রিং আইডির ‘পঞ্জি’ ব্যবসার জাল
- আপলোড তারিখঃ
২৫-০৯-২০২১
ইং
গ্রাহকের কাছ থেকে কয়েক শ’ কোটি টাকা সংগ্রহ : অর্থ লোপাট ও পাচারের শঙ্কা
সমীকরণ প্রতিবেদন:
বিজ্ঞাপন দেখলেই প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা আয়ের সুযোগ। বন্ধু-বান্ধবদের বিজ্ঞাপন দেখালে মিলবে আরও কমিশন। তবে তার আগে ১২ হাজার ও ২২ হাজার টাকা দিয়ে সিলভার ও গোল্ড সদস্য হয়ে বিজ্ঞাপন দেখে টাকা উপার্জন করতে হবে। রাজধানীর গুলশানে এমন প্রতারণার ‘পঞ্জি’ স্কিম খুলে বসেছে রিং আইডি নামের একটি কোম্পানি। এছাড়া এখানে সোশ্যাল কমার্স (সামাজিক বাণিজ্য) নামে গ্রাহকদের কাছে পণ্য বিক্রি করারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এসব পণ্যের দাম বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থ আয়ের লোভনীয় অফার দিয়ে তরুণ, ছাত্র ও গৃহিণী, বিশেষ করে বিশাল বেকার জনগোষ্ঠীকে সহজেই আকৃষ্ট করছে কথিত সামাজিক যোগাযোগ এই প্ল্যাটফর্মটি। অর্থের বিনিময়ে ‘এজেন্ট’ ও ‘ব্র্যান্ড প্রমোটর’ নামে সদস্য বানিয়ে ইতোমধ্যে কয়েকশ’ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গ্রাহকের এ অর্থ লোপাট ও পাচারের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞরা।
জানা গেছে, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্ম রিং আইডি ডিজাইন ও ডেভেলপ করেছে কানাডার মন্ট্রিয়লের রিং ইনকর্পোরেশন। দেশে রিং আইডি চালু হয় ২০১৬ সালে। কানাডায় নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান হলেও এর প্রায় সব কার্যক্রম বাংলাদেশ ঘিরে। চালু হওয়ার পর থেকে রিং আইডি পরিচিত ছিল সরাসরি সম্প্রচার, ভয়েস ও ভিডিও কল, টিভি চ্যানেল, নিউজ পোর্টাল, তাৎক্ষণিক মেসেজিং, স্টিকার, মিডিয়া ক্লাউড, নিউজফিড, গোপন চ্যাট, মাল্টিমিডিয়া শেয়ারিং এসবের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে। কিন্তু গত বছর থেকে করোনা মহামারীর কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অলস বসে থাকা বেকার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। ঘরে বসে শর্টকাটে অর্থ উপার্জনের অফার ও ফেসবুকে চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিশেষ করে ছাত্রদের আকৃষ্ট করতে শুরু করে কোম্পানিটি।
কানাডাপ্রবাসী বাংলাদেশী শরিফ ইসলাম ও আইরিন ইসলাম দম্পতি রিং আইডির প্রতিষ্ঠাতা। যদিও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) এক মামলায় ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর এই দম্পতিকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আইজিডব্লিউ এবং আইসিএক্স প্রতিষ্ঠান খুলে কল জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অবৈধ উপায়ে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে এই দম্পতির বিরুদ্ধে। পরে হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে দেশ থেকে পালিয়ে যান শরিফ ইসলাম ও আইরিন ইসলাম। বর্তমানে রিং আইডির একমাত্র অফিস ঢাকার গুলশানে। যেখানে ৫০ জনের মতো কর্মী কাজ করছেন।
রিং আইডি কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের প্ল্যাটফর্মে দুই কোটির বেশি সক্রিয় ব্যবহারকারী রয়েছেন, যাদের ৯৫ ভাগই বাংলাদেশী। চলতি বছরের ২৮ মার্চ ‘কমিউনিটি জব’ নামে বিশেষ সেবা চালু করে রিং আইডি। এর আওতায় এজেন্ট ও ব্র্যান্ড প্রমোটর নিয়োগ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে তিন ক্যাটাগরিতে এজেন্ট হওয়া যায়। এর মধ্যে ডায়মন্ড ক্যাটাগরির এজেন্ট হতে পাঁচ লাখ টাকা, গোল্ডেন দুই লাখ টাকা এবং সিলভার ক্যাটাগরির এজেন্ট হতে এক লাখ টাকা দিতে হচ্ছে। এজেন্ট হওয়ার পর তারা রিং আইডির অফিসিয়াল প্রতিনিধি হিসেবে ব্র্যান্ড প্রমোটর নিয়োগ করতে পারেন। ১২ হাজার টাকায় সিলভার এবং ২২ হাজার টাকায় গোল্ড ক্যাটাগরির ব্র্যান্ড প্রমোটর নিয়োগ করেন তারা। এ ছাড়া এক বছরের জন্য ২৫ হাজার টাকায় ভিভিআইপি এবং ১৫ হাজার টাকায় ভিআইপি সদস্যপদ দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রবাসী ক্যাটাগরিতে বিনিয়োগ করেও প্রতিদিন এক হাজার টাকা আয়ের লোভনীয় অফার রয়েছে। এ ছাড়া ‘সোশ্যাল কমার্স’ নামে পণ্য বেচাকেনায়ও এসব এজেন্ট ও ব্র্যান্ড প্রমোটরদের জন্য রয়েছে কমিশন। