জনজীবন ও অর্থনীতিতে সামগ্রিক প্রভাব, ক্রেতাদের নাভিশ্বাস!
- আপলোড তারিখঃ
০৫-১০-২০২১
ইং
এক সপ্তাহের ব্যবধানে চুয়াডাঙ্গায় আবারও বেড়েছে এলপি গ্যাসের দাম, প্রতি সিলিন্ডার ১২৫০ টাকা
মেহেরাব্বিন সানভী:
চুয়াডাঙ্গায় এলপি গ্যাসের দাম আবারও বেড়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন কোম্পানির ১২ কেজি ওজনের সিলিন্ডার প্রতি দাম বেড়েছে ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা করে। এনিয়ে চলতি বছর গ্যাসের মূল্য সাত দফা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে ক্রেতাদের নাভিশ্বাস অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গায় পাইপলাইনে গ্যাস সংযোগ নেই। গৃহস্থলি কাজ ও ছোট-মাঝারি কারখানায় এলপি গ্যাস ব্যবহার করে এ অঞ্চলের মানুষ। ইদানিং হোটেল-রেস্তোরাঁয় রান্নার কাজেও ব্যবহার হচ্ছে এলপি গ্যাস। এ অবস্থায় গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সামগ্রিক প্রভাব পড়েছে চুয়াডাঙ্গার জনজীবন ও অর্থনীতিতে।
আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি হওয়ায় মূল্য বাড়িয়েছেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। চুয়াডাঙ্গা শহরের বেশ কয়েকটি দোকান ঘুরে জানা গেছে, বিভিন্ন কোম্পানির ১২ কেজি ওজনের প্রতি সিলিন্ডার গ্যাস এখন ১২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
শহরের কলেজ রোডের পলি স্টোরের স্বত্ত্বাধিকারী আব্দুর রাজ্জাক জানান, গ্যাসের দাম প্রতি সিলিন্ডারে পাইকারি পর্যায়ে ১৪০ টাকা বেড়েছে। এক সপ্তাহ আগে তিনি ১০৪০ টাকায় ১২ কেজি ওজনের গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি করেছেন, সেখানে আজ তাকে ১১৮০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা সেটি ১২৫০ টাকায় বিক্রি করবে।
জানা গেছে, গত বছরের ডিসেম্বর মাসে ১২ কেজির এলপি গ্যাস সিলিন্ডারপ্রতি বিক্রি হতো ৮০০ টাকা। এ বছরের জানুয়ারি মাসে পাইকারি মূল্যই হয় ৯৩০ টাকা। ওই মাসেই খুচরা বাজারে গ্রাহকরা ৯৮০ টাকা থেকে ১০০০ টাকায় এলপি গ্যাস পাচ্ছিলেন। গত ১২ এপ্রিলে এলপিজির একটি নির্ধারিত দামের ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। বেসরকারি পর্যায়ে এলপিজির দাম প্রতি কেজি ৭৬ টাকা ১২ পয়সা ধরে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৯৭৫ টাকা (মূসকসহ) নির্ধারণ করা হয়। আর সরকারি পর্যায়ে সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৫৯১ টাকা (মূসকসহ) দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। মে মাসের শেষ দিকে সরকারি খাতে ১২ কেজি সিলিন্ডারের এলপিজি মূসকসহ কমিয়ে ৮৪২ টাকা করা হয়। জুন মাসের শেষের দিকে বেসরকারিভাবে সরবরাহকৃত ১২ কেজি এলপি গ্যাসের দাম খুঁচরা পর্যায়ে ৮৯১ টাকা নির্ধারণ করা হয়। যা জুন মাস থেকে কার্যকর করা হয়। জুলাই মাসের শেষ দিকে বেসরকারি খাতে ১২ কেজি সিলিন্ডারের এলপিজি মূসকসহ ৮৯১ টাকা থেকে ১০২ টাকা বাড়িয়ে ৯৯৩ টাকা করা হয়, যা ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়। পরে আগস্ট মাসের শেষ দিকে বেসরকারি খাতে ১২ কেজি সিলিন্ডারের এলপিজি মূসকসহ ৯৯৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৩৩ টাকা করা হয়। যা সেপ্টেম্বর মাস থেকে কার্যকর করা হয়। এদিকে, এ সব কিছু ছাড়িয়ে এবারে পাইকারি বাজারে সেপ্টেম্বর মাসের মাঝের দিকে ১৪০ টাকা বাড়িয়ে ১১৮০ টাকা করা হয়েছে। খুচরা বাজারে ১২৫০ টাকা বিক্রি করা হচ্ছে ১২ কেজির এক সিলিন্ডার এলপি গ্যাস।
