ঘুষ না দিলে মেলে না প্যাথেডিন-স্পিরিট!
- আপলোড তারিখঃ
১৪-০৯-২০২১
ইং
সমীকরণ প্রতিবেদন:
অস্ত্রোপচারের জন্য প্যাথেডিন ইনজেকশন অতি জরুরি একটি ওষুধ। আর এই জরুরি ওষুধটি কোম্পানির কাছ থেকে ক্রয়ে অনুমতি আদায়ে পদে পদে দিতে হয় ঘুষ। ওষুধটির গায়ে ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা লেখা থাকলেও ঘুষ দিতে গিয়ে এটি ক্রেতার কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। কথাগুলো ক্ষোভের সঙ্গে বলছিলেন ঝিনাইদহ জেলা শহরের শহিদ মশিউর রহমান সড়কের হাসান ক্লিনিকের পরিচালক আতিয়ার রহমান। তিনি বলেন, লাইসেন্স নবায়নেও দিতে হয় ঘুস। এছাড়া প্রতি পিস প্যাথেডিনের জন্যও স্থানীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লোকদের ২৫ টাকা ৫০ পয়সা হারে ঘুস দিতে হয়। ঘুস না দিলে অনুমতি পাওয়া যায় না। গত রোববার দুপুরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ঝিনাইদহ জেলা কার্যালয়ের আব্দুল্লাহ মামুন নামের এক স্টাফের সঙ্গে আতিয়ার রহমানের ফোনালাপে ঘুস লেনদেনের বিষয়টি উঠে এসেছে।
কথা হয় হাসান ক্লিনিকের পরিচালক আতিয়ার রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কয়েকদিন আগে ৫০ পিস প্যাথেডিন কেনার জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ঝিনাইদহের সহকারী পরিচালক বরাবর নির্ধারিত ফরমে আবেদন করি। প্রতিপিস প্যাথেডিনের জন্য আমার কাছে ২৫ টাকা ৫০ পয়সা করে ঘুষ চাওয়া হয়। ঘুষ দিতে অস্বীকার করায় আমাকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। রোববার বিকাল পৌনে ৫টায়ও আতিয়ারের মোবাইল ফোনে কল করে মামুন বলেন, লাইসেন্স নবায়ন বাবদ দুই হাজার টাকা দিতে হবে না। তবে প্রতি পিস প্যাথেডিনের জন্য ২৫ টাকা ৫০ পয়সা ঘুষ দিতে হবে। সবাই দেয়, আপনিও দেবেন।
ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ঝিনাইদহের সহকারী পরিচালক গোলক মজুমদর বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি, সবকিছু জানা নেই আমার।’ প্রতিবেদককে উদ্দেশ করে তিনি বলেন ‘আপনার কোনো অভিযোগ থাকলে লিখিত দেন। জেলায় কতজন ব্যবসায়ীর প্যাথেডিন এবং স্পিরিট বিক্রির লাইসেন্স আছে? এমন এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অর্থবছর শেষ না হলে বলতে পারব না।
হার্ডওয়্যারের দোকান মালিককেও স্পিরিট (রংয়ের কাজ) ক্রয়ের জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্সের প্রয়োজন হয়। লাইসেন্স বিড়ম্বনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সদর উপজেলার ভিকের মোড় এলাকার হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন বলেন, স্পিরিট বিক্রির লাইসেন্স পাওয়ার জন্য জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে আবেদন করি। আবেদনটি পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য থানায় পাঠানো হয়। থানাকে দিতে হয় পাঁচ হাজার টাকা। পরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঝিনাইদহ অফিসের লোকজন ৩০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে জেলা কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুলকে সঙ্গে নিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে যাই। তার সঙ্গেও অফিসের লোকদের তুমুল বাকবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে কৃষকলীগের নেতা হাল ছেড়ে দেন। শেষ পর্যন্ত পাঁচ হাজার টাকা ঘুস নিয়ে স্পিরিট বিক্রির লাইসেন্স পান জসিম উদ্দিন। জানতে চাইলে রোববার জেলা কৃষক লীগ নেতা আশরাফুল বলেন, ঝিনাইদহ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সীমাহীন ঘুস বাণিজ্যে অতিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা।
কথা হয় জেলা ওষুধ ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম আহ্বায়ক ঝন্টুর সঙ্গে। তিনি বলেন, এক পিস প্যাথেডিন ইনজেকশনের এমআরপি (বিক্রয় মূল্য) মাত্র ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা। অথচ তারা ডিলারের কাছ থেকে কিনে থাকেন একশ আশি থেকে দুইশ টাকা দরে। ২০ টাকা লাভে আমরা বিক্রি করে থাকি। ঝিনাইদহ ২৫০ বেড হাসপাতালের প্রধান (সহকারী পরিচালক) ডা. হারুন অর রশিদ বলেন, জটিল অস্ত্রোপচারের রোগীদের শরীরে এই ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। ২০ ভাগ রোগীর ক্ষেত্রেই এটি প্রয়োগ করতে হয় সাধারণত। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে ‘প্যাথেডিন’ জটিল অস্ত্রোপচার পরবর্তী রোগীদের ব্যথানাশক হিসাবে শরীরে পুশ করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে হাতেগোনা তিনটি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান প্যাথেডিন উৎপাদন করে থাকে। এর মধ্যে সরকারি ওষুধ প্রস্তুতকারক ইডিসিএল (অ্যাসেনশিয়াল ড্রাগ) গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ও জেসন সিলেট অন্যতম। ড্রাগ লাইসেন্সধারী ওষুধ বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো (ফার্মেসি) সরাসরি খোলা বাজার থেকে প্যাথেডিন ক্রয় করতে পারেন না। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ বিক্রি দণ্ডনীয় অপরাধ। (সূত্র- যুগান্তর)
কমেন্ট বক্স