হতদরিদ্রদের মাঝে আহাজারি, হ্যাকাররা অধরা!
- আপলোড তারিখঃ
২০-০৯-২০২১
ইং
ঝিনাইদহে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের টাকা ‘নগদ’ অ্যাকাউন্ট থেকে উধাও
ঝিনাইদহ অফিস:
ঝিনাইদহে সামাজিক কর্মসূচির টাকা বিশেষ করে বিধবা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের টাকা ‘নগদ’ অ্যাকাউন্ট থেকে উধাও হয়ে গেছে। অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে কে বা কারা হতদরিদ্রদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এদিকে টাকার শোকে হতদরিদ্ররা আহাজারি করলেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছে না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা হ্যাক করার পর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কোটি কোটি টাকা হ্যাক করে উঠিয়ে নেওয়া হলো। কিন্তু এ ব্যাপারে নগদ ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের গড়িমসির কারণে শহর ও গ্রামাঞ্চলে শত শত বিধবা, প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক ব্যক্তিদের মাঝে হা-হুতাশ বাড়ছে।
তথ্য নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিল মাসে ঝিনাইদহে প্রাথমিকের প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির টাকা প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয়। সেই টাকা আজও উদ্ধার হয়নি। শনাক্ত করা যায়নি প্রতারক চক্রকে। প্রতারকদের প্রাইমারির মিশন সফল হওয়ার পর তাদের নজর পড়ে সমাজসেবার সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রদেয় শিক্ষা উপবৃত্তি, বিধবা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতার ওপর।
শৈলকুপা উপজেলার ফুলহরি গ্রামের হাসি রানী অভিযোগ করেন, তিনি নতুন ভাতাভোগী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। কিন্তু প্রথম কিস্তির টাকা তিনি পাননি। নগদ অ্যাকাউন্ট চেক করে দেখেন তার টাকা কে বা কারা হ্যাক করে তুলে নিয়েছে। ফুলহরি ইউনিয়নে হাসি রানীর মতো অনেকের টাকা হ্যাক করে উঠিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন ঝিনাইদহ জেলা পরিষদের সদস্য অনিতা বিশ্বাস।
ঝিনাইদহ পৌর এলাকার কালিকাপুর গ্রামের ফারজানা আফরিন অ্যানি জানান, অহসায় প্রতিবন্ধী হিসেবে তিনি প্রতি মাসে ভাতা পেয়ে আসছেন। তিনি নগদ অ্যাকাউন্ট খোলার পর তাঁর নগদ ০১৯৬৯১৯০১৪৩ নম্বরের সাড়ে চার হাজার টাকা প্রতিবন্ধী ভাতা আসে। কিন্তু উক্ত টাকা গত ৯ জুলাই কে বা কারা ০১৯০৬৪৯৩৩৯১ নম্বরে ট্রান্সফার করে নেয়। এ ঘটনায় তিনি ১৯ আগস্ট ঝিনাইদহ সদর থানায় একটি জিডি (যার নম্বর ৯৯২) করেছেন। কিন্তু এখনো টাকা ফিরে পাননি।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, উন্নত তথ্য প্রযুক্তির যুগে হ্যাকারদের চিহ্নিত করা কি খুব কঠিন কাজ? তাহলে কেন টাকা উদ্ধার হচ্ছে না। এই হ্যাকিংয়ের সঙ্গে কারা জড়িত? ঝিনাইদহের ৬ উপজেলায় এভাবে শত শত নগদ অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে উপবৃত্তি, বিধবা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা তুলে নেওয়া হচ্ছে।