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রিং আইডি এ্যাপে কোম্পানিটির ডিজিটাল মুদ্রা লেনদেন ব্যবসাও রয়েছে। প্রতি কয়েনের মূল্য ৮৬ টাকা। সদস্যরা এসব কয়েনকে টাকায় রূপান্তরিত করতে পারেন এবং মোবাইল আর্থিক পরিষেবার মাধ্যমে এসব টাকা ওঠাতে পারেন। অর্থ লেনদেন হয় বিকাশ, নগদ, রকেট, শিউরক্যাশের মতো মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে। এ ব্যবসায় একটা মোবাইল নম্বর থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্ল্যাটফর্মটিতে নতুন সদস্য যোগ করার জন্য রেফারি হিসেবে কাজ করা পুরনো সদস্যকে কোম্পানিটি ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা দেয়। এছাড়াও সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা রিং আইডির নিজস্ব এজেন্টদের মাধ্যমেও লেনদেন হয়।
সিরাজগঞ্জের রবিউল ইসলাম এখন এই কোম্পানির অস্তিত্ব নিয়েই সন্দিহান। গত ৮ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে তিনি এই কোম্পানি ও এর কার্যক্রম বৈধ কিনা, সে সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিনিয়োগ করার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের বেশিরভাগই অর্থ উপার্জন করতে ঝামেলায় পড়ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সমস্যা পড়ার কারণ, রিং আইডি তাদের বিজ্ঞাপন দেখতে দেয়নি এমনকি তাদের ব্যালেন্সে থাকা টাকাও ওঠাতে দেয়নি। রিং আইডির আরেক সদস্য মামুন মিয়া বলেন, এজেন্টরা তাকে ক্যাশআউট দিচ্ছে না বলে ঝামেলায় পড়ছেন তিনি। কিছু সদস্যের অভিযোগ, নিজেদের প্রাথমিক বিনিয়োগের সমান অর্থ উপার্জন করার পর থেকেই তারা টাকা উপার্জন করতে এবং ক্যাশআউট করতে ঝামেলায় পড়ছেন। আমিনুর রহমান নামের এক বিনিয়োগকারী সিলভার সদস্য হওয়ার জন্য ১২ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। গত ১১ সেপ্টেম্বর তিনি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বলেন যে, তাকে কয়েকদিন ধরে ক্যাশআউট করতে দেয়া হচ্ছে না। গোল্ড ক্যাটাগরির ৫০টি আইডি কিনেছেন কুমিল্লার নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, রিং আইডিতে গত এপ্রিল মাসে তিনি ১১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। ৫০টা আইডিতে তার প্রতিদিন ২৫ হাজার টাকা আয় হওয়ার কথা। শুরুতে এক মাস ঠিকঠাক টাকা তুলতে পেরেছেন। কিন্তু এখন ঝামেলা হচ্ছে। এজেন্টরা চাহিদা মতো ক্যাশআউট দিচ্ছে না। সরাসরি অফিসিয়াল ক্যাশআউট করতে গেলে রিং আইডির সার্ভার ব্যস্ত দেখাচ্ছে।
টাকা তুলতে এমন নানা ঝামেলার কথা জানিয়েছেন অনেকেই। টাকা ফেরত পাওয়া নিয়েও অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, কখনও কখনও এই ধরনের কোম্পানির বিনিয়োগকারীরা প্রতারণার শিকার হন। তিনি বলেন, আমার মনে হয়, ই-কমার্স খাতে সম্প্রতি কিছুদিন ধরে যে ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে, তা এড়ানোর জন্য সতর্কতা হিসেবে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার উচিত এই কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম খতিয়ে দেখা। বিদেশে বসবাসরত মালিকদের অনুপস্থিতিতে রিং আইডি বিডি লিমিটেডের ব্যবসা চালান কোম্পানিটির হেড অব এক্সটার্নাল এ্যাফেয়ার্স জুলহাজ জুবায়ের। তিনি বলেন, ‘শেয়ারিং এবং উপার্জনের মাধ্যমে পরিচালিত আমাদের কমিউনিটি ব্যবসা কোন পঞ্জি স্কিম বা এমএলএম ব্যবসা নয়। আমরা সব ধরনের স্থানীয় আইন ও নিয়ম মেনে ব্যবসা করছি।’ এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক উর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, তাদের সন্দেহ, বিদেশ থেকে পরিচালিত প্ল্যাটফর্ম রিং আইডি অর্থপাচার করছে। তিনি বলেন, প্ল্যাটফর্মটিকে আমরা পর্যবেক্ষণে রেখেছি।
কমেন্ট বক্স