কোর্টপাড়ার বাসিন্দা সেলিম বলেন, ‘শনিবার দোকানে গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে হতবাক হই। এমনিতেই স্বল্প আয়ে সংসার চলে না, তার ওপর গ্যাসের জন্য বাড়তি আরও ১৩০ টাকা বেশি খরচ করতে হবে ভেবে চিন্তিত।’
গৃহিনী শিলা খান বলেন, ‘এভাবে হঠাৎ করে ১৪০ টাকা গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়া সাধারণ বিষয় না। এভাবে দাম বাড়লে এটা সত্যিই আমাদের জন্য কষ্টসাধ্যের বিষয় হবে। এ বছরেই সাত বার গ্যাসের দাম বেড়েছে। এটাকে কমপক্ষে আমাদের মতো নিম্ন বা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বাভাবিকভাবে দেখা সুযোগ নেই। দ্রুতই গ্যাসের দাম কমাতে হবে।’
বসুন্ধরা গ্যাস কোম্পানির খুলনা এরিয়া ম্যানেজার মো. গিয়াস উদ্দিন রাসেল জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বেড়েছে। ১২ কেজির বোতলে ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে বৃদ্ধি পেয়েছে। রোববার থেকে এ মূল্য কার্যকর হয়েছে বলে তিনি জানান।
চুয়াডাঙ্গায় বসুদ্ধরা কোম্পানির ডিলার ও এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি হাবিল হোসেন জোয়ার্দ্দার বলেন, ‘হঠাৎ করেই কোম্পানি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করেছে। কোম্পানির পক্ষ থেকে কারণ হিসেবে বিশ্ব বাজারে দাম বাড়ার কথা বলা হয়েছে। সরকারের সাথে আলোচনা করেই গ্যাস কোম্পানিগুলো দাম বাড়িয়েছে বলেই আমরা জানি। সেরকমই আমাদের জানানো হয়েছে।’
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চুয়াডঙ্গার সহকারী পরিচালক সজল আহমেদ বলেন, ‘আমরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছি। তবে এলপি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির তদারকির বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা পাইনি। নির্দেশনা পেলে অভিযান পরিচালনা করা হবে।’
এদিকে, কেন এলপি গ্যাসের দাম প্রতিমাসে এভাবে বাড়ছে, তার সন্ধানে জানা গেছে বিশ্ব বাজার ও দেশে এলপিজি আমদানির ওপর এটি নির্ভর করে। এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন দেশের একটি বেসরকারি পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, গ্যাস উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ না হওয়ার কারণে দেশে এলপিজি একটি আমদানি-নির্ভর পণ্য। অপরিশোধিত তেল শোধনাগারে নিয়ে পরিশোধনের পর তেলের পাশাপাশি প্রায় ১০টি পণ্য বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে বেরিয়ে আসে। এলপি গ্যাস তার মধ্যে একটি। যার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে যখনই তেল বা এ জাতীয় পণ্যের দাম ওঠানামা করে, তখনই এ সম্পর্কিত পণ্যের দামও ওঠানামা করে। এ ধরণের পণ্যের কোনো সুনির্দিষ্ট দাম থাকে না। এক দিন এমনকি ঘণ্টার পার্থক্যের কারণেও দাম পরিবর্তিত হয়ে যায়। আর এ কারণেই এলপিজির দামও ঘন ঘন পরিবর্তন হয়। তিনি ওই সাক্ষাতকারে এও জানিয়েছিলেন, দামের এমন ওঠানামা সহ্য করা ছাড়া খুব বেশি কিছু করার নেই।
কমেন্ট বক্স