শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস শিক্ষকরা উন্মুখ
- আপলোড তারিখঃ
১২-০৯-২০২১
ইং
৫৪৩ দিন পর খুলছে তালা, ঘরবন্দী শিক্ষাজীবনের অবসান
সমীকরণ প্রতিবেদন:
করোনা মহামারির তিমির দিঘল রাত্রি এখনও কাটেনি। এর মধ্যেই আজকের সূর্যোদয়ের পর সারাদেশের বিদ্যালয়গুলোতে ফের বাজবে ঘণ্টা। ফিরবে চিরচেনা প্রাণচাঞ্চল্য। হুল্লোড় করে কোমলমতি শিশুরা ঢুকবে ক্লাসে। টানা ৫৪৪ দিন পর আজ রোববার ক্লাসে ফিরবে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকরা পাবেন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সান্নিধ্য। সহপাঠীদের সঙ্গ পাবে শিক্ষার্থীরা। শহরাঞ্চলের ঘরবন্দি শিশুরা পাবে মুক্তির আনন্দ। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা মিলিয়ে সারাদেশে অন্তত তিন লাখ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনা মুখর হয়ে উঠবে শিক্ষার্থীদের পদচারণায়। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর সংখ্যা অন্তত চার কোটি। সর্বশেষ গত বছরের ১৬ মার্চ তারা সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পাঠ গ্রহণে অংশ নিয়েছিল। করোনার কারণে ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ হয়ে যায় সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অবশ্য বন্যাদুর্গত ১৪টি জেলার নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কিছু ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজ খুলছে না।
দেড় বছরের বেশি সময় পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হলেও একসঙ্গে সব শ্রেণির ক্লাস শুরু হচ্ছে না। ২০২১ ও ২০২২ সালের এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার্থী ও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাসে যেতে হবে। বাকিদের সপ্তাহে এক দিন করে মাত্র দুটি বিষয়ের ক্লাস হবে। দীর্ঘ বিরতির পর শিক্ষার্থীদের বরণ করে নিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটাই প্রস্তুত। গতকাল শনিবার শেষ মুহূর্তেও প্রস্তুতি নিতে দেখা গেছে শিক্ষকদের। রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় সদরের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের ফুল ও চকলেট দিয়ে বরণ করে নেবেন শিক্ষকরা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার সার্বিক বিষয় দেখতে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি আজ রোববার সকাল ১০টায় আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে যাবেন। তারপর তিনি কলাবাগান লেক সার্কাস স্কুলে যাবেন।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, এখন বড় চ্যালেঞ্জ শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণ করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করা। অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম শনিবার বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন পুরোপুরি সুনিশ্চিত করতে হবে। সরকারিভাবে বিনামূল্যে মাস্ক দিতে হবে। করোনাকালে শিক্ষার ক্ষতি পোষাতে একটি বড় প্রকল্পও গ্রহণ করা প্রয়োজন। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী গতকাল নিউইয়র্ক থেকে বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি, সমাজকর্মী, শিক্ষক, বেসরকারি সংস্থা, অভিভাবক- সবাইকে নিয়ে একটি সার্ভিল্যান্স টিম গঠন করে দিলে এটি নিশ্চিত করা যাবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, আপাতত প্রতিদিন নির্দিষ্ট শ্রেণির দুটি করে ক্লাস শুরু হচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরে স্বাভাবিক ক্লাস রুটিনে ফেরার চেষ্টা করা হবে।
জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির (২০১০) সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, 'করোনায় শিক্ষাব্যবস্থাই সবচেয়ে বড় ক্ষতিতে পড়েছে- এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। করোনার কারণে এক শ্রেণির পড়া ঠিকমতো না পড়েই শিক্ষার্থীরা পরবর্তী শ্রেণিতে উঠেছে। এটি ভয়াবহ ক্ষতি। এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এখন উদ্যোগ নিতে হবে।'
সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ হয়ে যায়। মে মাস থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষা ও জুলাই মাস থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকা, দুর্বল ও ধীরগতির ইন্টারনেট এবং ইন্টারনেটের উচ্চমূল্যের কারণে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর পক্ষেই অনলাইন ক্লাস করা সম্ভব হয়নি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন ব্যাচের ভর্তিও পিছিয়ে গেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে অন্তত ৫০০ পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। বড় ধরনের সেশনজটে পড়তে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। এক দশক ধরে পূর্বনির্ধারিত শিক্ষাসূচি অনুযায়ীই চলছে শিক্ষাব্যবস্থা। নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠিত হয় পাবলিক পরীক্ষা। প্রতিবছর ১ ফেব্রুয়ারি এসএসসি ও ১ এপ্রিল এইচএসসির সূচি ছিল সব শিক্ষার্থীরই জানা। যথাসময়ে ফল প্রকাশ শেষে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় শিক্ষার্থীরা। প্রতিবছরে যথাযথভাবে সিলেবাস শেষ করেই নেওয়া হয় বিভিন্ন শ্রেণির পরীক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট নেমে এসেছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়। কিন্তু করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে সব এখন এলোমেলো।
কমেন্ট বক্স