ঝিনাইদহ জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সারা জেলা থেকে এ রকম শত শত অভিযোগ পাচ্ছি, কিন্তু তাদেরকে কোনো সহায়তা দিতে পারছি না। তথ্য নিয়ে জানা গেছে, সারা জেলায় মোট ভাতাভোগীর সংখ্যা ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৬২ জন। এর মধ্যে প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি পান ১ হাজার ১৬৬ জন, বয়স্ক ভাতা পান ৫৭ হাজার ৫৬৩, বিধবা ভাতা পাচ্ছেন ২৯ হাজার ৪২৭ ও প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন ২৮ হাজার ৬০৬ জন।
ঝিনাইদহ জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল সামি জানান, সারা জেলা থেকে কতজনের নগদ অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা হ্যাক করে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। তবে কোনো কোনো উপজেলায় ৫% থেকে ১০% টাকা হ্যাকিংয়ের শিকার হতে পারে। তিনি বলেন, ঝিনাইদহ পৌরসভা এলাকার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার ১৩৬ জন বয়স্ক, ৪ জন বিধবা, ২৩ জন প্রতিবন্ধী ও ৪ জনের শিক্ষা উপবৃত্তির টাকা তাদের নগদ অ্যাকাউন্ট থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই টাকার পরিমাণ প্রায় ৪৭ লাখ বলে তিনি জানান।
উপজেলা সমাজসেবা অফিসারদের ভাষ্য, অনেক ভাতাভোগীর অ্যাকাউন্ট খোলার আগেই টাকা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। এটা কীভাবে সম্ভব প্রশ্ন তোলেন তাঁরা। তথ্য নিয়ে জানা গেছে, ‘নগদ’-এর নিজস্ব কোনো দক্ষ কর্মী দিয়ে ভাতাভোগীদের অ্যাকাউন্ট করেনি, করেছে পার্টাটাইম কর্মীরা। অ্যাকাউন্ট খোলার পর গোপন পিন নম্বর ওই পার্টাটাইম কর্মীদেরই জানা ছিল। দেশের সংঘবদ্ধ চক্রের সঙ্গে যোগসাজস করে তারাই এই হ্যাকিংয়ের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে সমাজসেবার মাঠকর্মীদের ধারণা।
জেলা সমাজসেবা অফিসের হিসাব মতে, ২০২০-২০২১ অর্থবছরে চতুর্থ কিস্তির টাকা শৈলকুপায় ১২ জনের, সদর উপজেলায় ১৭ জনের, কালীগঞ্জে ৭ জনের, হরিণাকুণ্ডুতে ১৪ জনের ও ঝিনাইদহ পৌরসভায় ১৫২ জনের উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া দ্বিতীয় কিস্তির টাকা শৈলকুপায় ১৪ জনের, কোটচাঁদপুরে ৫ জনের, ঝিনাইদহ সদর উপজেলায় ১৮ জনের, মহেশপুর উপজেলায় ১৫৯ জনের, কালীগঞ্জে ২৮ জনের ও হরিণাকুণ্ডুতে ৪৯ জনের নগদ অ্যাকাউন্ট থেকে লোপাট হয়েছে। এই হিসাব সমাজসেবা অধিদপ্তরে লিখিতভাবে জানানো হলেও ভাতাভোগীরা কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না।
বিষয়টি নিয়ে ঝিনাইদহ জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ শেখ জানান, ‘নগদ’ অ্যাকাউন্ট খোলার পর ‘নগদ’ কর্মীদের দেওয়া গোপন পিন নম্বর দিয়ে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে পারেনি ভাতাভোগীরা। সমাজসেবা থেকে এমন অভিযোগ অধিদপ্তরে দিলে সব গোপন পিন ‘অটো রিসেট’ করে দেওয়া হয়। পরে ভাতাভোগীরা গোপন পিন রিসেট করে দেখেন তাদের অ্যাকাউন্টের টাকা আগেই তুলে নেওয়া হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা জানান, ‘ঝিনাইদহ থেকে ঠিক কতজনের টাকা ‘নগদ’ অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে তুলে নেওয়া হয়েছে, তার সঠিক হিসাব নেই। তবে আমরা প্রাথমিকভাবে এক হাজার ভাতাভোগীকে সনাক্ত করতে পেরেছি। তাদের তালিকা সমাজসেবা অধিদপ্তরকে দিয়েছি। সেখান থেকে ‘নগদ’ কর্তৃপক্ষের কাছে গেছে।’ তিনি বলেন, টাকা উদ্ধারের কোনো সুখবর তার কাছে নেই।
কমেন্ট বক্স