিএস (রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট) এ যেখানে নানা সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া মোবাইল ব্যাংকিং এমনকি বিকাশেও যেখানে নানা রকম ঝামেলা হয়। সেখানে আমি জানি না যে, এসএমএস ব্যাংকিং কিভাবে শতভাগ নিরাপদ হয়।
তবে এসএমএস ব্যাংকিং সুবিধা শতভাগ নিরাপদ দাবি করে বর্তমান কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলছেন, এর ফলে গ্রাহকদের বরং সুবিধা হয়েছে। তারা ঘরে বসেই তার হিসাব জানতে পারছেন। অথবা তার একাউন্ট থেকে যদি কোনো ভুল ট্রানজেকশন হয়ে থাকে, তবে সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সেটি জানতে পারছেন এবং ব্যবস্থা নিতে পারছেন। একটি বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যদি কেউ এসএমএস সুবিধাটি নিতে না চান, তাহলে ব্যাংক থেকে তাকে সুবিধাটি দেয়া হয় না। তবে কিছু ব্যাংকে এটি বাধ্যতামূলকও করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নিয়ম আছে, যেখানে এসএমএস এলার্ট সিস্টেমকে বাই ডিফল্ট করা আছে। কোনো কোনো ব্যাংক আবার এটিকে বাধ্যতমূলকও করে থাকে। যখন নতুন একটি সেভিংস বা কারেন্ট একাউন্ট খোলা হয়, তখন সঙ্গে সঙ্গেই এসএমএস এর মাধ্যমে গ্রাহককে শুভেচ্ছা জানানো হয় এবং একাউন্ট ব্যালেন্সও জানিয়ে দেয়া হয়। এটি হচ্ছে বাই ডিফল্ট। যেমন, গ্রাহক একাউন্ট খোলার জন্য যখন ফরম পূরণ করবেন, তখন ফরমেই এসএমএস সুবিধার অপশনটি দেয়া থাকে। গ্রাহক সেখানে তার মোবাইল নম্বর দিয়ে থাকলে অর্থাৎ তিনি চাইলে স্বাভাবিকভাবেই তার এসএসএম সুবিধাটি চালু হয়ে যাবে। এখন এটি কোনো গ্রাহক বুঝে করুক অথবা না বুঝে করুক। তবে আমাদের অনেক গ্রাহক বিষয়টি বুঝেন না, বা বোঝার প্রয়োজন মনে করেন না। কারণ, এসএমএস’র মাধ্যমে একাউন্ট ব্যালেন্স জানিয়ে দেয়া হোক এই সুবিধাটি সাধারণত সবাই চায়। একই কারণে অনেকে অনলাইন ব্যাংকিং সেবাও নিয়ে থাকেন। কিন্তু এতে করে গ্রাহকদের একাউন্ট শতভাগ সুরক্ষিত থাকছে কি-না সেই চিন্তা আসলে বেশির ভাগ গ্রাহকই করেন না। তবে এই ব্যাংক কর্মকর্তা মনে করেন, যেখানে সুবিধা আছে সেখানে কিছুটা অসুবিধাও থাকে। এসএমএস কিংবা অনলাইন ব্যাংকিং সুবিধার কারণে গ্রাহকরা অবশ্যই উপকৃত হচ্ছেন। ব্যাংকিং ব্যবস্থা তাদের কাছে অনেক সহজ হয়েছে। এখন আধুনিক ব্যবস্থার কারণে সেখানে তো কিছুটা ঝুঁকি থাকেই। অর্থাৎ কেউ যদি চায় কিংবা হ্যাকাররা যদি চায় তাহলে যেকোনোভাবেই একাউন্ট হ্যাক করতে পারে। সেটা গ্রাহকের অসচেতনতার কারণেও হতে পারে। কারণ মোবাইলে যেহেতু এসএমএস, ই-মেইল যাচ্ছে তখন গ্রাহকের মোবাইলটি যদি কোনোভাবে অন্যের হাতে চলে যায়, তাহলেতো অবশ্যই এটি ঝুঁকিপূর্ণ। এক্ষেত্রে গ্রাহককে অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে। আর অসচেতন হলে এসএমএস সুবিধাই হোক অথবা অন্য কোনো সুবিধা হোক, সেখানে ঝুঁকি থাকে।
সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এম. কামাল হোসেন বলেন, এসএমএস ব্যাংকিং সুবিধাটি শতভাগ নিরাপদ। প্রথমত: এর সুবিধাটি হলো- একাউন্টে টাকা রাখা হোক অথবা টাকা তোলা হোক, সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকের কাছে এসএমএস চলে যাবে। এখন কেউ যদি তার চেক বই দিয়ে তার সাইন নকল করে টাকা তুলেও ফেলে, তবুও কিন্তু ২-৩ সেকেন্ডের মধ্যে তার কাছে এসএমএস চলে যাবে। যখন সে জানবে এবং সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু সেই লোকটি ধরাও পড়তে পারে। তাছাড়া রেগুলার আপনার একাউন্টের স্ট্যাটাস এসএমএস এর মাধ্যমে আপনার মোবাইলে চলে যাচ্ছে। সেজন্য আপনাকে ব্যাংকে যেতে হচ্ছে না। সুতরাং এসএমএস সুবিধাটি গ্রাহকদের জন্য খুবই উপকারী। এসএমএসগুলো কখনো পাবলিক হওয়ার সুযোগ নেই দাবি করে তিনি বলেন, আপনার বিরুদ্ধে যদি নির্দিষ্টভাবে কোনো অভিযোগ থাকে তাহলে টেলিকমিউনিকেশন বোর্ড থেকে আপনার মোবাইলটি ট্রাক করা হতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষেরটা তো কখনোই তারা করবে না। এটা করলেতো আপনার ইনফরমেশন তারা জেনে যাবে এবং আপনার একাউন্টের ব্যালেন্স আরেকজন জেনে যাবে। এটা তারা কোনো দিনও করবে না। এখন আপনার হাত থেকে যদি আপনার মোবাইলটি অন্য কারো কাছে চলে যায়, তখন তো আর কিছু করার থাকবে না। সুতরাং অসুবিধার চেয়ে সুবিধা অনেক বেশি। এরপরও কোনো গ্রাহক সুবিধাটি না চাইলে আমরা তাকে দেই না। একই কথা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ আপনি এই সুবিধাটি কেবল চাইলেই দেয়া হবে, অন্যথায় দেয়া হবে না।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের সাবেক সিইও এবং একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করা অর্থনীতিবিদ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি ব্যাংকের দায়িত্ব হচ্ছে গ্রাহকদের সব ধরনের গোপনীয়তা যেন বজায় থাকে সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক যখন আইটি অডিট করতে আসে, তখন কিন্তু তারা জিজ্ঞেস করে, আপনার সিকিউরিটি সিস্টেম অডিট হয়েছে কি-না? কোর ব্যাংকিং সিকিউরিটি সিস্টেম এসেমেন্ট করিয়েছেন কি-না? এগুলো এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিটের অংশ করে দেয়া হয়েছে। এখন কথা হল- ব্যাংকের ফরমে কিন্তু এসএমএস অপশনটি দেয়া আছে। আপনি কি সুবিধাটি চান কি-না? যদি এসএমএস সুবিধা না চান তাহলে ব্যাংক আপনাকে কখনই দেবে না। আর এই এসএমএস এর মাধ্যমে টাকার হিসেব ছাড়া কিন্তু আর কিছু বলা হচ্ছে না। তাছাড়াও এই এসএমএস পাবলিক হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, ব্যাংক যে সিম থেকে এসএমএস পাঠাচ্ছে, ঐ সিমটি অন্য কোনো কোম্পানি ইচ্ছে করলেও দেখতে পারবে না। তাছাড়া এই সিস্টেমটি দেখার দায়িত্ব কিন্তু ঐ ব্যাংকের ওপরেই। সুতরাং গ্রাকরা এক্ষেত্রে অনেকটা নিরাপদ।
কমেন্ট বক্স